ইতিহাস ও হাদিস: সাদৃশ্য ও পার্থক্য।
——————
بسم الله الرحمن الرحيم.
আমি একাধিক জায়গায় লিখেছি যে হাদিস এক ধরনের ইতিহাস, যেমন মানুষ এক প্রকার প্রাণী। তবে এই সাদৃশ্যকে সমতা ভাবা যাবে না, এবং এদের পার্থক্য অস্বীকারও করা যাবে না। হাদিসের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে, যা তাকে ইতিহাস থেকে আলাদা করে, যেমন মানুষের এমন গুণ আছে, যা তাকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করে। এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো এই পার্থক্য ব্যাখ্যা করা এবং দেখানো যে হাদিস নিজেই একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র, যদিও মূলত তা সাধারণ ইতিহাসের পরিসরের মধ্যেই পড়ে।
“তারিখ” শব্দটির মূল অর্থ গ্রিক ভাষায় হলো প্রশ্ন, অনুসন্ধান ও খোঁজখবর। কিন্তু ইতিহাস কি কখনও সরল কোনো প্রশ্ন বা নিরপেক্ষ কোনো অনুসন্ধান ছিল? ইতিহাস কি কেবল ন্যায্য ও পক্ষপাতহীন বর্ণনা? কখনোই নয়! ইতিহাস আসলে এক ধরনের গল্পগাঁথা, সাজানো কাহিনি, অতীতকে বর্তমানের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্নির্মাণ। ইতিহাসবিদেরা—বিশেষত পাশ্চাত্যের ইতিহাসবিদেরা—দাবি করেন, তাদের লেখা কল্পনা নয়, সত্যি; মিথ্যা নয়, বাস্তব। কারণ, তাদের মতে, তারা এটিকে গবেষণা ও প্রমাণের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কিন্তু কেবল দাবি করলেই কি সেই বর্ণনা সত্য হয়ে যায়? বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কি প্রবল পক্ষপাতকে ঠেকাতে পারে?
ইতিহাসবিদের কাছে কিছু উপায় থাকে খবর যাচাই করার: বর্ণিত কাহিনি, নথি ও দলিল, খননকৃত নিদর্শন। এগুলো মিলিয়ে তিনি নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগান, সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সাথে তুলনা করেন, বিচার করেন কোনটি সত্য হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, আর কোনটি জাল বা মনগড়া। তবে এই পরীক্ষা ইতিহাসের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, বরং তার দরজা ও ভূমিকা মাত্র। যখন ইতিহাসবিদ লেখার টেবিলে বসেন, তখন তিনি ঘটনাগুলোকে একটি গাঁথুনিতে বাঁধেন, ধারাবাহিকতায় সাজান, বেছে নেন সেসব অংশ, যা তার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বোধগম্য, কারণব্যাখ্যায় স্পষ্ট এবং শিক্ষণীয়। তাই ইতিহাস মূলত এক সাহিত্যকর্ম—যদিও ঘটনার সীমানায় বাঁধা। কিন্তু এই সীমানা ইতিহাসকে কল্পনার চেয়ে সত্য করে তোলে না, আবার কল্পনাকে মিথ্যার চেয়েও দূরে সরায় না। আসল সত্য নির্ভর করে লেখকের চরিত্রের ওপর, তার সততার ও তার পেশাগত নীতির প্রতি আনুগত্যের ওপর।
আজ আমার আলোচনার বিষয় সেই আনুগত্য ও সততা। হাদিস সংকলনকারী মহামান্য ইমামগণ কেবল বেখেয়ালি পরিবেশক বা অচেতন বর্ণনাকারী ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন সূক্ষ্ম দৃষ্টি ও সমালোচনাশক্তির অধিকারী, জ্ঞানী, ফকিহ, এবং পার্থক্য নির্ণয়ে অভিজ্ঞ। তাঁরা হাদিসের ক্ষেত্রে সত্যের খোঁজ করেছেন যেমন তৃষ্ণার্ত মানুষ পানির খোঁজ করে। তাঁরা দুর্বল হাদিসও লিপিবদ্ধ করেছেন, কিন্তু কেবল যেন তা দুর্বল বলেই জানা যায় এবং কেউ প্রতারিত না হয়। তাঁরা মতভেদপূর্ণ বর্ণনাও সংরক্ষণ করেছেন, যেন তা উপেক্ষিত বা বিস্মৃত না হয়। তবে এই প্রসঙ্গে প্রবেশ করার আগে, ইতিহাসের প্রকৃতি নিয়ে আরও কিছু স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
