Skip to main content

AkramNadwi

পর্দা পালনে ভারসাম্য: শরীয়ত, সমাজ ও ব্যক্তিগত সাধনা

পর্দা পালনে ভারসাম্য: শরীয়ত, সমাজ ও ব্যক্তিগত সাধনা

|| প্রশ্ন:

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ, শাইখ।

আল্লাহ তাআলা আপনাকে বরকত দান করুন এবং আপনার সৎ আমলসমূহ কবুল করুন।

সূরা আল-আহ্‌যাবের ৫৯-তম আয়াতের তাফসিরে বর্ণিত আছে যে ‘জিলবাব’ হল একটি লম্বা কাপড়, যা পুরো দেহ—মুখসহ—আবৃত করত। উবায়দা সালমানি (রহ.) এর উদাহরণে দেখা যায়, তিনি মাথা ও মুখ ঢেকে এক চোখ খোলা রাখতেন।

যদি এটিই মুসলিম নারীর জন্য পর্দার সর্বাঙ্গীণ রূপ হয়, তবে আমার প্রশ্ন—

১. এমন দেশে বসবাসকারী একজন মুসলিমা কীভাবে তা পালন করবেন, যেখানে পরিবেশ অনুকূল নয় এবং এতে কষ্ট, বৈষম্য বা নিরাপত্তাহানির আশঙ্কা রয়েছে?

২. ধাপে ধাপে পালনের কিংবা সাময়িক ছাড় নেওয়ার কি সুযোগ আছে, এই নিয়তে যে পরে সম্পূর্ণ রূপে বাস্তবায়ন করবেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন?

৩. যদি কোনো মুসলিম নারী ঢিলে পোশাক পরেন যা সমগ্র দেহ আচ্ছাদিত করে, মাথা ঢাকার জন্য হিজাব ব্যবহার করেন এবং নেকাবের বদলে মুখোশ (ফেস-মাস্ক) পরেন—এটি কি ওই পরিস্থিতিতে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য গণ্য হবে?

জাযাকাল্লাহু খাইরান।

|| উত্তর:

ওয়াআলাইকুমুস্‌সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ্‌।

আল্লাহ আপনাকে তাঁর নির্দেশ বোঝার আন্তরিক প্রয়াসের জন্য পুরস্কৃত করুন এবং এমনভাবে দ্বিন পালন করার তাওফিক দিন, যা তাঁর কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

“হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মু’মিন নারীদের বলুন—তারা যেন নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চিনতে পারা সহজ হবে এবং তারা দুঃখ-নির্যাতন থেকে রক্ষা পাবে। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-আহ্‌যাব ৩৩:৫৯)

এই আয়াতে বর্ণিত ‘জিলবাব’ সম্পর্কে পূর্ববর্তী আলিমগণ একমত যে, এটি বাড়ির সাধারণ পোশাকের ওপর ঢিলেঢালা এক বহিরাবরণ; বাইরে বের হলে একজন নারী তা পরিধান করেন, যাতে ভেতরের পোশাকের সৌন্দর্য ও আকার লুকায়িত থাকে, লজ্জাশীলতা বজায় থাকে এবং মুসলিম নারীর মর্যাদা সংরক্ষিত হয়।

সুতরাং ‘জিলবাব’ কোনও নির্দিষ্ট কাট-ছাঁট নয়; মূল উদ্দেশ্য হল এর কার্যকারিতা। আমাদের সময়ে ঢিলেঢালা আবায়া, চাদর অথবা লম্বা, যথেষ্ট ঢোলা ও অস্বচ্ছ কোটও জিলবাবের উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে—শর্ত হল, সেটি নিজে যেন সাজ-সজ্জার উপকরণ না হয়।

উবায়দা সালমানি (রহ.)-এর বর্ণনা যে তিনি মাথা ও মুখ ঢেকে এক চোখ খোলা রাখতেন, তা আয়াতটি পালনের এক অতিশয় লজ্জাশীল রূপ তুলে ধরে। বহু আলিম মুখ-ঢাকাকে প্রশংসনীয় ও ফজিলতপূর্ণ কাজ বললেও, এর থেকে এটি অবশ্যকর্তব্য বোঝানোর সুযোগ নেই। অধিকাংশ ফকিহের মতে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নারীর মুখ ও হাত পর্দার আবশ্যিক আওরাহের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং নেকাব পরা উত্তম ইবাদত হলেও, অধিকাংশ মাযহাব মতে এটি ফরজ নয়।

অতঃপর, যে মুসলিমা ঢিলেঢালা, অস্বচ্ছ পোশাক দিয়ে পূর্ণ দেহ ঢাকেন, যথাযথ হিজাব দিয়ে চুল আড়াল করেন এবং সাধারণ পোশাকের উপর একটি বহিরাবরণ পরেন—তিনি কুরআনে বর্ণিত জিলবাবের আবশ্যক শর্ত পূরণ করলেন, যদিও মুখ না ঢাকেন।

যদি কোনো সমাজে নেকাব পরা সত্যিই দুর্ভোগ, শত্রুতা, বৈষম্য বা নিরাপত্তাহানির কারণ হয়, তবে মুখ অনাবৃত রাখায় তিনি দোষারোপযোগ্য নন, কারণ অধিকাংশ আলিমের মতে এটি ওয়াজিব নয়। বরং তিনি নির্ভয়ে এবং প্রজ্ঞাসহকারে বাধ্যতামূলক পর্দা বজায় রাখুন।

তারপরও যদি তিনি ভবিষ্যতে আরও উন্নত লজ্জাশীলতার ধাপ গ্রহণ করতে চান, তবে নিজের পরিস্থিতি অনুসারে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া মোটেও দোষের নয়। আন্তরিক দোয়া করুন যাতে আল্লাহ ঈমান মজবুত করেন ও আনুগত্যকে সহজ করে দেন। মুমিনের জীবনের উন্নতি এক ধারাবাহিক অভিযাত্রা; আল্লাহ খাঁটি নিয়ত ও আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রতিদান দেন।

সর্বশেষে স্মরণ রাখা দরকার, ইসলামী লজ্জাশীলতা (হায়া) কেবল পোষাকে সীমাবদ্ধ নয়; তা আচরণ, বাচনভঙ্গি, শিষ্টাচার ও আল্লাহ-সচেতনতার সমষ্টি। বাহ্যিক পর্দা এর গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ হলেও, সেটিই এর সম্পূর্ণ রূপ নয়।

আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি—তিনি যেন আমাদের সকল বোনকে তাঁর হেদায়াতে অবিচল রাখেন, ঈমান ও লজ্জাশীলতা দ্বারা তাদের সৌন্দর্যময় করেন, যেখানেই থাকুন তাদের হেফাজত করেন এবং দ্বিন-পালনকে তাদের জন্য সহজ ও প্রিয় করে দেন।

———-

ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, উপদেশ, তাজকিয়াহ

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/9778

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *