নারীরা পুরুষদের মালিকানায় নয়।

কুরআনতাফসীরনারী
Men don’t own women

———-

“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী—তারা একে অপরের সহায়ক। তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে। এরাই সেই লোক, যাদের প্রতি আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আত-তাওবা: ৭১)

এই আয়াতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নারী-পুরুষ উভয়ের পরিপূরক দায়িত্বের দিকটি বর্ণিত হয়েছে। একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হয়ে নয়, বরং তারা পারস্পরিক সহযোগী ও সহায় হয়ে থাকে। সমাজে সৎকাজ প্রতিষ্ঠা ও অসৎকাজ দূর করার ক্ষেত্রে উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে—তা শিক্ষা, দিকনির্দেশনা কিংবা সংস্কারমূলক অন্য কোনো কাজের মাধ্যমেই হোক না কেন।

এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য পুরুষ ও নারী উভয়েরই নিজের দ্বীনের সঠিক জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে জ্ঞানার্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা, যাতে তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তা পৌঁছে দিতে পারে এবং সমাজের ধারাবাহিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

সম্প্রতি এক খ্যাতিমান কুরআন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নাবালিকা মেয়েদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর মুসলিম নেতৃত্ব—নারী ও পুরুষ উভয়েই—ভীষণ আতঙ্ক, ক্ষোভ ও গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। আমাদের সমাজে ঘটে চলা এ ধরনের ঘটনাগুলো এক ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে আনে: অপরাধীরা প্রায়ই শাস্তি এড়িয়ে যায়, ন্যায়বিচার অধরাই থেকে যায়। অথচ এই ভয়াবহ অন্যায়ের পরও কেউ কেউ এখন নারীদের স্বাধীনতা সীমিত করার কথা বলছে—তাদের মসজিদ, শিক্ষাকেন্দ্র, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক অঙ্গনে প্রবেশাধিকার সংকুচিত করার প্রস্তাব দিচ্ছে।

এটি চরম অবিচার যে আবারও নারীরাই নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে, অথচ তারাই মূলত এসব অপরাধের শিকার। যদি স্বাধীনতা সীমিত করতেই হয়, তবে সেটি হওয়া উচিত পুরুষদের—যারা এই অপরাধগুলোর জন্য দায়ী। নারীর স্বাধীনতা সীমিত করার এ আহ্বান এক ভয়াবহ ভ্রান্ত ধারণার প্রতিফলন: যেন নারী পুরুষের মালিকানায়, এবং তাদের অধিকার ও স্বাধীনতা পুরুষের নিয়ন্ত্রণাধীন। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, নারী-পুরুষ উভয়েই শেষ পর্যন্ত কেবল তাঁদের স্রষ্টার কাছেই দায়বদ্ধ। কর্তব্য ও দায়িত্ব নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার শুধু তাঁরই।

নারীরা যেমন, পুরুষরাও তেমনি সমাজে সমানভাবে অংশগ্রহণ ও অবস্থান করার অধিকার রাখে। উভয়েই তাদের স্রষ্টার সামনে জবাবদিহি করবে, আর কিয়ামতের দিন তিনি-ই একমাত্র বিচারক হবেন, কে তাঁর আনুগত্য করেছে আর কে করেনি। এই জীবন একটি পরীক্ষা, আর আল্লাহ নারী-পুরুষ উভয়কেই সমান সুযোগ দিয়েছেন নিজেদের দায়িত্ব পূরণের জন্য। তাই এসব সুযোগ সীমিত করার যেকোনো প্রয়াস সরাসরি তাঁর দিকনির্দেশনার বিরোধী।

অসদাচরণ ঘটলে তা মোকাবিলার ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকর উপায় আছে, যাতে নারী-পুরুষ উভয়ই নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। কিন্তু এমন ঘটনার অজুহাতে নারীর অধিকার খর্ব করা এক বিভ্রান্ত অহংকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

কুরআন জাহিলিয়াত যুগের (ইসলামের পূর্বেকার অজ্ঞতার যুগ) নারীবিরোধী মনোভাবকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করেছে। কন্যা জন্মের সংবাদ পেলে তাদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কুরআন বলছে:

