AkramNadwi

শিরোনাম: জ্ঞানের ভিত্তি ধারণাত্মক কেন? ——— ড

শিরোনাম: জ্ঞানের ভিত্তি ধারণাত্মক কেন?
———
ড. মুহাম্মদ আকরম নাদভী
অক্সফোর্ড
২৫/৬/২০২৬

ইলম–দর্শনের মৌলিক প্রশ্নটি হল—মানুষ কোন ভিত্তিতে কোনো কিছুকে ‘জ্ঞান’ বলে ঘোষণা করে? যখন আমরা বলি, ‘আমি জানি’, তখন প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের দাবি পেশ করছি? এর মানে কি এই যে, আমাদের জ্ঞান কখনো ভুল হতে পারে না; বাস্তবরূপ থেকে বিচ্যুতি ঘটার কোনো অবকাশই আর রইল না? নাকি এর অর্থ কেবল এই যে, আমাদের বিশ্বাসকে সমর্থন করার জন্য এত শক্ত প্রমাণ বিদ্যমান, যা গ্রহণ করা বুদ্ধির দৃষ্টিতে যথার্থ ও ন্যায়সংগত? ঠিক এখান থেকেই এই আলোচনার সূত্রপাত হয়: জ্ঞানের ভিত্তি কেন ‘কাতঈ’ বা সুনিশ্চিত না হয়ে ‘জন্নি’—অর্থাৎ সম্ভাব্য ও প্রবল ধারণা-নির্ভর—হয়?

১. ‘নিশ্চয়তা’র একাধিক মাত্রা
প্রথমে বোঝা দরকার, ‘য়াকীন’ বা দৃঢ়-নিশ্চয়তা এক অর্থে সীমাবদ্ধ নয়।

ক. মনস্তাত্ত্বিক বা আত্মগত নিশ্চিততা—এটি নিছক একটি মানসিক অভিজ্ঞতা; অর্থাৎ মানুষ মনে করে, তার বিশ্বাস বা মতবাদ কখনোই ভুল হতে পারে না। তবে কারও অন্তরাত্মার অগাধ আস্থা কোনো বস্তুগত প্রমাণ নয় যে, তার বিশ্বাস সত্য-পরিণতিও বটে। ইতিহাস ভরে আছে এমন অগণিত আকীদা-মতবাদে, যেগুলোর প্রতি মানুষ নিঃসংশয় আস্থা রাখত, অথচ পরে সেগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাই মনের নিশ্চয়তা আর বাস্তব-নিশ্চয়তা পরস্পর-নির্ধারক নয়।

খ. সুপ্রামাণিক নিশ্চয়তা—যেখানে কোনো বিশ্বাসের পক্ষে এমন শক্ত জায়েজ রেফারেন্স থাকে, যা তার ভ্রান্ত হওয়ার সব সম্ভাবনা মুছে দেয়। আসল প্রশ্ন হল, আদৌ কি মানুষ এমন সম্পূর্ণ নির্ভুল জ্ঞান অর্জন করতে পারে, যাতে ভুলের কোনো রেশই বাকি থাকে না?

২. জ্ঞানের মাধ্যমসমূহ ও ত্রুটির সম্ভাবনা
যে সব পথ দিয়ে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে, কোনো পথই পূর্ণ নিশ্চয়তার গ্যারান্টি দেয় না।

ক. ইন্দ্রিয়: মানুষ দেখার, শোনার, স্পর্শ, গন্ধ ও স্বাদের মাধ্যমে জগতকে চেনে। কিন্তু ইন্দ্রিয় সত্যকে সরাসরি হাজির করে না; বরং সত্যের একটি ব্যাখ্যা বা রূপান্তর আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়। মরীচিকা, দূরত্বে বস্তুর আকার-বিকৃতি, জলে সোজা কাঠ বেঁকে দেখা, আলোর পার্থক্যে রঙের পরিবর্তন—সবই প্রমাণ করে যে, ইন্দ্রিয় অব্যর্থ আয়না নয়। যখন প্রধান উৎসই সম্ভাব্য ত্রুটি বহন করে, তখন সেখান থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানও নির্ভুল নয়, বরং প্রবল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

খ. স্মৃতি: অতীতকে মানুষ স্মৃতির ভরসায় জানে। কিন্তু মেমোরি নিখুঁত রেকর্ড নয়। তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি সে তার ব্যাখ্যাও রচনা করে। সময়ের সঙ্গে স্মৃতি ক্ষয় হয়, খুঁটিনাটি হারিয়ে যায়, অচেতন ভাবে নতুন তথ্য ঢুকে পড়ে। তাই স্মৃতিনির্ভর জ্ঞানও চূড়ান্ত বলা যায় না।

গ. বুদ্ধি: মানুষের বড় জ্ঞানসূত্র হলেও তা নিজস্ব অখণ্ড নির্ভুলতার নিশ্চয়তা দেয় না। মানুষ তর্ক করে, সিদ্ধান্ত টানে, কিন্তু তর্কে ভুল করতে পারে; যুক্তি-ভ্রান্তি, পক্ষপাত, অসম্পূর্ণ তথ্য—সবই বিভ্রান্ত ফলাফলে টেনে আনে। সুতরাং বুদ্ধিনির্ভর জ্ঞানও পূর্ণ-নিশ্চিত নয়।

ঘ. বিজ্ঞান: পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও ইস্তিকরার ওপর দাঁড়ানো বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এই বাস্তবতাকে আরও উন্মোচিত করে। হাজারো বার একই ফল মিললেও, ভবিষ্যতে ঠিক একইরূপ ঘটবে—এ কথা যুক্তিগতভাবে অবধারিত নয়। তাই বৈজ্ঞানিক নিয়ম সবসময় নতুন প্রমাণের আলোয় সংশোধনের জন্য উন্মুক্ত থাকে। যখন সবচেয়ে শৃঙ্খলিত জ্ঞানক্ষেত্রও সংশোধন-সাপেক্ষ, তখন স্পষ্ট হয়—মানবজ্ঞান নিশ্চয়তার নয়, শক্তভাবে যুক্তি-গাঁথা ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

৩. ‘ইলম’ ও ‘মতামত’—ফারাক কোথায়?
যদি প্রতিটি জ্ঞানেই ভুলের সম্ভাবনা থাকে, তবে ‘ইলম’ আর সাধারণ ‘রায়’-এর ভেদরেখা কোথায়? জ্ঞানতত্ত্বে ‘আল-জন্ন’ মানে কল্পনা বা অলিক অনুমান নয়; বরং এমন বিশ্বাস, যা সংগত যুক্তি, অকাট্য সাক্ষ্য, সঠিক তর্ক ও বিশ্বস্ত সূত্রের ওপর দাঁড়ায়—তবুও তাত্ত্বিকভাবে যার ভ্রান্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি মিলিয়ে যায় না। সুতরাং ইলম ও নিছক মতের প্রভেদ ‘নিশ্চয়তা’র নয়, ‘জায়েজ’ তথা যৌক্তিক সপক্ষে। যে বিশ্বাসের জায়েজ যত পোক্ত, তা তত জ্ঞানগুণে সমৃদ্ধ।

৪. জ্ঞানের ধারাভেদে নিশ্চিততার প্রকৃতি
গণিত ও যুক্তিতে প্রাথমিক স্বীকার্য মেনে নিয়ে সঠিক প্রমাণ করলে ফলাফল অনিবার্য সত্য। তবু এই নিশ্চয়তা কেবল সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর সীমাবদ্ধ; বাহ্য জগতের বিষয়ে সরাসরি বলে না, কেবল নির্দেশ করে—যদি সূচনাবিন্দু সত্য হয়, তবে অমুক ফল আবশ্যিক। এ-কারণে এর নিশ্চয়তা আভ্যন্তরীণ ও আনুষ্ঠানিক; বহির্বাস্তব সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত দাওয়াই নয়।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, জীববিদ্যা, ইতিহাস, সমাজবিদ্যা, মনস্তত্ত্ব—সব বাহ্য জগতসংশ্লিষ্ট। এদের সকলের ভরসা পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও প্রমাণ, যেগুলো নিজেই ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। তাই সেসব থেকে আহরিত ইলমও স্বভাবতই ধারণাত্মক। কখনো সাক্ষ্য এত প্রগাঢ় হয় যে, তার ওপর সন্দেহ করা অবান্তর; তবু দার্শনিক দৃষ্টিতে ত্রুটির অবকাশ রয়ে যায়।

নৈতিক জ্ঞানেও অবস্থাটা সেরকম। মানুষ কোনো-কোনো নীতিবিধির প্রতি

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *