Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম : আল্লাহ বাণী : وألقينا على كرسيه جسدا এর

শিরোনাম : আল্লাহ বাণী : وألقينا على كرسيه جسدا এর অর্থ
——-

লন্ডন, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত আমার বন্ধু প্রফেসর আমজাদ শায়েখ আমাকে কুরআনের এই আয়াতের অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছেন: “ وألقينا على كرسيه جسدا”
এই আয়াত সম্পর্কে একটু আলোকপাত করলে উপকৃত হতাম।

উত্তর:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“وَلَقَدْ فَتَنَّا سُلَيْمَـٰنَ وَأَلْقَيْنَا عَلَىٰ كُرْسِيِّهِۦ جَسَدًا ثُمَّ أَنَاب”
সূরা সাদ, আয়াত ৩৪।

আমি বলি: তাফসিরের কিতাবগুলো এই আয়াতের ব্যাখ্যায় এমনসব ভিত্তিহীন গল্প, কল্পকাহিনি ও অশোভন বক্তব্যে ভরে গেছে, যা নবীদের নিষ্পাপত্বের পরিপন্থী এবং সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর রাজত্বকে যেন পুরোপুরি জাদু ও কুসংস্কারের সাথে যুক্ত করে ফেলে, আল্লাহ আমাদের তা থেকে রক্ষা করুন। আমি সেগুলো উল্লেখ করতেও সংকোচবোধ করি, কারণ আশঙ্কা করি, যেন আমার ওপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এই বাণী প্রযোজ্য না হয়ে যায়: “মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বর্ণনা করে।”

আমি বলি: আয়াতের প্রেক্ষাপট থেকে স্পষ্ট হয় যে, এটি সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) এর আরেকটি প্রত্যাবর্তন ও আল্লাহমুখী হওয়ার উদাহরণ তুলে ধরছে, যার ব্যাখ্যা এর আগেও “فَطَفِقَ مَسْحَۢا بِٱلسُّوقِ وَٱلْأَعْنَاقِ ” আয়াতের আলোচনায় এসেছে।

জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ তাআলা তাঁর নেক বান্দাদের কখনো এমনিতেই পরীক্ষা করেন না যে তারা কোনো গুনাহ করেছে; বরং তিনি তাদের পরীক্ষা করেন, তারা কি আরও বেশি তাঁর দিকে ফিরে আসে, তাঁর সান্নিধ্য লাভে সচেষ্ট হয়, না কি দূরে সরে যায়। এ ধরনের পরীক্ষা আল্লাহর একটি স্থায়ী নিয়ম, যা নবীগণ ও সৎকর্মপরায়ণদের জীবনে বারবার দেখা যায়।

হাদিসে এসেছে, এক সাহাবি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে জিজ্ঞাসা করলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় কারা পড়ে?” তিনি বললেন: “নবীগণ, তারপর যারা তাদের নিকটতম মর্যাদার অধিকারী, তারপর ক্রমান্বয়ে অন্যরা। মানুষকে তার দ্বীনের পরিমাণ অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়…”—এমনকি সে এমন অবস্থায় পৃথিবীতে চলাফেরা করে, যখন তার ওপর কোনো গুনাহ অবশিষ্ট থাকে না।

আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন। এক সাহাবি বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার তো কঠিন জ্বর হয়েছে।” তিনি বললেন: “হ্যাঁ, তোমাদের দু’জন মানুষের সমান কষ্ট আমাকে দেওয়া হয়।” সাহাবি বললেন: “এ জন্য কি আপনার জন্য দ্বিগুণ প্রতিদান?” তিনি বললেন: “হ্যাঁ।” তারপর তিনি বললেন: “কোনো মুসলিমের ওপর কোনো কষ্ট, যত ক্ষুদ্রই হোক, এমনকি কাঁটার খোঁচাও, আসলে আল্লাহ তা দ্বারা তার গুনাহসমূহ ঝরিয়ে দেন, যেমন গাছ তার পাতা ঝরিয়ে ফেলে।”

এখানে আল্লাহ তাআলা সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর ওপর আসা দুই ধরনের পরীক্ষাকে একত্রে উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি ছিল অনুগ্রহের, যেখানে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন; দ্বিতীয়টি ছিল কঠিনতার, যেখানে তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন। আর উভয় অবস্থাতেই তিনি ছিলেন আল্লাহমুখী, তাঁর দিকে বারবার ফিরে আসতেন।

এই কঠিন পরীক্ষার ঘটনা হলো: সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর রাজত্ব ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত ও শক্তিশালী। তাঁর শাসনভূমি ছিল সুদূরপ্রসারী। কিন্তু হঠাৎ তাঁর শত্রুরা একত্রিত হয়ে আক্রমণ চালায়, সম্মিলিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, এবং একে একে তাঁর নগর ও জনপদ দখল করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের একটি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া আর কিছুই তাঁর হাতে অবশিষ্ট থাকে না।

এই পরিস্থিতি তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। তিনি ভীষণভাবে চিন্তাগ্রস্ত ও শোকার্ত হয়ে পড়েন। দুঃখ ও কষ্টে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন, অসুস্থ হয়ে যান, প্রাণশক্তি ও উদ্যম হারিয়ে ফেলেন, একজন ভগ্নহৃদয়, ক্লান্ত ও নিস্তেজ মানুষে পরিণত হন।

এই দুর্বল অবস্থাকেই কুরআন এই ভাষায় প্রকাশ করেছে:
“আমরা তাঁর সিংহাসনের উপর এক দেহ নিক্ষেপ করেছিলাম”—অর্থাৎ তিনি তাঁর সিংহাসনে ছিলেন বটে, কিন্তু এমন দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যেন প্রাণহীন একটি দেহমাত্র।

ইমাম রাজী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসিরে বলেন: “জাসাদান”—অর্থাৎ তীব্র অসুস্থতার কারণে এমন অবস্থায় পৌঁছানো। আরবরা দুর্বল ব্যক্তিকে এভাবে বর্ণনা করে: ‘সে যেন থালার উপর রাখা এক টুকরো মাংস’ বা ‘প্রাণহীন এক দেহ’।

আর “তারপর সে ফিরে এল”—এর অর্থ, এত বড় বিপদের মধ্যেও সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। বরং তিনি ধৈর্য ও প্রত্যাশা নিয়ে তাঁর প্রভুর দিকে ফিরে এসেছেন, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এটাই নেককারদের স্বভাব, তারা বিপদে নিজেদেরকেই দোষী মনে করে, এবং আল্লাহর দিকেই ফিরে যায়, তাঁর সাহায্য কামনা করে এবং তাঁর ওপরই ভরসা রাখে।

এরপর সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) তাঁর প্রভুর কাছে প্রার্থনা করেন:
رب هب لي ملكا لا ينبغي لأحد من بعدي
“হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমন এক রাজত্ব দান করুন, যা আমার পরে আর কারো জন্য শোভন হবে না।”

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *