এই দ্বীনের দুটি মহান ভিত্তি রয়েছে, যার ওপর নির্ভর করে তার অস্তিত্ব মানুষের অন্তরে এবং বাস্তব জীবনেও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে।
এক: ফিতরত যা দ্বীনের অভ্যন্তরীণ, মানসিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামো।
দুই: ইবরাহিমি মিল্লাত, যা দ্বীনের দৃশ্যমান, বাহ্যিক ও কর্মময় কাঠামো।
ফিতরতই প্রথম মূলভিত্তি। মানুষ জন্মায় এই ফিতরতের ওপর, পবিত্র ও নির্মল এক স্বভাব নিয়ে, যা কোনো বাহ্যিক শিক্ষা ছাড়াই তাকে তার রবের দিকে টেনে নেয়, কোনো দাওয়াত শোনার আগে এবং কোনো উদাহরণ দেখার আগেই তাকে আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট করে। ফিতরত শুধু তাওহিদ দাবি করে না; বরং তাওহিদেই আনন্দ খুঁজে পায়, তাতে প্রশান্তি অনুভব করে, আর তা থেকে বঞ্চিত হলে কষ্ট পায়। মানুষের এই সহজাত স্বভাবের গভীরে ভালো-মন্দ চেনার শক্তিশালী অনুভূতি মানসিকভাবে স্থাপিত রয়েছে। এর মূল ফিতরিগত; আর এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা এসেছে ওহির মাধ্যমে, যা সুস্থ বুদ্ধি দ্বারা সমর্থন পায়।
আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, তাঁর প্রতি গভীর প্রয়োজনবোধ, এবং তাঁর স্মরণে মন আনন্দে ভরে উঠা, এসবই দ্বীনের এ আধ্যাত্মিক কাঠামোর সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য। এগুলোই সেই ফিতরতের শিকড়, যেখান থেকে জন্ম নেয় আত্মার প্রকৃত সুখ। নবীদের জনক ইবরাহিম (আ.) এই ফিতরতকে সবচেয়ে নির্মলভাবে উপলব্ধি করেছিলেন; সুস্থ বুদ্ধি দিয়ে তার আহ্বান শুনেছিলেন, এবং এমন শক্তিশালী যুক্তি দিয়ে সাড়া দিয়েছিলেন, যা সকল মানবীয় যুক্তিকে ছাড়িয়ে যায়।
যখন ফিতরতের সঙ্গে সুস্থ বুদ্ধির সঙ্গত সাড়া মেলে, তখন তা মানুষকে তার সত্যিকারের ইলাহের দিকে টেনে আনে। তার বুক ভরে ওঠে আকুলতায়, আর প্রকৃত প্রশান্তি সে খুঁজে পায় কেবল তাঁর নৈকট্যে।
মানুষ যখন নিজের ফিতরতের প্রতি পূর্ণ সাড়া দেয়, তখনই সে হয় প্রকৃত রাশিদ (সঠিক পথের অনুসারী)। কারণ রাশিদ হওয়া মানে অন্তরের দিক থেকে ফিতরতের সঙ্গে সামঞ্জস্য, এবং অস্তিত্বের দিক থেকে সমগ্র মহাবিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য। আকাশসমূহ, পৃথিবী এবং তাদের মাঝের সবকিছুই বিনা দ্বিধায় তাদের রবের দিকে চলছে, নিজেদের স্বভাব-প্রকৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাযুজ্যে, কোনো বিরোধ ছাড়াই। কিন্তু মানুষই একমাত্র সত্তা, যে তার প্রকৃতির বিরুদ্ধে যেতে সক্ষম, নিজের খেয়ালের সঙ্গে মানানসই করে অভ্যাস, সংস্কৃতি ও নৈতিকতা তৈরি করতে পারে, যা ফিতরতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখান থেকেই রাশিদ হওয়া নির্ভর করে, ফিতরত যা দাবি করে তা গ্রহণ করা, এবং যা ফিতরতের বিরোধী তা বর্জন করার ওপর।
এরপর আসে ইবরাহিমি মিল্লাত, যা দ্বীনের বাহ্যিক কাঠামো, সেই রূপ যা ফিতরতের বাস্তব রূপায়ণে কর্মে ও জীবনে প্রতিফলিত হয়। এই ইবরাহিমি মিল্লাত তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
প্রথম স্তম্ভ: হানিফিয়্যাত।
এটি এমন এক অবস্থান, যেখানে মানুষ একমাত্র আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, শুধু তাঁর ওপর ভরসা করে, এমন দৃঢ় ভরসা যা অন্য কারও ওপর নির্ভরতার কোনো চিহ্নও রাখে না। সে শুধু তাঁরই শোকর করে, তাঁরই ইবাদত করে, তাঁরই কাছে সাহায্য চায়। ইবরাহিম (আ.) এই হানিফিয়্যাত অর্জন করেছিলেন কোনো অন্ধ অনুকরণে নয়, কোনো অভ্যাসগত ধারায় নয়; বরং গভীর অনুসন্ধান ও চিন্তার পথে, যা ছিল চিন্তার এক ধরনের তপস্যা, যা বুদ্ধিকে পরিশুদ্ধ করে, অন্তর্দৃষ্টিকে শাণিত করে, এবং মানুষকে সত্যের পথে ঘোষণা ও কাজে সাহসী করে তোলে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সাহস, এ দুটোই ইবরাহিমি হানিফিয়্যাতের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয় স্তম্ভ: ইসলাম।
হানিফিয়্যাত যখন অন্তরে পূর্ণতা পায়, তখন ইসলাম আসে। এটি পরিচয় বা বংশগত ধর্ম নয়—বরং পরম আনুগত্যের ইসলাম, যা আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কাছে দাবি করেন। যেমন বলা হয়েছে:
“যখন তাঁর প্রভু তাঁকে বললেন: ইসলাম আনো—তিনি বললেন: আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।”
এই ইসলামই তিনি তাঁর সন্তানদের প্রতি অসিয়ত হিসেবে রেখে যান, এবং ইয়াকুবও একই অসিয়ত তার সন্তানদের দিয়ে যান, যাতে এই পরম আত্মসমর্পণ তাদের জীবনের নিখুঁত কর্মপদ্ধতি হয়, কোনো উপাধি বা বংশগত পরিচয় নয়।
তৃতীয় স্তম্ভ : শির্ক বর্জন।
ইবরাহিমি মিল্লাতের অস্তিত্বই দাঁড়িয়ে আছে এই মূল নিষেধাজ্ঞার ওপর, শির্ক একেবারেই থাকবে না। সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টি, ইবাদতে ও সাহায্য প্রার্থনায় তাদের মাঝে কখনোই কোনো সমতা হতে পারে না। এই মূলনীতিতে যেকোনো সামান্য শিথিলতাও পুরো কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। এ কারণেই ইবরাহিমি মিল্লাতকে বর্ণনা করা হয়েছে এই দৃঢ় ঘোষণার সঙ্গে:
“বরং ইবরাহিমের মিল্লাত, হানিফ, এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।”
এইভাবে সম্পূর্ণ হয় দ্বীনের দুটি ভিত্তি—
ফিতরত, যা মানুষের অন্তরে দ্বীনের সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে;
এবং ইবরাহিমি মিল্লাত, যা দ্বীনের চেহারাকে বাস্তবে স্পষ্ট করে তোলে।
এই দুই একত্র হলে, মানুষ ফিরে যায় তার প্রথম সত্তায়, সেই সত্তায় যা তার রবকে অন্য যেকোনো পরিচয়ের আগেই চিনে নেয়, এবং যেকোনো আলো পাওয়ার আগেই তাঁর নামে নিজেকে আলোকিত করে।
——————–
ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, তাজকিয়াহ, উপদেশ।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7665