জাদুকরদের ঈমান ও পোশাকের প্রভাবের দাবি

Asked:
Marjan Ahmed
উত্তরদাতা

Marjan Ahmed

অধ্যক্ষ, আল-সালাম ইনস্টিটিউট · প্রতিষ্ঠাতা স্কলার, এএসআই রিসার্চ সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ

Answered on


প্রশ্ন:

শ্রদ্ধেয় উস্তাদ শায়খ মুহাম্মদ আকরাম নাদভী হাফিযাহুল্লাহু তাআলা, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আজ একজন সম্মানিত দ্বীনী আলিমের একটি ভিডিও শুনলাম, যেখানে তিনি বলেছেন—মানুষের চরিত্র ও নৈতিকতার ওপর তার পোশাকের গভীর প্রভাব রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মূসা আলাইহিস সালামের সাথে যখন জাদুকরদের মোকাবিলা হয়েছিল, তখন সমস্ত জাদুকর ঈমান এনেছিল; এর কারণ ছিল তারা মূসা আলাইহিস সালামের মতো পোশাক পরিধান করে এসেছিল।

তিনি আরও বলেন যে, বর্তমান যুগে আরবদের পরিহিত পোশাকও সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী নয়; এটি তো নারীদের পোশাকের মতো। পুরুষদের পোশাক হওয়া উচিত পায়ের নলা (পিন্ডলী) পর্যন্ত—কুর্তা ও পায়জামা উভয়টিই নলা পর্যন্ত হওয়া আবশ্যক। পুরুষদের উচিত নামাজের সময় এই পোশাকে আসা এবং প্যান্ট-শার্ট পরিহার করা। এ বিষয়ে আপনার মূল্যবান দিকনির্দেশনা কামনা করছি। —উমর মাহবুব নাদভী, নালা সোপারা, পালঘর, মহারাষ্ট্র

উত্তর:

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আমার দৃষ্টিতে এই আলোচনায় দুটি সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়কে পরস্পরের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে:

১. পোশাকের মনস্তাত্ত্বিক, নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব;

২. পোশাকের শরয়ি মর্যাদা এবং কোনো নির্দিষ্ট পোশাককে ‘ইসলামি পোশাক’ হিসেবে সাব্যস্ত করার প্রশ্ন।

প্রথম দাবির ক্ষেত্রে একটি সীমিত পর্যায় পর্যন্ত এ কথাটি সঠিক হতে পারে যে পোশাক মানুষের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক পরিচিতি এবং আচার-আচরণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এই সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব থেকে এ সিদ্ধান্ত টেনে আনা যে কোনো বিশেষ পোশাক পরিধান করলে মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঈমান, তাকওয়া বা সত্যোপলব্ধির দিকে ধাবিত হয়—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বড় একটি দাবি, যার সপক্ষে স্বতন্ত্র শরয়ি দলিলের প্রয়োজন।

বিশেষ করে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের জাদুকরদের ঘটনাকে এই দাবির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনা এবং এই ঘটনার সামগ্রিক কুরআনী প্রেক্ষাপটের সাথে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়।

প্রথমত: জাদুকরদের ঈমানকে পোশাকের সাথে সম্পর্কিত করার কোনো কুরআনী দলিল নেই

কুরআন কারীম হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং জাদুকরদের ঘটনা একাধিক স্থানে বর্ণনা করেছে: সূরা আল-আ‘রাফ, সূরা ইউনুস, সূরা ত্বা-হা এবং সূরা আশ-শু‘আরাতে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে।

কিন্তু এই সকল বর্ণনার কোথাও এ কথা বলা হয়নি যে জাদুকররা মূসা আলাইহিস সালামের সাদৃশ্যপূর্ণ পোশাক পরিহিত ছিল, কিংবা তাদের পোশাক তাদেরকে ঈমানের দিকে আকৃষ্ট করেছিল।

এর বিপরীতে কুরআন মাজীদ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে জাদুকরদের ঈমানের সম্পর্ক ছিল হযরত মূসা আলাইহিস সালামের মুজিযা প্রত্যক্ষ করা এবং তার অলৌকিক বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার সাথে।

সূরা আল-আ‘রাফে ইরশাদ হয়েছে:

وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ مُوسَىٰ أَنْ أَلْقِ عَصَاكَ ۖ فَإِذَا هِيَ تَلْقَفُ مَا يَأْفِكُونَ ۝ فَوَقَعَ الْحَقُّ وَبَطَلَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ۝ فَغُلِبُوا هُنَالِكَ وَانقَلَبُوا صَاغِرِينَ ۝ وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ

«আর আমি মূসাকে অহী পাঠালাম—তোমার লাঠিটি নিক্ষেপ করো। অমনি তা তাদের সাজানো মিথ্যাগুলোকে গিলতে শুরু করল। ফলে সত্য প্রতিষ্ঠিত হলো এবং তারা যা করছিল তা বাতিল হয়ে গেল। সেখানে তারা পরাভূত হলো এবং লাঞ্ছিত হয়ে ফিরে গেল। আর জাদুকররা সিজদায় লুটিয়ে পড়ল» (সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:১১৭–১২০)।

সূরা ত্বা-হাতে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা হয়েছে:

فَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سُجَّدًا قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ هَارُونَ وَمُوسَىٰ

«অতঃপর জাদুকররা সিজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং বলল—আমরা হারুন ও মূসার রবের ওপর ঈমান আনলাম» (সূরা ত্বা-হা, ২০:৭০)। এবং সূরা আশ-শু‘আরাতে এসেছে:

فَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ ۝ قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ ۝ رَبِّ مُوسَىٰ وَهَارُونَ

«অতঃপর জাদুকররা সিজদায় লুটিয়ে পড়ল। তারা বলল—আমরা রাব্বুল আলামীনের ওপর ঈমান আনলাম, যিনি মূসা ও হারুনের রব» (সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:৪৬–৪৮)। এখানে কুরআনের বর্ণনাধারা অত্যন্ত সুস্পষ্ট: মুজিযা → সত্যের উন্মোচন → মিথ্যার বিলুপ্তি → সিজদা → ঈমান।

এই সামগ্রিক ধারাবাহিকতার কোথাও পোশাকের দূরতম কোনো উল্লেখও নেই।

দ্বিতীয়ত: জাদুকরদের ঈমানের কুরআনী কারণ হলো মুজিযা প্রত্যক্ষ করা

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাফসীরি মূলনীতি স্মরণে রাখা আবশ্যক: কুরআন যখন কোনো ঘটনাকে বিভিন্ন স্থানে বারবার বর্ণনা করে এবং প্রতিবারই একটি কেন্দ্রীয় কারণ বা অর্থগত তাৎপর্যকে তুলে ধরে, তখন তাকে উপেক্ষা করে অনুল্লিখিত কোনো কারণকে মূল হেতু বানানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতি নয়।

জাদুকররা নিজেরা ছিল জাদুবিদ্যার শীর্ষ বিশেষজ্ঞ। এ কারণেই হযরত মূসা আলাইহিস সালামের লাঠির ঘটনার প্রকৃত স্বরূপ সাধারণ মানুষের চেয়ে তারা অনেক দ্রুত বুঝতে পেরেছিল। তারা মুহূর্তেই চিনে ফেলেছিল যে এটি তাদের জানা জাদুবিদ্যার কোনো কৌশল নয়।

তাই তাদের প্রতিক্রিয়া নিছক কোনো বিস্ময় বা মানসিক আবেগ ছিল না; বরং তারা তৎক্ষণাৎ সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং ঈমানের ঘোষণা দেয়। কুরআনের বাণী:

فَوَقَعَ الْحَقُّ وَبَطَلَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

«ফলে সত্য প্রতিষ্ঠিত হলো এবং তারা যা করছিল তা বাতিল হয়ে গেল»—এই ঘটনার তাত্ত্বিক ভিত্তিটি পুরোপুরি পরিষ্কার করে দেয়: তা হলো সত্যের প্রকাশ এবং বাতিলের ভিত্তিহীনতা প্রমাণিত হওয়া।

এ কারণেই তাফসীরকারকগণ সাধারণত এই ঘটনাকে মুজিযার মাধ্যমে জাদুকরদের সামনে সত্য উন্মোচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটেই ব্যাখ্যা করেছেন, পোশাকের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব হিসেবে নয়।

তৃতীয়ত: পোশাক যদি ঈমানের কারণ হতো, তবে মুজিযার কী প্রয়োজন ছিল?

এই দাবিটি একটি মৌলিক যৌক্তিক প্রশ্নও তৈরি করে। জাদুকররা যদি মূসা আলাইহিস সালামের সাদৃশ্যপূর্ণ পোশাক পরিধান করার কারণেই তাঁর সত্যতা ও নবুওয়াত দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ঈমান এনে থাকত, তবে মূসা আলাইহিস সালামের আর মুজিযা প্রদর্শনের প্রয়োজন কী ছিল?

ঘটনার বাস্তব ধারাবাহিকতা হলো—ফেরাউন জাদুকরদের মোকাবিলার জন্য একত্র করেছিল; তারা তাদের দড়ি ও লাঠি নিক্ষেপ করেছিল; মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর নির্দেশে নিজের লাঠি নিক্ষেপ করলেন; সেই লাঠি তাদের কৃত্রিম জাদুকে নিঃশেষ করে দিল; জাদুকররা সত্য চিনে ফেলল; এবং তারপর সিজদায় লুটিয়ে পড়ে ঈমানের ঘোষণা দিল।

পোশাকই যদি আগে থেকে তাদের সত্যের কাছে পৌঁছে দিয়ে থাকত, তবে এই সমগ্র অলৌকিক ঘটনার বিবরণটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়াত। বস্তুত কুরআনের বর্ণনার সৌন্দর্যই এখানে যে—যারা নিজেরা জাদুতে পারদর্শী ছিল, তারা তাদের নিজস্ব বিদ্যাতেই মুজিযা ও জাদুর পার্থক্য চিনতে পেরে সবার আগে সত্যের সামনে মস্তক অবনত করেছিল।

চতুর্থত: নবীগণের পোশাক এবং বিভিন্ন জাতির পোশাক

আরেকটি নীতিগত প্রশ্ন হলো—কোনো নবীর বিশেষ কোনো পোশাক যদি ঈমান ও হিদায়াতের ওপর এতটাই প্রভাবশালী হতো যে তা পরিধান করলেই মানুষ তাঁর দ্বীন গ্রহণ করে ফেলত, তবে আম্বিয়ায়ে কিরাম আলাইহিমুস সালামের দাওয়াতী ইতিহাস কেন এই তত্ত্বকে সমর্থন করে না?

আম্বিয়ায়ে কিরাম নিজ নিজ জাতির মাঝে প্রেরিত হয়েছিলেন এবং তাঁদের ভাষা, সমাজ ও রীতিনীতির সাথে সংগতিপূর্ণ পরিবেশেই দাওয়াত দিয়েছিলেন। কুরআন মাজীদ স্বয়ং রাসুলগণের প্রেরণের ক্ষেত্রে এই নীতি বর্ণনা করেছে:

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ

«আমি প্রত্যেক রাসূলকেই কেবল তাঁর স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছি» (সূরা ইবরাহীম, ১৪:৪)। একইভাবে সামাজিক পোশাকের ক্ষেত্রেও শরিয়ত কোনো একক জাতির সাংস্কৃতিক পোশাককে সমগ্র মানবতার ওপর চাপিয়ে দেয়নি।

ইসলামের বিস্তারের পর আরব, ইরানি, তুর্কি, আফগান, ভারতীয়, আফ্রিকান, মধ্য এশীয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলমানদের পোশাক নিজ নিজ সভ্যতার ঐতিহ্য অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ছিল। পোশাকের কোনো একক রূপরেখা যদি খোদ ‘ইসলামি পোশাক’ হতো, তবে ইসলামের মধ্যে এই সুবিশাল সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কখনো টিকে থাকত না।

পঞ্চমত: পোশাক ও ঈমানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন পরিহার করা আবশ্যক

এ কথা সত্য যে পোশাক মানুষের আচরণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একটি বিশেষ পোশাক মানুষের মধ্যে কোনো পেশা, প্রতিষ্ঠান, শ্রেণি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর সাথে একাত্মতার অনুভূতি জাগ্রত করতে পারে। ইউনিফর্ম, সামরিক পোশাক, আদালতের পোশাক বা ধর্মীয় পোশাকের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না।

কিন্তু প্রভাব এবং ঈমানের মূল কারণের (ইল্লত) মাঝে এক মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

পোশাক মানুষের অনুভূতি বা সামাজিক পরিচয়কে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু স্বয়ং ঈমানের বাস্তবতাকে পোশাকের প্রভাবের ফসল বলে দাবি করা মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও কোনো সাধারণ নিয়ম নয়, আর কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত কোনো দ্বীনী নীতিও নয়।

ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় পোশাকের মধ্যেই যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঈমান সৃষ্টির ক্ষমতা থাকত, তবে একটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে আসে: এমন পোশাক পরিহিত আলিম ও শায়খগণ যখন কোনো অমুসলিমের সাথে সাক্ষাৎ করেন, তখন কেবল তাঁদের পোশাক দেখেই কি তারা ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে? নিশ্চিতভাবেই তা ঘটে না।

একজন অমুসলিমকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতে তাওহীদ, রিসালাত, কুরআন, আখেরাত, নৈতিকতা, বিবেক-বুদ্ধি এবং সত্যের দাওয়াতের প্রয়োজন থেকেই যায়।

এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে পোশাককে একটি সম্ভাব্য সামাজিক বা মানসিক উপাদান মনে করা এক কথা, আর একে ঈমান ও হিদায়াতের মৌলিক মাধ্যম বানিয়ে ফেলা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

ষষ্ঠত: পোশাকই যদি হিদায়াতের মূল মাধ্যম হয়, তবে অহী ও দাওয়াতের স্থান কোথায় থাকে?

এই মতবাদটিকে যৌক্তিকভাবে তার চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে গেলে এক অদ্ভুত পরিণতি সামনে আসে।

কোনো নবীর পোশাক পরে নিলেই যদি মানুষের ভেতরে এমন পরিবর্তন ঘটে যায় যে সে তাঁর ধর্ম গ্রহণ করে ফেলে, তবে অহী, কুরআন, মুজিযা, শিক্ষা, দাওয়াত এবং যুক্তিতর্কের প্রয়োজনীয়তা তো বহুলাংশে শেষ হয়ে যায়!

অথচ কুরআন মাজীদের সমগ্র কর্মপদ্ধতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কুরআন মানুষকে চিন্তা-ভাবনা, বিবেক, দলিল, অহী এবং ঐশী নিদর্শনের মাধ্যমে সত্য পর্যন্ত পৌঁছায়।

মূসা আলাইহিস সালামের ঘটনাতেও এই নীতি স্পষ্ট: ফেরাউনের সামনে দলিল পেশ করা হয়েছিল, মুজিযা প্রকাশিত হয়েছিল, জাদুকররা সত্যের স্বরূপ চিনেছিল এবং কেবল তখনই তারা ঈমান ঘোষণা করেছিল।

তাই অনুল্লিখিত পোশাককে ঈমানের কার্যকর কারণ বানিয়ে ফেলা প্রকৃতপক্ষে কুরআনে বর্ণিত কার্যকারণ কাঠামোকেই বদলে দেওয়ার নামান্তর, যা প্রামাণ্য তাফসীরের পরিবর্তে এক অপ্রমাণিত অনুমানে পরিণত হয়।

পোশাকের শরয়ি রূপরেখা: দ্বীন এবং সংস্কৃতির মাঝে পার্থক্য

এবার পোশাকের দ্বিতীয় দিকটির দিকে আসা যাক।

এই মাসআলায় আমাদের সমাজে, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে, এক লক্ষণীয় প্রান্তিকতা (ইফরাত ও তাফ্রীত) তৈরি হয়েছে। একটি বিশেষ বেশভূষাকে ‘ইসলামি পোশাক’ বা ‘শরয়ি পোশাক’ নাম দিয়ে তাকে দ্বীনদারির চূড়ান্ত মানদণ্ড বানিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এখানে সর্বপ্রথম দ্বীন এবং সংস্কৃতির মাঝে পার্থক্য করা অপরিহার্য।

দ্বীন হলো আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য, ঈমান, ইসলাম, হালাল-হারাম, নৈতিকতা এবং শরয়ি দায়িত্বের সমষ্টি।

এর বিপরীতে সংস্কৃতি হলো কোনো জাতি বা সমাজের সমষ্টিগত ধ্যানধারণা, প্রথা, অভ্যাস, জীবনপদ্ধতি এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের নাম।

ইসলাম সংস্কৃতিকে পাইকারিভাবে ধ্বংস করেনি; বরং সংস্কৃতির মধ্যে বিদ্যমান শিরক, কুফর, জুলুম এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ উপাদানকে সংশোধন করেছে এবং বাকি বহু সামাজিক রীতিকে বহাল রেখেছে। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম সমাজে পোশাকের রূপরেখা ভিন্ন ভিন্ন।

শরয়ি পোশাকের ভিত্তি: বাহ্যিক আকৃতি নয়, শরয়ি গুণাবলী

পোশাক সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্ন এটি হওয়া উচিত নয় যে “এটি আরবি না আজমি?” কিংবা “এটি ভারতীয় না পাশ্চাত্য?”

বরং মৌলিক প্রশ্নগুলো হওয়া উচিত:

১. এই পোশাক কি শরয়ি সতর যথাযথভাবে আবৃত করে?

২. পোশাকটি কি নিজে কোনো হারাম উপাদানে তৈরি নয়?

৩. এটি পরিধান করলে কি অন্য কোনো শরয়ি নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন ঘটে?

৪. এটি কি অহংকার, প্রদর্শনপ্রিয়তা, অপচয় বা কোনো নিষিদ্ধ উদ্দেশ্যের মাধ্যম নয়?

উদাহরণস্বরূপ, পুরুষের জন্য খাঁটি রেশম পরিধানের নিষেধাজ্ঞা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। একইভাবে কোনো পোশাক যদি কোনো ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা বা অহংকার ও অহমিকার কারণ হয়, তবে তার বিধানও ভিন্ন হবে।

কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞাসমূহ থেকে এমন কোনো মূলনীতি তৈরি করা যায় না যে একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পোশাক ছাড়া বাকি সমস্ত পোশাকই অনৈসলামিক।

কেবল কুর্তা-পায়জামাই কি ‘ইসলামি পোশাক’?

কুর্তা ও পায়জামা একটি পরিচিত, শালীন এবং শরয়ি সীমারেখার মধ্যে থাকলে নিঃসন্দেহে সম্পূর্ণ বৈধ পোশাক। একইভাবে আরবদের ছওব, সালোয়ার কামিজ, জুব্বা, পাগড়ি এবং অন্যান্য প্রচলিত পোশাকও নিজ নিজ শর্তসাপেক্ষে পুরোপুরি বৈধ হতে পারে। কিন্তু কোনো একটি পোশাককে ‘ইসলামি’ আখ্যা দিয়ে অন্য বৈধ পোশাকসমূহকে ‘অনৈসলামিক’ বলার জন্য স্বতন্ত্র শরয়ি দলিলের প্রয়োজন।

এই মূলনীতির আলোকেই প্যান্ট ও শার্ট যদি যথাযথভাবে সতর আবৃত করে, স্বচ্ছ বা অতিরিক্ত আঁটসাঁট না হয়, নিজে কোনো হারাম উপাদানে তৈরি না হয় এবং অহংকার বা অন্য কোনো শরয়ি লঙ্ঘনের মাধ্যম না হয়, তবে কেবল পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে তা শরয়িভাবে হারাম বা অনৈসলামিক হয়ে যায় না।

কোনো পোশাক পশ্চিমা হওয়া এবং কোনো পোশাক শরিয়তবিরোধী হওয়া দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একইভাবে কোনো পোশাক আরবি বা উপমহাদেশের হওয়া এবং তা শরয়ি পোশাক হওয়াও সমার্থক নয়।

সুন্নাহ এবং প্রথার (উরফ) মাঝে পার্থক্য

এখানে সুন্নাহর ধারণাকেও গভীর প্রজ্ঞার সাথে বুঝতে হবে।

নবী করীম ﷺ-এর পবিত্র জীবনে পোশাকের একাধিক রূপ দেখা যায়, কিন্তু সেগুলোর প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়কে একটি স্বতন্ত্র বিধিবদ্ধ বিধান মনে করা সঠিক নয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ যে সমাজে আগমন করেছিলেন, সেখানে প্রচলিত সাধারণ শালীন পোশাকই তিনি পরিধান করতেন। কোনো পোশাককে রাসূলুল্লাহ ﷺ ব্যবহার করেছেন বলেই যদি সুন্নাহ বলা হয়, তবে এই পরিভাষা ব্যবহারের সময় একটি স্পষ্ট পার্থক্য মনে রাখতে হবে: সেই পোশাকটি কি ইবাদত হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল, নাকি অভ্যাস ও প্রথা হিসেবে?

ফকীহদের কাছে ‘সুন্নাতে আদিয়্যাহ’ (অভ্যাসগত সুন্নাহ) এবং ‘সুন্নাতে তাশরীয়্যাহ’ (বিধিবদ্ধ সুন্নাহ)-এর তাত্ত্বিক আলোচনায় এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পোশাকের প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর অনুসরণের নিয়ত নিঃসন্দেহে এক অত্যন্ত বরকতময় আমল; কিন্তু একে সমগ্র উম্মাহর জন্য একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ইউনিফর্মে রূপান্তর করা শরিয়তের মেজাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

‘ইসলামি মেকআপ’ এবং দ্বীনদারির বাহ্যিক মানদণ্ড

আমাদের সমাজে আরেকটি সমস্যা দেখা দিয়েছে—কিছু বাহ্যিক প্রতীককে দ্বীনদারির প্রায় চূড়ান্ত মানদণ্ড বানিয়ে ফেলা হয়েছে।

একটি নির্দিষ্ট পোশাক, টুপি, পাগড়ি, দাড়ি বা বেশভূষা দেখে মানুষের ঈমান, তাকওয়া এবং জ্ঞানগত মর্যাদা সম্পর্কে এমন সব রায় দেওয়া শুরু হয় যার কোনো নিশ্চিত জ্ঞান আমাদের কাছে নেই।

এই মানসিকতা মানুষকে আনুষ্ঠানিকতা ও বহির্মুখী রূপসর্বস্বতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

পোশাক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পোশাকই দ্বীনের সবকিছু নয়। কুরআন মাজীদ এই বাস্তবতাকে অতীব সমন্বিত ভাষায় তুলে ধরেছে:

وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ

«আর তাকওয়ার পোশাক—তা-ই সর্বোৎকৃষ্ট» (সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:২৬)। একইভাবে আল্লাহ তাআলা ইবাদুর রহমানের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন:

وَعِبَادُ الرَّحْمَٰنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا

«আর দয়াময়ের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে বিনম্রভাবে চলাফেরা করে» (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৩)।

এই আয়াতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দ্বীনের আসল কাঙ্ক্ষিত বিষয় হলো তাকওয়া, বিনয়, সচ্চরিত্র, ইবাদত এবং আনুগত্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরআন ও সুন্নাহর এক ভারসাম্যপূর্ণ ও সঠিক উপলব্ধি দান করুন, জাহির ও বাতিন উভয়টির সংশোধনের তাওফিক দিন, প্রান্তিকতা থেকে রক্ষা করুন, এবং এমন দ্বীনী প্রজ্ঞা দান করুন যার মাধ্যমে শরয়ি নসূস, ফিকহি উসূল এবং মানব সমাজের পারস্পরিক সম্পর্কের মেলবন্ধনকে সঠিকভাবে বোঝার তৌফিক লাভ হয়।

———

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ AI
🔗 https://t.me/DrAkramNadwi/10433