ইতিহাস যতই তার রচয়িতারা সত্য দাবি করুন না কেন, নতুন সত্য উদ্ঘাটিত হলে তা ভেঙে যেতে পারে, বা পুরোনো তথ্য যাচাইয়ের আরও সূক্ষ্ম উপায় আবিষ্কার হলে বদলে যেতে পারে। কাহিনি পাল্টানো যায়, কিন্তু অনুসন্ধান মুছে যায় না; বর্ণনা পরিবর্তিত হয়, কিন্তু ইতিহাসচর্চার পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে পড়ে না। তবে রাজনৈতিক ইতিহাস অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হয়েছে, সম্রাটদের স্বার্থ ও জাতিগত আকাঙ্ক্ষার খাতিরে। তবুও ইতিহাসের ভেতরে সাহিত্যিক প্রভাব থেকে যায়, যদিও সত্যের ভবন ভেঙে পড়ে। আপনারা কি শুনেননি—“অমুক বাঁশি বাজাচ্ছে, আর দেশ জ্বলছে”—যা রোমান সম্রাট নীরো সম্পর্কে বলা হয়? বলা হয়, তিনি আগুনে পুড়তে থাকা রোমকে ছেড়ে সুর বাজাচ্ছিলেন। অথচ বাস্তবতা হলো, সে সময় তিনি রোমেই ছিলেন না। ইতিহাস মুছে গেছে, কিন্তু প্রবচন টিকে গেছে; ঘটনা মিথ্যা হয়েছে, কিন্তু শিক্ষা রয়ে গেছে।
এর চেয়েও আশ্চর্য হলো, কিছু মুসলিম পাশ্চাত্যের এই ইতিহাসপদ্ধতির কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। তাঁরা বললেন, পাশ্চাত্যের পদ্ধতি আমাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় বেশি সত্যনিষ্ঠ। আর আগেকার ইমামরা ধর্মভক্তির কারণে প্রতারিত হয়েছেন, কিংবা মাজহাবের বাঁধনে আবদ্ধ ছিলেন; তাঁরা এমন কথা নবী ﷺ–এর নামে বর্ণনা করেছেন, যার কোনো ভিত্তি নেই। আমি অস্বীকার করি না যে জ্ঞান বাড়তে থাকে, গবেষণার উপকরণ উদ্ভাবিত হয়। কিন্তু সত্য তো চিরন্তন, তা কোনো যন্ত্রের অগ্রগতিতে ম্লান হয় না, আবার কোনো যন্ত্রের অভাবে অদৃশ্যও হয় না।
ভাবুন—এক পুরোনো কাহিনি, যেখানে অধিকাংশ বর্ণনা বলে এর নায়ক তীর ছুড়ত, অল্প কিছু বর্ণনায় তাকে কুঠারধারী বলা হয়েছে। পরে খননকৃত নিদর্শনে দেখা গেল বেশির ভাগই তীরন্দাজের ছবি, অল্প কয়েকটি কুঠারধারীর। তারপর বলা হলো, এই নিদর্শনগুলো আগের গল্পের চেয়ে দুইশো বছর পরের, আর সেই বিখ্যাত যুদ্ধ যেখানে তীরের ব্যবহার প্রচলিত হলো, তা ঘটেছিল নিদর্শনের পঞ্চাশ বছর পর। তারপর এলেন এক সমালোচক, তিনি শব্দ ও ছন্দ বিশ্লেষণ করে ঘোষণা করলেন: আসল অস্ত্র কুঠার, তীর ধরা ঘটনা কেবল পরে যুক্ত হয়েছে। প্রশ্ন
হলো—এই কাহিনি কি সত্য হলো, কারণ এতে নিদর্শন ও পরীক্ষা আছে? নাকি এটা আসলে কেবল এক বর্ণনা, যেখানে গবেষক তার সংস্কৃতির অভ্যাস অনুযায়ী বেছে নিয়েছে ও ব্যাখ্যা করেছে? সত্য তো সত্যই থাকে, প্রমাণ প্রমাণই থাকে। কিন্তু বর্ণনা সবসময় রচয়িতার সংস্কৃতি ও অভ্যাস দ্বারা গঠিত হয়।
পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদেরা মুসলিমদের উত্থানকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন: এটা ছিল জনসংখ্যার চাপ, গোত্রগুলোর নতুন ভূমি ও দ্রুত সম্পদের চাহিদা। হাদিস সম্পর্কেও তাঁরা এমনই করেছেন—সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তারপর কিছু মুসলিম এসে বললেন: হ্যাঁ, এটাই হলো সঠিক পদ্ধতি, এটাই হলো কঠোর বুদ্ধিবৃত্তি। অথচ তা ছাড়া আর কিছু নয়—প্রভাবশালী সংস্কৃতির প্রভাব, এমন এক পদ্ধতি, যা কেবল পাঠ্যকে নিজের কর্তৃত্বের অধীনে আনতে চায়।
আমরা স্পষ্টভাবে পার্থক্য করি—প্রাথমিক সমালোচনার (النقد التمهيديّ) মধ্যে, যা ইতিহাস নির্মাণের ভিত্তি হতে পারে, আর মানুষের জন্য রচিত বর্ণনার (السرد) মধ্যে। কোনো নির্দিষ্ট হাদিসে, নির্দিষ্ট কোনো বর্ণনাকারীতে, অথবা নির্দিষ্ট কোনো সনদপথে সন্দেহ প্রকাশ করা—এটাই আসল গবেষণার কাজ, এটাই প্রকৃত শিল্পকলা। কিন্তু প্রতিটি হাদিসকেই জাল ধরে নেওয়া, যতক্ষণ না তার সত্য প্রমাণিত হয়—এমন ধারণা আসলে কোরআনকেই সন্দেহ করা; কেননা কোরআনের সত্য নির্ভর করে যে রাসুল ﷺ তা পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর সত্যনিষ্ঠতার ওপর, আর রাসুলের সত্যনিষ্ঠা নির্ভর করে তাঁর কথাবার্তায় ও ব্যাখ্যায় আমানতদারির ওপর।
