AkramNadwi

শিরোনাম: মৃত্যুর মুহূর্তে ইসলামী শিষ্টাচার, ইলমি আ

শিরোনাম: মৃত্যুর মুহূর্তে ইসলামী শিষ্টাচার, ইলমি আমানত ও মহৎ চরিত্র
—–
ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
৩০ জুন ২০২৬ খ্রি.

|| প্রশ্ন
কোনো আলিম, চিন্তাবিদ, দাঈ অথবা বুদ্ধিজীবী ইন্তিকাল করলে কি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মতামত, চিন্তা ও ফিকহি বিশ্লেষণকে তল্লাশ-তক্‌তিশ করা উচিত? তাঁর বিদায়ের মুহূর্তেই কি আমরা বলব, অমুক বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আমি একমত, অমুক বিষয়ে দ্বিমত? তাঁর ভুলগুলো তুলে ধরাকে কি তখনই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করা সমীচীন?

আর যদি কারও সাথে মৃত ব্যক্তির কিছু মতভেদ থেকেও থাকে, তবুও কি তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাত, রহমত ও মাফ চাইবে? এমন দোয়া কি তাঁর সব মতের সমর্থন ও গৃহীতির সমান?

|| উত্তর
কারও জীবনপ্রদীপ নিভে গেলে কবরের পাশে মতবিরোধের অগ্নিশিখা জ্বালানো ইসলামের শিক্ষা নয়। মানুষ মৃত্যুবরণ করলে সে আর আত্মপক্ষসমর্থন করতে পারে না; প্রমাণ পেশ বা অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগও তার থাকে না। এমন সময় ন্যায়পরায়ণতা দাবি করে—আমাদের জিহ্বা সংযত থাকবে, হৃদয় সম্মানভরে ভরপুর থাকবে; শোকের বাতাসে বিরোধের বর্শা উঁচিয়ে ধরা উদ্যতলোকের কাজ নয়।

ইলমি মতভেদ নিজেই এক রহমত; গবেষণার দুয়ার খুলে, প্রমাণ শাণিত করে, সত্যের সন্ধান অগ্রসর করে। কিন্তু প্রতিটি বিষয়ের একটি উপযুক্ত সময় ও প্রাসঙ্গিক ভাষা আছে। বসন্তের সমারোহে যদি কেউ শরতের শোকগাথা গায়, তা যেমন বেখাপা, তেমনি শোকের মুহূর্তে সমালোচনার তরবারি খোলা ভদ্রতা-বিবর্জিত। মতভেদ থাকলে সেটা জানানোর শ্রেষ্ঠ সময় ছিল আলেম-জীবিতকালেই; প্রমাণের মোকাবিলায় প্রমাণ, প্রশ্নের জবাবে উত্তর, সত্য-অসত্য স্পষ্ট হতো। সে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে থাকলে গবেষণার দরজা তো আজও খোলা—ইতিহাসে আলেমদের ধারণা বারবার পরখ-পুঙ্খানুপুঙ্খ হয়েছে। কিন্তু তারিখ-এ-তাজিয়ায় বাদানুবাদের আসর বসানো না ইলমের সম্মান, না দ্বীনের আদব।

মৃত্যুর সময় আমাদের দু’টি মৌলিক দায়িত্ব—

১. মৃতের সম্পর্কে সুধা-সঞ্জাত বাক্য উচ্চারণ
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“তোমরা তোমাদের মৃতদের ভালো দিক স্মরণ করো।” (সুনান আবি দাউদ)
আরেক হাদীসে,
“মৃতদের নিন্দা করো না; তারা নিজেদের আমলের পরিণামে উপনীত হয়েছে।” (সহীহ্‌ বুখারী)

এ শিক্ষা শুধু কথা পরিশীলনের জন্য নয়—হৃদয় পরিশুদ্ধ করার জন্য। কারও প্রশংসামূলক স্মৃতিচারণ শোকার্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেয়, ভারাক্রান্ত হৃদয়গুলিকে স্বস্তি আনে, সমাজে রহমত, সম্মান ও উদারতার সুবাতাস ছড়ায়।

এতে এই নয় যে মৃত ব্যক্তির সবকিছুই সঠিক, তাঁর সব মতামতই গ্রহনীয়। নবী-রাসুল আলাইহিমুস সালাম ব্যতীত প্রত্যেকে ভুল-শুদ্ধের সংমিশ্রণ। তবে মৃত্যুর পরে চূড়ান্ত বিচারের ভার আল্লাহর; আমাদের দায়িত্ব—সুন্দর কথা ও সম্মান প্রদর্শন।

২. মৃতের জন্য মাগফিরাত ও রহমতের দোয়া
আল্লাহ তায়ালা বিশ্বাসীদের শিক্ষা দিয়েছেন—
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ও পূর্বে ঈমানে অগ্রণীদের ক্ষমা করুন।” (সূরা হাশর ৫৯:১০)

আয়াতটি মৃতের প্রতিটি মত খতিয়ে দেখে তারপর দোয়া করতে বলে না; ঈমানের বন্ধনই দোয়ার যথেষ্ট কারণ।
জানাজায় রাসুলুল্লাহ ﷺ বারংবার দোয়া করতেন—
“হে আল্লাহ! তাকে মাফ করুন, তার প্রতি দয়া করুন, তাকে নিরাপত্তা দান করুন, ক্ষমা করুন…” (সহীহ্‌ মুসলিম)
ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম-ও দোয়া করেছিলেন—
“হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সব মুমিনকে কিয়ামতের দিন ক্ষমা করুন।” (সূরা ইব্রাহিম ১৪:৪১)

এটাই নবীদের পথ, সলিহিনের ঐতিহ্য, এবং উম্মতে মুহাম্মদীর ﷺ পরিচয়চিহ্ন।

মাফের দোয়া মানে সব মতের সমর্থন নয়। মনে রাখতে হবে—কারও জন্য মাগফিরাত-রহমতের প্রার্থনা করা তার সব মত, ইজতিহাদ বা সিদ্ধান্তে ‘মুত্তেফেক আলাইহি’ সিল মারা নয়। দোয়া বান্দা-ও-রবের সম্পর্ক; মতভেদের ময়দান প্রমাণের। এ দুই গুলিয়ে ফেলা ন্যায় ও সুস্থ বিচারবোধের পরিপন্থী।

আপনি কোনো আলেমের মতের সাথে দ্বিমত করতেই পারেন, তবু তার ইলম, ইসলামের খেদমত, আন্তরিকতা স্বীকার করে তার জন্য রহমতের দোয়া করবেন—এটি দুর্বলতা নয়; বরং ঈমানের প্রশস্ততা ও চরিত্রের মহত্ত্বের পরিচয়। উচ্চ পর্বতও নীচের উপত্যকায় ছায়া বিস্তার করে; বিস্তীর্ণ সমুদ্র অগণিত নদীকে বুকে টেনে নেয়। তেমনি সত্যিকারের মহান মানুষ ভিন্নমতকে নিজের মর্যাদা-মহিমা ছাপিয়ে বড় হতে দেন না।

উম্মতের মহান ইমামদের ইতিহাস এর জ্যোতির্ময় সাক্ষী। তাঁরা ইলমি ইস্যুতে তীব্র ভিন্নমত পোষণ করলেও মন থেকে সমমর্যাদার সম্মান, আন্তরিক দরদের দোয়া বর্জন করেননি। প্রমাণ শাণিত করেছেন, কিন্তু বাক্যে কটুতা ঢোকাননি; মতভেদকে বৈরিতা বানাননি, বরং সত্য-অন্বেষার সেতু বানিয়েছেন।

অতএব কোনো আলেম বা চিন্তাবিদের ইন্তিকালে উচ্চতম কণ্ঠ হওয়া উচিত দোয়ার, সমালোচনার নয়; শ্রেষ্ঠ উপহার অসন্তোষ নয়, তার মাগফিরাত-রহমত কামনা; সর্বোত্তম স্মৃতিচিহ্ন মতভেদের ধুলো নয়, সদাচারের সুবাস।

সমালোচনার নিজস্ব সময় আছে—ধর্মীয়-বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজনসিদ্ধ। তবে প্রতিটি প্রয়োজনের স্বতন্ত্র স্থান-কাল রয়েছে। শোকের

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *