|২৪ |রজব |১৪৪৭ হিজরি|
আজ সকালে, ১৪৪৭ হিজরির ২৪ রজব, আমাদের কাছে এক বেদনাবিধুর সংবাদ এসে পৌঁছেছে, ড. মুহাম্মদ মানযূর আলম আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর রবের সান্নিধ্যে ফিরে গেছেন, ইন্না-লিল্লাহ……. ।
আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন তাঁকে উচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন, তাঁর প্রশস্ত রহমতে আচ্ছাদিত করেন এবং তাঁর পরিবার, প্রিয়জন ও ছাত্রদের অন্তরে এমন সুন্দর ধৈর্য ঢেলে দেন, যা এই গভীর শোক ও অপূরণীয় ক্ষতির ভার বহনে সহায়ক হয়।
তাঁর প্রস্থান কেবল একজন মানুষের প্রস্থান নয়; এটি ছিল এক অর্থের অনুপস্থিতি, এক আলোকিত বুদ্ধিবৃত্তিক উপস্থিতির নিভে যাওয়া, যা দীর্ঘকাল ধরে মননকে আলোকিত করেছে এবং চিন্তার পথে পথিকদের দিশা দেখিয়েছে। তাঁর ব্যক্তিত্বে এমন কিছু গুণ একত্রিত হয়েছিল, যা খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখা যায়, গভীর ও সুদৃঢ় জ্ঞান, দৃষ্টির ব্যাপ্তি, স্বভাবের প্রশান্তি এবং কর্মের দৃঢ়তা। এর ফলে তিনি এমন এক চিন্তাশীল নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, যা উপলব্ধি করেছিল, জাতির পুনর্জাগরণ আবেগঘন ভাষণ কিংবা অনুভূতিনির্ভর স্লোগানে গড়ে ওঠে না; বরং তা নির্মিত হয় সুসংগঠিত চিন্তা, সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি, সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠান এবং নিরলস, গভীরতাসম্পন্ন জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে।
তিনি উম্মাহর বাস্তবতাকে দেখেছিলেন গভীর মনন ও প্রাজ্ঞতার চোখে। দেখেছিলেন চিন্তার বিচ্ছিন্নতা, পদ্ধতির অস্থিরতা এবং ঐতিহ্য ও বাস্তবতার টানাপোড়েন। কিন্তু তিনি ছিলেন না তাঁদের একজন, যারা কেবল রোগ নির্ণয়েই তৃপ্ত থাকে, কিংবা নিছক সমালোচনাতেই আনন্দ খোঁজে। তিনি ছিলেন সেই অল্পসংখ্যক মানুষের একজন, যাঁরা বিশ্বাস করতেন, চিন্তা যদি প্রকল্পে রূপ না নেয়, আর জ্ঞান যদি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় গড়ে না ওঠে, তবে তা বইয়ের পাতা আর বিচ্ছিন্ন ভাবনার মধ্যেই বন্দী থেকে যায়। এই উপলব্ধিরই জীবন্ত সাক্ষ্য ছিল “মা’হাদুদ দিরাসাতিল মাউজুইয়্যাহ”। তাঁর তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় এই প্রতিষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল গভীর গবেষণার এক বিশ্বস্ত মঞ্চ, সংযত ও গম্ভীর সংলাপের এক উন্মুক্ত পরিসর, এবং এমন এক সেতু, যা জ্ঞানকে লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে, ঐতিহ্যকে সময়ের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এখানে দেশি-বিদেশি নানা প্রান্তের আলেম ও গবেষকেরা একত্রিত হয়ে মানব ও সমাজের প্রশ্নগুলোকে বিজ্ঞানমনস্ক ভাষায় এবং দায়িত্ববোধের চেতনায় আলোচনা করতেন।
যদিও তিনি অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন, তবু তাঁর কাছে অর্থনীতি ছিল না কেবল নিরেট সংখ্যার বিজ্ঞান কিংবা শীতল সমীকরণের খেলা। এটি ছিল মানবিক, নৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক শাস্ত্র, যা মূল্যবোধের প্রেক্ষাপট ছাড়া বোঝা যায় না। এ কারণেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সর্বাঙ্গীণ, যেখানে জ্ঞান ও বিবেক, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও মানব-ভাগ্য এক সুতোয় গাঁথা। শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে তিনি ছিলেন মুখস্থবিদ্যার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ছাত্রদের শেখাতেন না কী ভাবতে হবে, বরং শেখাতেন কীভাবে ভাবতে হয়। তিনি তাঁদের মস্তিষ্কে তথ্য ঠেসে দিতেন না; বরং প্রশ্ন করার শক্তিকে জাগিয়ে তুলতেন এবং হৃদয়ে গেঁথে দিতেন এই বোধ, জ্ঞান একটি আমানত, আর চিন্তা এক গুরুদায়িত্ব।
তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী, কিন্তু তা এই কারণে নয় যে ভাষা তাঁর কাছে সংকুচিত ছিল; বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, ভাষারও মর্যাদা আছে, যা অপব্যবহার করা যায় না। তিনি যখন কথা বলতেন, শ্রোতারা গভীর মনোযোগে কান পাতত; আর তিনি যখন নীরব থাকতেন, তখনও সেই নীরবতায় এমন এক অর্থ লুকিয়ে থাকত, যা কথার চেয়েও কম গভীর ছিল না। তাঁর লেখা ও বক্তৃতা কখনোই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা ক্ষণস্থায়ী সাড়া পাওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত হতো না; সেগুলো লেখা হতো স্থায়ী হয়ে থাকার জন্য, বলা হতো গভীরে প্রোথিত হওয়ার জন্য, যাতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও গভীর উপলব্ধি ও স্পষ্ট দৃষ্টির ফল দেয়।
ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘ সান্নিধ্য ছিল না, না ছিল দীর্ঘ আলাপ কিংবা নিয়মিত সাক্ষাৎ। আমাদের মধ্যে সাক্ষাৎ ঘটেছিল মাত্র একবার। কিন্তু জীবনে এমন কিছু সাক্ষাৎ হয়—সংখ্যায় অল্প, অথচ প্রভাবে গভীর, যা বহু বছরের ঘনিষ্ঠতার অভাব পূরণ করে দেয় এবং অল্প সময়েই এমন কিছু উন্মোচন করে দেয়, যা দীর্ঘকালেও প্রকাশ পায় না। সেই একমাত্র সাক্ষাৎই ছিল এমন, যা আমাকে মানুষটির অন্তঃসার দেখিয়েছিল এবং মনে এমন এক প্রতিচ্ছবি এঁকে দিয়েছিল, যা সময়ের স্রোতেও মুছে যায় না।
কয়েক বছর আগে তিনি উদারতা ও শিক্ষকের মর্যাদাসম্পন্ন ভদ্রতায় আমাকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত “মা’হাদুদ দিরাসাতিল মাউজুইয়্যাহ”-এ আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে আমি একটি একাডেমিক বক্তৃতা প্রদান করি, বিষয় ছিল ‘কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে ইবন তাইমিয়া ও মাওলানা ফারাহীর পদ্ধতির তুলনামূলক আলোচনা’। এই আমন্ত্রণই ছিল তাঁর চিন্তার প্রশস্ততা, বহুমাত্রিক পদ্ধতির প্রতি তাঁর উন্মুক্ত মনোভাব এবং এই বিশ্বাসের এক উজ্জ্বল প্রমাণ যে, পদ্ধতির ভিন্নতা গবেষণার মর্যাদা কমায় না; বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ ও গভীর করে তোলে।
সেই দিনটি ছিল উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ, মনোযোগে প্রাণবন্ত। বক্তৃতার পর যে বৈজ্ঞানিক সংলাপ হয়, তাতে ছিল দৃঢ়তা ও গাম্ভীর্য, যেখানে যুক্তির কণ্ঠস্বরের ওপর আর কিছুই প্রাধান্য পায়নি, আর মতের জয়লাভের চেয়ে সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাই ছিল মুখ্য। ড. মানযূর আলম সেখানে ছিলেন সম্পূর্ণ সচেতন উপস্থিতিতে, তিনি শুনছিলেন, লক্ষ করছিলেন, আর প্রাজ্ঞ মানুষের প্রশান্ত ভঙ্গিতে পরিবেশকে পরিচালনা করছিলেন; না ছিল নেতৃত্বের তাড়াহুড়ো, না ছিল ভিন্নমতের প্রতি কঠোরতা।
সেদিন খুব কাছ থেকে আমি তাঁর উন্নত চরিত্র, গভীর বিনয় এবং জ্ঞান ও জ্ঞানীদের প্রতি তাঁর আন্তরিক সম্মান প্রত্যক্ষ করেছি, এমন এক সম্মান, যা কৃত্রিম নয়, আনুষ্ঠানিকও নয়; বরং এই দৃঢ় বিশ্বাস থেকে উৎসারিত যে জ্ঞান ব্যক্তির চেয়েও বিস্তৃত, আর সত্য কোনো একক ধারার সম্পত্তি নয়। তিনি আমাকে যে সম্মান দেখিয়েছিলেন, তা ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক সৌজন্য কিংবা ক্ষণিক ভদ্রতা; বরং ছিল এক বিশুদ্ধ চরিত্রের, এক সুপ্রতিষ্ঠিত স্বভাবের ও এমন এক ব্যক্তিত্বের প্রকাশ, যিনি জ্ঞানভিত্তিক সংলাপকে ইবাদতের একটি রূপ মনে করতেন, আর ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাকে চিন্তার মহত্ত্ব ও আত্মার উচ্চতার নিদর্শন বলে বিশ্বাস করতেন।
ড. মুহাম্মদ মানযূর আলম রাহিমাহুল্লাহ একাশি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর প্রস্থানের সঙ্গে যেন এমন এক সময়ের অধ্যায় শেষ হয়ে গেল, যে সময়ে চিন্তার মর্যাদা ছিল, আর জ্ঞান বহন করত স্পষ্ট দায়িত্ববোধ। তবে আরও গভীর সত্য হলো, এমন মানুষরা কখনো পুরোপুরি বিদায় নেন না। কারণ তাঁরা যেখানে বপন করে যান, সেখানে তাঁদের চিহ্ন থেকে যায়; যেখানে তাঁরা ভিত্তি স্থাপন করেন, সেখানে তাঁদের চিন্তা বেঁচে থাকে। তাঁরা যে মনগুলোকে গড়ে তুলেছেন, যে প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণ করেছেন, আর যে গ্রন্থসমূহ উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন, সেসবের মধ্যেই তাঁদের আত্মা জীবিত থাকে।
“মা’হাদুদ দিরাসাতিল মাউজুইয়্যাহ” এবং সেখান থেকে উৎসারিত বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টাসমূহ চিরকাল সাক্ষ্য বহন করবে এমন এক মানুষের, যিনি বুদ্ধিকে বিশ্বাস করেছিলেন, চিন্তার মাধ্যমে দ্বীনের খেদমত করেছিলেন এবং জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
আল্লাহ তাঁকে প্রশস্ত রহমতে আবৃত করুন, তিনি যা কিছু পেশ করেছেন তা তাঁর নেক আমলের পাল্লায় ভারী করে দিন, আর জ্ঞান ও জ্ঞানীদের খেদমতের বিনিময়ে তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
————-
ক্যাটাগরি : শ্রদ্ধাঞ্জলি, ইসলামি চিন্তাধারা, জীবনি।
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8169