ইমামগণ হাদিস অনুসন্ধান করেছেন আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীর মতো, তাঁর নবির সুন্নাহ ভালোবেসে। তাঁরা লিপিবদ্ধ করেছেন সেই সব হাদিস, যা মানুষকে ইবাদতে, লেনদেনে, চরিত্রে ও আচার-আচরণে দিশা দেয়; ইতিহাসের কাহিনি সাজানোর জন্য নয়। হাদিসে যুদ্ধের ঘটনাবলী, অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ইত্যাদি খুব অল্প; বাকিটা হলো ফিকহ, ধর্ম, আচার, নীতি ও আদব।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—কিছু লোক শব্দভেদকে অজুহাত বানিয়ে হাদিসের সমালোচনা করে। অথচ সামান্য বুদ্ধি দিলেই বুঝতে পারত, শব্দভেদের মধ্যেই সত্যতার প্রমাণ রয়েছে, মিথ্যার নয়। কেননা মানুষ যখন একই ঘটনার সাক্ষী হয়, তারা আসল বক্তব্য মনে রাখে, কিন্তু শব্দে ভিন্নতা থাকে—যতক্ষণ না সবাই মিলে আগে থেকে ঠিক করে নেয়, অথবা শব্দটিই যদি নিজে থেকে উদ্দেশ্য হয়, যেমন কোনো আইনি দলিল বা শিক্ষকের নির্দিষ্ট বাক্য।
যা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তা হলো—হাদিসের উদ্দেশ্য ছিল না প্রতিটি ঘটনার সূক্ষ্মতম বিবরণ লিপিবদ্ধ করা, সব দিক আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা। বরং উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কাছে এমন দিকনির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া, যা তারা আমল করতে পারে; এমন শরিয়তের বিধান দেওয়া, যার দিকে তারা ফিরে যেতে পারে; এমন এক জীবনদর্শন উপস্থাপন করা, যা তারা অনুসরণ করতে পারে। যেখানে প্রয়োজন ছিল শব্দগুলোতেই নির্ভর করার, সেখানে তা একই ছিল বা অন্তত ঘনিষ্ঠভাবে মিলত—যথেষ্ট প্রমাণ ও উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য। সুতরাং হাদিস থেকে নতুন কোনো যুক্তি তৈরি করে সামগ্রিক সন্দেহ ছড়ানোর অবকাশ নেই, আর হাদিসের কোনো নির্ভরযোগ্য উপায়ও নেই, যা প্রতিষ্ঠিত নিশ্চিত বিশ্বাসকে টলাতে পারে। বরং এটা হলো পাশ্চাত্যের চিন্তার এক নতুন ধারা, যা নিজের কর্তৃত্ব এমন সব ক্ষেত্রে বিস্তৃত করতে চাচ্ছে, যেখানে তার কোনো অধিকার ছিল না।
হাদিসের আংশিক সমালোচনা (النقد الجزئي) কোনো নতুন ব্যাপার নয়, যা এ যুগের পরবর্তী চিন্তাবিদেরা উদ্ভাবন করেছেন। বরং এটি হলো মুহাদ্দিসগণের নিজস্ব কাজ, তাঁদের বিদ্যালয়ের উত্তরাধিকার, দীর্ঘ সাধনার ফল। তাঁরা এ বিষয়ে সূক্ষ্ম মনোযোগ দিয়েছেন, সুসংহত পদ্ধতি প্রণয়ন করেছেন, বর্ণনাগুলোর মধ্যে তুলনা করেছেন, সনদ ও মতনের দিকে নজর দিয়েছেন—যাতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন, যা প্রমাণিতভাবে সত্য হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে প্রবল।
এখানে আমি একটি দৃষ্টান্ত আনব—ইমাম বুখারি যা বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম যা সংরক্ষণ করেছেন তার মধ্যে তুলনা করে। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে এ সমালোচনার প্রকৃতি কী, এর সীমা কোথায়, এবং কিভাবে এটি সুন্নাহ সংরক্ষণে ও রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
——————–
ক্যাটাগরি : হাদিস,তারিখ, ইসলামি চিন্তা।
—-
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
—-
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/6875