“যখন তাদের কারও কাছে কন্যা সন্তানের সংবাদ পৌঁছে, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায়, আর সে ভেতরে ভেতরে ক্রোধ ও দুঃখে ভরে ওঠে। সে মানুষের কাছ থেকে আত্মগোপন করে, কারণ সে যে সংবাদ পেয়েছে তা তার কাছে অপমানজনক। সে কি তাকে লাঞ্ছিত অবস্থায় রাখবে, নাকি মাটির নিচে পুঁতে দেবে? আহা! কীই না মন্দ তাদের এই ফয়সালা!” (সূরা النحل ১৬:৫৮-৫৯)

সেই সময়ে কিছু (যদিও সব নয়) আরব গোত্রের মধ্যে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার ভয়াবহ প্রথা প্রচলিত ছিল। কুরআন এই কাজের তীব্র নিন্দা করেছে এবং কিয়ামতের দিনের কঠিন শাস্তির সতর্কতা দিয়েছে:

“আর যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” (সূরা التكوير ৮১:৮-৯)

যদিও আজ সেই প্রথা আর নেই, তবুও বিভিন্নভাবে নারীর অধিকার ও সুযোগ খর্ব করা হয়। নারীদেরকে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন ও বোঝার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা মানসিক ও আত্মিকভাবে তাদেরকে যেন জীবন্ত কবর দেওয়ার শামিল। প্রকৃত সম্মান ও ক্ষমতায়ন হলো তাদেরকে জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সমান সুযোগ দেওয়া—যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দ্বারা স্বীকৃত অধিকার।

কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে মানবাধিকার ও দায়িত্ব দু’টি মূল নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রথমত, সব মানুষই আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর দাস। দ্বিতীয়ত, সমগ্র মানবজাতি একক নফস (আত্মা) থেকে উদ্ভূত, যেমন কুরআনে বলা হয়েছে (সূরা النساء ৪:১):

“হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি সচেতন হও, যিনি তোমাদেরকে একক নফস থেকে সৃষ্টি করেছেন, এবং তা থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, আর এ দু’জন থেকে বহু পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আল্লাহকে ভয় কর—যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বদা তোমাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক।”

প্রত্যেক মানুষ আল্লাহর কাছে ব্যক্তিগতভাবে দায়বদ্ধ, এই জীবনে তাদের দায়িত্ব ও পরকালে তাদের প্রতিদান একক ও স্বতন্ত্র। প্রতিভা ও সুযোগের বৈচিত্র্য এই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না। তাই আল্লাহ ও বান্দার মাঝে কোনো মধ্যবর্তী কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন নেই। ইবাদতের সব বিষয় এবং দুনিয়াবি বিরোধের সমাধান কেবল কুরআন ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। এ নির্দেশনার অধিকার কোনো নির্দিষ্ট গোত্র (যেমন কুরাইশ অন্য আরব বা অনারবদের ওপর), কোনো বিশেষ লিঙ্গ বা সামাজিক মর্যাদার একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; বরং এটি নির্ভর করে শুধু একজন মানুষের কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান ও আনুগত্যের ওপর।

যৌন নির্যাতনের ঘটনা মোকাবিলা করতে হলে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং দুর্বলদের সুরক্ষার ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও নীতিসম্পন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এর দুটি মৌলিক ধাপ হলো—

১. অভিযোগ জানানো ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা:
যে কোনো অভিযোগ বা যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে তা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার চাওয়া কেবল নৈতিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি আমাদের ঈমানেরও দাবি। এভাবে আমরা নির্যাতিতদের মর্যাদা রক্ষা করি এবং আমাদের দ্বীনের স্বচ্ছতা বজায় রাখি। কেউ কেউ বলতে পারেন যে এসব অপরাধ প্রকাশ করলে ইসলাম ও এর নেতৃত্বের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়; কিন্তু এটি ভীষণ ভ্রান্ত ধারণা। অপরাধ গোপন করা, অপরাধীদের রক্ষা করা এবং ভুক্তভোগীদের অবহেলা করা কোনো ধার্মিকতা নয়। বরং জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারই হলো আমাদের প্রকৃত মূল্যবোধের প্রতিফলন।

