মাহরাম ছাড়া হজ্জ বা ওমরাহ সফর (পার্ট -২)
——————–
بسم الله الرحمن الرحيم.
সৎ ও অসৎকে পার্থক্য করার যে ক্ষমতা, তা আল্লাহ্ নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে দান করেছেন। এই নৈতিক বিচারবোধই মানুষের জবাবদিহিতার ভিত্তি। তাই আল্লাহ্ তাঁর আদেশ-নিষেধ পুরুষদের ন্যায় নারীদের উদ্দেশেও সমানভাবে দিয়েছেন। নৈতিক দায়িত্বে এই সমতার বিষয়টি আমার পূর্ববর্তী বহু লেখায় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
একইভাবে আল্লাহ্ নারীদেরকেও সৎকর্ম করার ও অসৎকর্ম থেকে বিরত থাকার শক্তি ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন, যেমনটি পুরুষদের ক্ষেত্রে দিয়েছেন। মানুষের ইচ্ছাশক্তির এই মর্যাদা, পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই, আমি পূর্বেই আলোচনায় এনেছি।
এই দ্বৈত দান—নৈতিক প্রজ্ঞা ও ইচ্ছাশক্তির কারণে—নারী-পুরুষ উভয়কেই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল ﷺ এর আনুগত্যে জবাবদিহি হতে হবে। যে কেউ আল্লাহভীরু হয়ে সৎকর্ম করবে, সে মহাপুরস্কৃত হবে; আর যে কেউ গুনাহে লিপ্ত হবে, সে শাস্তিযোগ্য হবে। কুরআন মাজীদে এই সত্য সুস্পষ্টভাবে বারবার ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে এই মৌলিক সমতার পাশাপাশি আল্লাহ্র হিকমতে একটি পার্থক্যও রাখা হয়েছে: আল্লাহ্ পুরুষদের স্বভাবেই নারীর প্রতি প্রবল আকর্ষণ ও কামনা স্থাপন করেছেন। এ আকাঙ্ক্ষার বৈধ পরিপূর্ণতার জন্য বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে, আর বিয়ের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে পরিবার। এই ব্যবস্থায় সংসারের আর্থিক দায়িত্ব প্রধানত পুরুষের উপর ন্যস্ত। যদি এ প্রবল আকাঙ্ক্ষা পুরুষের মধ্যে স্থাপিত না থাকত, তবে হয়তো খুব অল্প পুরুষই এমন চুক্তি মেনে নিত, যেখানে অধিকাংশ দায়ভার তার কাঁধে বর্তায়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক পুরুষ অবিবাহিত থাকেন, আবার কারও স্ত্রী মারা যান বা তালাকপ্রাপ্ত হন। এসব অবস্থায় নারীদের দেখা অনেক সময় কামনা জাগিয়ে তোলে। এমনকি বিবাহিত হয়েও কেউ কেউ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। যারা আল্লাহভীরু নয় এবং কামনার কাছে পরাস্ত, তারা অন্যায়-অত্যাচার এমনকি নারীর উপর জুলুমেও লিপ্ত হতে পারে।
এখানেই আসে মূল প্রশ্ন: নারীদেরকে কীভাবে যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষা করা যাবে? এর একটি সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে—নারীর স্বাধীনতা পুরোপুরি সীমিত করে দেওয়া, তাদের ঘরে বন্দী রাখা এবং চলাফেরা রুদ্ধ করা। কিন্তু এমন নীতি যে চরম অন্যায় ও জুলুম, তা কারো কাছেই গোপন নয়। এতে নারীরা ইবাদতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে, মসজিদে যাওয়া বা প্রয়োজনে জীবিকা উপার্জন থেকেও বঞ্চিত হবে।
ইসলাম এ ক্ষেত্রে দিয়েছে মধ্যপন্থার নির্দেশ। অতিরিক্ত বাঁধন বা বেপরোয়া স্বাধীনতা—কোনোটাই নয়। বরং এমন শরয়ি বিধান দিয়েছে যা বাস্তবতাকেও মানে, আবার নৈতিকতাকেও রক্ষা করে। এই বিধান মেনে চললে নারীরা সৎকর্মে অংশ নিতে পারবে এবং একইসাথে জালেমদের হাত থেকেও সুরক্ষিত থাকবে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে—আল্লাহ্র দুনিয়ায় কোনো ব্যবস্থাই শতভাগ নিরাপত্তা ও শতভাগ ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
ইসলামী দিকনির্দেশনার সারাংশ
যখন কোনো নারী নিজ শহর বা এলাকায় থাকেন, তখন তিনি সাধারণত স্থান, মানুষ ও পরিবেশের সাথে পরিচিত থাকেন। তিনি জানেন কে সৎ আর কে অসৎ, বিপদের সময়ে কার কাছে সাহায্য চাইতে হবে। তাই ইসলাম অনুমতি দিয়েছে যে, নারী যদি শালীন ও হিজাবসম্মত পোশাকে থাকে, তবে তিনি মসজিদ, বাজার বা শিক্ষালয়ে যেতে পারবেন। একইসাথে নারী-পুরুষ উভয়কেই পরস্পরকে সম্মান করা ও দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু যখন কোনো নারী নিজ শহরের বাইরে ভ্রমণে বের হন—যেমন হজ, উমরা বা অন্য কোনো সফরে যা প্রায় ৪৮ মাইল (প্রায় ৭৭ কিমি) ছাড়িয়ে যায়—তখন বিষয়টি ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। তিনি সেখানে অপরিচিত, বিপদের সময় তৎক্ষণাৎ নিরাপত্তা পাওয়া কঠিন। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করে বলেছেন:
“কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে।”
(বুখারি ও মুসলিম)
আবূ সাঈদ খুদরী রা. থেকেও বর্ণিত:
“নারী যেন তিন দিনের সফরে না যায়, যদি না তার সাথে ছেলে, বাবা, ভাই, স্বামী বা মাহরাম থাকে।”
(বুখারি ও মুসলিম)
তবে এমন নারীরাও আছেন, যাদের মাহরাম নেই, বা মাহরাম সঙ্গ দিতে সক্ষম নয়। এ অবস্থায় বহু আলেমের মত হলো—যদি কোনো বিশ্বস্ত নারীগোষ্ঠীর সাথে ভ্রমণ হয়, এবং তাদের মধ্যে অন্তত কারও মাহরাম থাকে, তবে সফর বৈধ। মালিকি ও শাফেয়ি মাযহাবসহ বহু সালাফ এ মত দিয়েছেন। হাদিসগ্রন্থে (যেমন ইবনে আবি শায়বার মুসান্নাফ) এর দলিল পাওয়া যায়। আমাদের মা আয়েশা রা. এর উক্তিও এ বিষয়ে প্রমাণ:
“প্রত্যেক নারীর তো মাহরাম থাকে না।”
যেসব দেশে রাস্তা নিরাপদ, নারীসম্মান প্রতিষ্ঠিত, আইনশৃঙ্খলা বজায় আছে এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় সহায়তা সহজলভ্য—যেমন কিছু উপসাগরীয় রাষ্ট্র বা কিছু পশ্চিমা দেশে—সেখানে নারীর একাকী ভ্রমণের অনুমতি প্রসঙ্গত দেওয়া যায়। এর দলিল রাসূল ﷺ এর সেই ভবিষ্যদ্বাণী, যা আদী ইবনে হাতিম রা. বর্ণনা করেছেন:
“তোমার আয়ু দীর্ঘ হলে দেখবে—একজন নারী হীরাহ থেকে মক্কায় গিয়ে কাবা তাওয়াফ করবে, আর তার ভয় থাকবে কেবল আল্লাহকে।”
(বুখারি)
এই হাদিস প্রমাণ করে—নিরাপত্তা থাকলে নারী একাকী ভ্রমণ করতে পারে।
অতীতে সৌদি আরব নারীদের মাহরাম ছাড়া উমরাহ ভিসা দিত না। অনেকে এটিকে নারীর মর্যাদার পরিপন্থী মনে করতেন। বর্তমানে এ শর্ত তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন নারীরা মাহরাম ছাড়া সৌদি আরবে যেতে পারে, এমনকি হারামাইনেও। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ।
তবে এখানেও সতর্কতা জরুরি। এখনো গণপরিবহন, হোটেল বা একাকী ভ্রমণে নারীদের হয়রানির খবর পাওয়া যায়। তাই শুধুমাত্র আইন অনুমতি দিয়েছে বলে নির্ভর করে নেওয়া উচিত নয়, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ্ নারীর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা—দুটোকেই রক্ষা করে। একটির জন্য আরেকটি পুরোপুরি বিসর্জন দেওয়া ইসলামের পথ নয়। তাই আমার পরামর্শ হলো: সম্ভব হলে নারীরা স্বামী বা মাহরামের সাথে ভ্রমণ করুন। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত নারীগোষ্ঠীর সাথে ভ্রমণ করুন, এবং সেই দলে অন্তত একজন নারীর মাহরাম যেন থাকেন।
——————–
📌 রেফারেন্স :
🔶 প্রথমত – ইমাম মালিক ও শাফেয়ি রাহিমাহুল্লাহ,
ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ি দুজনেই বলেছেন যে, যদি রাস্তা নিরাপদ হয়, তবে নারী মাহরাম ছাড়া অন্য নারীদের একটি নির্ভরযোগ্য দলে সঙ্গী হয়ে হজ করতে পারে।
ইমাম নববী (রহ.) শরহে সহীহ মুসলিম-এ এই মতকে উদ্ধৃত করেছেন:
> “মালিক, শাফেয়ি এবং আউযাঈ বলেছেন—নারীরা মাহরাম ছাড়াও অন্য নারীদের একটি বিশ্বস্ত দলের সাথে হজ করতে পারে।”
(শরহুন নববী আ’লা সহিহ মুসলিম ৯/১০৪)
🔶 দ্বিতীয়ত – ইমাম আহমদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর একটি রায়
ইমাম আহমদ থেকে দুটি মত বর্ণিত হয়েছে। একটি হলো কড়াভাবে মাহরাম শর্ত আরোপ, আরেকটি রায়ে তিনি অনুমতি দিয়েছেন—যদি নারী নিরাপদ কাফেলায় থাকে, তবে হজ করতে যেতে পারে।
(আল মুগনি- ইবনে কুদামাহ ৩/২২১)
🔶 তৃতীয়ত – সালাফদের মতামত
হাদিসে আয়েশা রা.-এর উক্তি পাওয়া যায়:
যেমন – “ليس كل النساء يجدن محرما”
“প্রত্যেক নারীর তো মাহরাম পাওয়া যায় না।”
(উদ্ধৃত: মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ৪/৩৪৮)
– এটিকে অনেকে দলিল হিসেবে নিয়েছেন যে, বাস্তবতার কারণে নির্ভরযোগ্য কাফেলায় মাহরামবিহীন নারীর হজ বৈধ।
🔶 চতুর্থত – আধুনিক ফিকহি রেফারেন্স
ইবনে হাজার আল-হাইতামী (শাফেয়ি ফকিহ) বলেন:
“হজ ফরজ হয়ে গেলে নারীর জন্য মাহরাম ছাড়া যাওয়া বৈধ, যদি সে বিশ্বস্ত নারীগোষ্ঠী বা নিরাপদ কাফেলায় থাকে।”
(তোহফাতুল মুহতাজ, ৪/২৭)
কারদাবি ও সমকালীন ফকিহরাও এ মতের উপর ফতোয়া দিয়েছেন—যে, নিরাপত্তা থাকলে মাহরাম ছাড়া নারীর হজ গ্রহণযোগ্য।
—
📌 সারসংক্ষেপ:
হানাফি মাযহাব সাধারণভাবে মাহরাম শর্তকে অপরিহার্য বলেছেন।
মালিকি ও শাফেয়ি মাযহাব নিরাপত্তা ও বিশ্বস্ত কাফেলার শর্তে মাহরাম ছাড়াও হজকে বৈধ বলেছেন।
সালাফ থেকে এ মতের ইঙ্গিতও পাওয়া যায় (যেমন আয়েশা রা.-এর উক্তি)।
————-
ক্যাটাগরি : ফিকহ, হজ্জ।
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
—-
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/6854