যে ব্যক্তি নিজের পরিচয়ের বিপরীত রূপ ধারণ করে
https://t.me/DrAkramNadwi/2422
بسم الله الرحمن الرحيم.
❝
————————-
দুটি পাখি এক বিশাল গাছের ডালে বসে ছিল, তারা মধুর সুরে ডাকছিল এবং নিজেদের প্রভুর প্রশংসা করছিল। এমন সময় তারা দেখল, এক ব্যক্তি তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তখন এক পাখি তার সঙ্গীকে বলল, “চলো, আমরা উড়ে আকাশে উঁচুতে চলে যাই। আমি ভয় পাচ্ছি, এই ব্যক্তি আমাদের হত্যা করবে।”
অন্য পাখিটি বলল, “না, সে তো খোদাভীরু ও সৎ ব্যক্তিদের পোশাক পরেছে, মাথায় বেঁধেছে সাধু-সন্ন্যাসীদের পাগড়ি। তুমি কি সম্মানিত ও মহৎ ব্যক্তিদের ভয় পাচ্ছ? নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাদের হত্যা করবে না, আমাদের ভয়ও দেখাবে না।”
কিন্তু যখন সেই ব্যক্তি তাদের কাছাকাছি এল, তখন সে নিজের পোশাকের নিচ থেকে একটি ধনুক বের করল, তীর তাক করল এবং এক পাখিকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল, ফলে পাখিটি নিহত হলো।
তার সঙ্গী তখন রাজ্যের বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে বিচার দাবি করল এবং শিকারির এই অপরাধের অভিযোগ জানাল। বাদশাহ শিকারিকে তলব করলেন এবং পাখি হত্যার কারণ জানতে চাইলেন। শিকারি স্বীকার করল যে সে-ই পাখিটিকে হত্যা করেছে।
তখন বাদশাহ পাখিটির দিকে ফিরে বললেন, “আমি তোমাকে শিকারির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা দিচ্ছি, তুমি তার জন্য যে শাস্তি নির্ধারণ করতে চাও, তা দাও।”
পাখিটি বলল, “হে মহারাজ! আমি আপনার কাছে এটুকুই প্রার্থনা করছি যে আপনি তাকে এই আদেশ দিন—যদি সে সত্যিই একজন শিকারি হয়, তবে যেন সে শিকারিদের পোশাকই পরে।”
এই বিশ্ব-ব্যবস্থা নষ্ট করার জন্য আর কি কিছু বাকি রইল, যখন মানুষ নিজেদের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে বিপরীত রূপ ধারণ করছে? তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে প্রতারিত করছে, পৃথিবীতে ফেতনা-ফ্যাসাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যায়-অবিচারকে প্রসারিত করছে, এবং ধ্বংস-ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করছে।
ডাকাত ও দস্যুরা এখন শাসক ও রাষ্ট্রপ্রধানদের বেশ ধরে, তারা দেশ দখল করে নিচ্ছে এবং জনগণের ভাগ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। তারা বাহ্যিকভাবে উপদেশ দেয়, অথচ অন্তরে প্রতারণা লুকিয়ে রাখে; তারা আমানতের দাবিদার, অথচ স্বভাবগতভাবে বিশ্বাসঘাতক। তারা জনগণের জন্য পৃথিবীকে সংকীর্ণ করে তোলে, নিরাপত্তা ও শান্তি কেড়ে নেয়, এবং তাদের হৃদয়ে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
নিচু স্বভাবের অজ্ঞরা, যারা কেবল মূর্খতা ও লোভে নিমগ্ন, তারা এখন আলেম ও ফকিহদের বেশ ধরে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক হয়ে বসে, মসজিদ ও জনসমাবেশে বক্তৃতা দেয়, পত্র-পত্রিকায় লিখে। অথচ তারা নিজে বিভ্রান্ত এবং অন্যদেরও বিভ্রান্ত করছে।
দুনিয়ার মোহে আসক্ত ও অর্থলোভী ব্যক্তিরা সাধু-সন্ন্যাসীদের বেশ ধরছে—বাহ্যিকভাবে বিষণ্ণতা ও দুঃখভারাক্রান্ত চেহারা দেখায়, মিথ্যা আত্মিক অবস্থার দাবি করে, ভুয়া স্বপ্ন ও ইলহামের গল্প তৈরি করে। তারা মানুষের বুদ্ধি ও বিবেক নিয়ে উপহাস করে, তাদের চিন্তাধারার সঙ্গে খেলা করে, এবং প্রতারণার মাধ্যমে অন্যের কষ্টার্জিত সম্পদ আত্মসাৎ করে। তারা হারামকে বৈধ বলে চালিয়ে দেয়, নোংরামিকে হালাল ঘোষণা করে, চতুরতার সর্বোচ্চ কৌশল প্রয়োগ করে। তারা গরিবকে দয়া করে না, দুর্বলদের সহানুভূতি দেখায় না, সম্মানের কোনো সীমারেখা মানে না।
স্বার্থান্বেষী, ধূর্ত ও লোভী ব্যক্তিরা এখন শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, অর্থনীতিবিদ, বিনিয়োগকারী ও আর্থিক ব্যবস্থাপক সেজে বসেছে। তারা মানুষের সম্পদ লুটে নিচ্ছে, বিশাল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ কুক্ষিগত করছে, সম্পদকে কেবল নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে, আর সাধারণ জনগণকে দারিদ্র্যের গভীরে ঠেলে দিচ্ছে।
তাই হে আল্লাহর বান্দাগণ! বাহ্যিক পোশাকে প্রতারিত হয়ো না, মিথ্যা স্লোগানে বিভ্রান্ত হয়ো না। তোমাদের বুদ্ধিকে আলোকিত করো, আল্লাহর কিতাবের আলোয় পথ চলো, সচেতন হও, এবং গাফিল থেকে বেঁচে থাকো।
——————–
# উপদেশ
লিখেছেন :
মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী – অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা:
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।