২. নিরাপদ ও সীমানাসম্পন্ন মেলামেশা নিশ্চিত করা:
অসদাচরণের সুযোগ কমাতে হলে নারী-পুরুষ (যারা মাহরাম নয়) পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও নিরাপদ সীমানা বজায় রাখা অপরিহার্য। অভিভাবকদের উচিত নয় সন্তানদের পড়াশোনার জন্য অপরিচিতদের বাড়িতে পাঠানো, কিংবা শিক্ষকদের নিজেদের বাড়িতে ডাকা। বেশিরভাগ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে এমন গোপন পরিবেশেই। মনে রাখা দরকার, আলেম, দাঈ বা শিক্ষকও শেষ পর্যন্ত অন্যদের মতোই মানুষ। তাই তাদের সঙ্গে সম্পর্কও সতর্কতার সঙ্গেই হওয়া উচিত। নারী ও পুরুষ উভয়ের উচিত শিক্ষকের বা আলেমের সঙ্গে সম্মানজনক কিন্তু প্রকাশ্য ও পেশাদারিত্বপূর্ণ পরিবেশে মেলামেশা করা। নিজের ও অন্যের সুরক্ষার জন্য যথাযথ সীমানা বজায় রাখা অবিশ্বাস নয়; বরং এটি সবার জন্য একটি নিরাপদ ও নৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার সচেতন পদক্ষেপ।

পূর্বে উল্লিখিত বিষয়ের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, আমাদের উচিত এমন সমাধান খোঁজা যা কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। এ-ও মনে রাখতে হবে যে নারী-পুরুষ উভয়েই আল্লাহর বান্দা, আর কিয়ামতের দিনে উভয়েই সমানভাবে প্রতিদান লাভ করবে। এ বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে কুরআনের একটি বহুল পরিচিত আয়াতে, যার অবতরণের প্রেক্ষাপট হাদিসে উল্লিখিত আছে—আব্দুর রহমান ইবনে শায়বাহ বর্ণনা করেন, তিনি উম্মু সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)—রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী—এর মুখে শুনেছেন:

“আমি রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলাম: ‘কেন কুরআনে আমাদের [নারীদের] নাম পুরুষদের মতো করে উল্লেখ করা হয়নি?’ তারপর সেদিন বিকেলে আমি তাঁকে মিম্বর থেকে ডাকতে শুনলাম। তখন আমি চুল আঁচড়াচ্ছিলাম, দ্রুত তা গুটিয়ে নিয়ে বাড়ির একটি কক্ষে গিয়ে মনোযোগ দিয়ে শোনার জন্য দাঁড়ালাম। তখন আমি তাঁকে মিম্বর থেকে বলতে শুনলাম:

‘হে মানুষ, আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেন: মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, আনুগত্যশীল পুরুষ ও আনুগত্যশীল নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, যারা লজ্জাস্থান হেফাজত করে সেই পুরুষ ও সেই নারী, আর যারা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে সেই পুরুষ ও সেই নারী—আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।’”

——————–
ক্যাটাগরি : আখলাক, তালিম।
—
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/6696

তাফসির, তাওয়িল ও তাদাব্বুর
কুরআনতাফসীর

তাফসির, তাওয়িল ও তাদাব্বুর

প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়া থেকে সম্মানিতা ডা. আমশা নাহিদ সাহেবা নিম্নোক্ত প্রশ্ন পাঠিয়েছেন: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ, সম্মানিত শাইখ। একজন বোন প্রশ্ন করেছেন। তিনি…

আরও পড়ুন →
সুরা আল-ফজরের শুরুতে শপথসমূহের তাৎপর্য।
কুরআনতাফসীর এআই-অনূদিত

সুরা আল-ফজরের শুরুতে শপথসমূহের তাৎপর্য।

প্রশ্ন: কিছু কোরআন গবেষণায় আগ্রহী গবেষক আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, সুরা আল-ফজরের শুরুতে যে শপথগুলো করা হয়েছে, সেগুলোর আসল উদ্দেশ্য কী ? তিনি বিভিন্ন তাফসিরের…

আরও পড়ুন →
নারীর শিক্ষা।
জ্ঞানচর্চা ও পদ্ধতিনারী এআই-অনূদিত

নারীর শিক্ষা।

আজকের দিনে মুসলমানদের সামনে যেসব জটিল সমস্যা দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো— “ইসলামে নারীর মর্যাদা”। এই সমস্যাটিকে গভীরভাবে বোঝার এবং এর…

আরও পড়ুন →