যাকাত ও সদকার অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে জমি কেনার শরয়ি হুকুম।

ফিকহহাদিস
স্থানধারক ছবি

| প্রশ্ন:

সম্মানিত আলিমে দ্বীন এবং রুচিশীল কবি ও সাহিত্যিক, মাওলানা ইরফানুল হক সাহেব মাযাহেরী (মাদ্দা জিল্লাহু) এর পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত প্রশ্ন এসেছে :

মাদরাসায় যাকাত, ফিতরা ইত্যাদির যে অর্থ আসে, যদি তা বছরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়, তবে সেই অর্থ দিয়ে মাদরাসার জন্য জমি কেনার অনুমতি শরীয়ত অনুযায়ী আছে কি না?

মাদরাসায় প্রয়োজন অনুযায়ী নির্মাণ বিদ্যমান। এক জায়গায় দশ বিসওয়া জমিতে চারদিকজুড়ে কক্ষ ও পাঠশালা নির্মিত রয়েছে। আরেক স্থানে, কিছুটা দূরে, মাদরাসার আরও একটি ভবন রয়েছে, যার মাধ্যমে বর্তমানে মাদরাসার সব প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে।

অতএব জমি কেনা শিক্ষামূলক বা নির্মাণমূলক প্রয়োজনের কারণে নয়, বরং উদ্দেশ্য হলো—অতিরিক্ত টাকাকে ব্যাংকে রাখার পরিবর্তে জমি কিনে সংরক্ষণ করা, যাতে ভবিষ্যতে যখন প্রয়োজন হবে তখন তা বিক্রি করে মাদরাসার কাজে ব্যবহার করা যায়।

| উত্তর:

যাকাত ও সদকার মূল খরচের ক্ষেত্র আল্লাহ তা’আলা কুরআনুল কারিমে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন:

“إنما الصدقات للفقراء والمساكين والعاملين عليها والمؤلفة قلوبهم وفي الرقاب والغارمين وفي سبيل الله وابن السبيل فريضة من الله والله عليم حكيم”
(সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৬০)

অর্থাৎ—সদাক্বাহ হল ফকীর, মিসকীন ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারী ও যাদের মন জয় করা উদ্দেশ্য তাদের জন্য, দাসমুক্তি ও ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (ব্যয়ের জন্য) আর মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ফরয। আর আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ, মহাবিজ্ঞানী।

রাসূলুল্লাহ ﷺ যাকাতের উদ্দেশ্যকে এভাবে বর্ণনা করেছেন:

“تؤخذ من أغنيائهم وترد على فقرائهم”
(সহিহ বুখারি, কিতাবুয যাকাত)

অর্থাৎ—যাকাত ধনীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে এবং গরিবদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এগুলো থেকে স্পষ্ট যে যাকাত ও সদকার আসল উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র ও অভাবীদের প্রয়োজন মেটানো। বিধবা, এতিম, অসহায় মানুষ, অক্ষম ব্যক্তি এবং বিবাহপ্রত্যাশী দরিদ্র কন্যারা এ খাতে সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।

যেহেতু দারুল উলুমগুলো দ্বীনের সংরক্ষণ, প্রচার ও বিস্তারের কেন্দ্র, তাই কিছু ফকীহ তাদেরকে “ফি সাবিলিল্লাহ” এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সেই ভিত্তিতে মাদরাসায় যাকাতের অর্থ খরচ করা যেতে পারে। তবে এরও কিছু নীতি ও সীমা রয়েছে:

অভাবী ছাত্রদের খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক ও শিক্ষা খরচে।

প্রকৃত দরিদ্র ও প্রয়োজনমন্দ শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতনে।

শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক প্রয়োজনীয় স্থাপনায়—যেমন পাঠশালা, কক্ষ, টয়লেট ইত্যাদিতে।

অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় ভবন, বিলাসবহুল স্থাপনা, বিশাল অতিথিশালা বা চাকচিক্যময় নির্মাণ যাকাতের খরচের অন্তর্ভুক্ত নয়।

আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী, মাদরাসার বিদ্যমান ভবন ও পাঠশালা ছাত্র-শিক্ষকদের প্রয়োজন মেটাচ্ছে। অতিরিক্ত জমি কেনার কারণ শিক্ষামূলক বা নির্মাণমূলক নয়, বরং কেবল এই যে, অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকে রাখার বদলে জমি কিনে রাখা হোক, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনে বিক্রি করে কাজে লাগানো যায়।

এ পদ্ধতি শরয়ি দিক থেকে সঠিক নয়। কারণ, যাকাতের অর্থ “সংরক্ষণ” বা “বিনিয়োগ” করার জন্য ব্যবহার করার অনুমতি কিতাব-সুন্নাহ বা ফকীহদের বক্তব্যে পাওয়া যায় না। এতে যাকাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য—অভাবী মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানো—অপূরণীয় থেকে যায়।

মাদরাসার কাছে যদি বছরের চাহিদার চেয়ে বেশি যাকাত ও ফিতরার অর্থ থাকে, তবে সঠিক পদ্ধতি হলো তা দ্রুত প্রকৃত উপযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া। যেমন—যেসব শিক্ষক বা কর্মচারীর নিজস্ব ঘর নেই, তারা যেন ছোটখাটো ঘর বানাতে পারেন, কিংবা মধ্যম মানের বিবাহের খরচ চালাতে পারেন, অথবা বাড়ির কারো চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারেন। যদি শিক্ষকরা নিজেরাই স্বচ্ছল ও সম্পদশালী হন, তবে এই অতিরিক্ত অর্থ শহর বা আশেপাশের গ্রামের গরিব, অভাবগ্রস্ত, বিধবা ও এতিমদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।

সারসংক্ষেপ: যাকাত ও ফিতরার অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে জমি কেনা বা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করা যাকাতের খরচের বাইরে পড়ে। এগুলোকে দ্রুত অভাবী মানুষের মধ্যে বণ্টন করা জরুরি, যাতে যাকাতের মূল লক্ষ্য পূর্ণ হয় এবং আল্লাহর এই ফরজ “فريضةً من الله” এর সঠিক প্রতিপালন হয়।

———-

ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, ফিকহ,
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7025

শেয়ার করুন হোয়াটসঅ্যাপ টেলিগ্রাম
স্থানধারক ছবি
ফিকহবিবাহ

বিবাহ-প্রস্তাব যাচাইয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার: ইসলামী নীতিমালা ও শিষ্টাচার

ড. মুহাম্মদ আকরাম নদভী অক্সফোর্ড ১৯ আগস্ট ২০২৬ প্রশ্ন: ড. হিনা ফাতিমা সাইয়দ, মুম্বাই থেকে জিজ্ঞেস করেন— আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু। আজকের…

আরও পড়ুন →
নাবালক সন্তানের সম্পদের যাকাত
ফিকহ

নাবালক সন্তানের সম্পদের যাকাত

২৫/৩/২০২৬ প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আশা করি আপনি ভালো আছেন। যদি কোনো নাবালক শিশুর কাছে উপহার হিসেবে কিছু স্বর্ণ থাকে, তবে…

আরও পড়ুন →
প্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিবাহ
ফিকহ

প্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিবাহ

৬/৩/২০২৬ প্রশ্ন: একজন নারী তালাকের পর নিজের কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে থাকেন। কন্যাটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তিনি তার বিয়ে দেন, কিন্তু সেখানে পিতার অনুপস্থিতিতে নানা…

আরও পড়ুন →

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।