অক্সফোর্ডে প্রথম ঈদ

আধ্যাত্মিকতাইবাদতচরিত্র ও নৈতিকতা
The First Eid in Oxford

১৯/৩/২০২৬
بسم الله الرحمن الرحيم

কখনো ঈদও হতো, দীপাবলিও হতো মিলেমিশে, আজ অবস্থা এমন, ভয়ে ভয়ে আলিঙ্গন করি একে অপরকে।

“ঈদ” এই শব্দটি কানে আসতেই হৃদয়ের কোনো গোপন কোণে যেন একটি প্রদীপ জ্বলে ওঠে। কিন্তু এই প্রদীপ সব ভূখণ্ডে একই তেলে জ্বলে না। কোথাও তা অচেনা শীতল হাওয়ায় নিভে যেতে যেতে একগুঁয়ে আশার মতো কাঁপতে থাকে, আর কোথাও শৈশবের গলিতে আনন্দের ঝড়ের মাঝে সূর্যের মতো উদিত হয়,
এক এমন সূর্য, যার আলো শুধু চোখই নয়, আত্মার অন্ধকার কোণগুলোও আলোকিত করে দেয়; যেন হঠাৎ কোনো বন্ধ ঘরের জানালা খুলে যায়, আর আলো ঢলঢল করে ভেতরে প্রবেশ করে।

১৯৯১ সালের সেই প্রথম ঈদ (অক্সফোর্ডে) আজও আমার স্মৃতির পাতায় এক আধপোড়া চিঠির মতো রয়ে গেছে। তার অক্ষরগুলো হয়তো ঝাপসা হয়ে গেছে, কিন্তু তার উষ্ণতা এখনো অটুট।
সে ঈদ কোনো উৎসব ছিল না; বরং এক নিঃশব্দ শোকগাথা, যা আমি নিজের হৃদয়ের কবরের পাশে বসে ধীরে ধীরে পাঠ করেছিলাম।

সকাল হলো, কিন্তু সেই সকালের মধ্যে ছিল না আমাদের জন্মভূমির ঈদের উজ্জ্বলতা। এখানে ভোর যেন এক ভদ্র নীরবতার আবরণে বন্দী, এমন নীরবতা, যেন সময় নিজেই শ্বাসরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে; যেন আকাশ-বাতাস কোনো অজানা শোকের প্রতি সম্মান জানিয়ে মাথা নত করে আছে।
জানালার বাইরে রাস্তাগুলো বৃষ্টিতে ধোয়া, তবুও মনে হয়, যেন অশ্রু ঝরিয়েও হৃদয় হালকা হয়নি। গাছগুলো নিশ্চল দাঁড়িয়ে, যেন সময়ের ক্লান্ত পথিক, অন্তহীন অপেক্ষায় থেমে আছে।

আমি নতুন কাপড় পরলাম, কিন্তু সেগুলো শরীরে এমন লাগছিল, যেন আনন্দের পোশাক নয়, একাকীত্বের কাফন। আয়নায় নিজেকে দেখে নিজের মুখই অচেনা লাগল—যেন নিজের অস্তিত্বেই আমি একজন অতিথি হয়ে গেছি।
মনের ভেতর এক মৃদু স্বর উঠল,
এ ঈদ… কিন্তু এ সেই ঈদ নয়।

ঈদের দিন, আমি ঘরে পড়ে আছি, হে আকরম,
নিজের দরজাকে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে।

সে দরজা শুধু কাঠের ছিল না, এটি ছিল আমার আর দুনিয়ার মাঝখানে এক নিঃশব্দ দূরত্ব। আমি নিজেকে বন্দী করে রেখেছিলাম, যেন কোনো আহত পাখি ডানা গুটিয়ে অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকে, যাতে আলো এসে তার ক্ষতগুলো আরও স্পষ্ট না করে দেয়।

ধীরে ধীরে এই সত্য উন্মোচিত হলো, অভাব ঋতুর ছিল না, শহরেরও ছিল না; বরং অভাব ছিল সেই মুখগুলোর, যারা ছিল আমার ঈদের আকাশ, আর সেই কণ্ঠগুলোর, যারা আমার ভেতরে আজানের মতো ধ্বনিত হতো।

অক্সফোর্ডের ঈদে মানুষ ছিল, কিন্তু যেন সবাই নিজ নিজ খোলসে বন্দী। মসজিদের বাইরে করমর্দন হলো, দোয়া বিনিময় হলো, কিন্তু সবকিছুই এমন লাগছিল যেন কাঁচের ওপার থেকে দেওয়া, দেখা যায়, কিন্তু স্পর্শে উষ্ণতা নেই।
এখানে আনন্দ এক ভদ্র পোশাক পরে চলে, কিন্তু তার পদচারণায় একাকীত্বের শিকলের মৃদু ঝংকার, যা হৃদয়ের নির্জন কক্ষে আরও তীব্রভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।

তুমি আমার খবর পাবে না, আমিও তোমার, এবারও ঈদ নীরবে পায়ে পায়ে চলে যাবে।

তারপর, হৃদয় বিদ্রোহ করল। স্মৃতির দরজা খুলে গেল, আর আমি এক মুহূর্তেই অক্সফোর্ড থেকে ফিরে গেলাম জিমদাহে।

জিমদাহ… যেখানে ঈদ কেবল একটি দিন ছিল না; বরং এক জীবন্ত নদী, যা ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে গলিতে গলিতে প্রবাহিত হতো।
সেখানে সকাল এমনভাবে উদিত হতো, যেন পৃথিবী নিজেই আকাশকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করছে। মাটির গন্ধ এমন ছিল, যেন মা তার শিশুকে বুকে টেনে নিয়ে কপালে চুমু খেয়েছে।

সেখানে ঈদ শুধু মানুষের ছিল না, সবকিছুরই ঈদ ছিল: গাছের, পাখির, এমনকি চাঁদেরও, তুমি যখন ঈদের চাঁদ দেখেছ,
চাঁদেরও যেন ঈদ হয়ে গেছে।

আমার শৈশব মনে পড়ল, সে নতুন কাপড়, যা শরীরে নয়, হৃদয়ে পরা হতো।
আমি যখন ঘর থেকে বের হতাম, মনে হতো আমি কোনো শিশু নই, বরং আনন্দের এক ক্ষুদ্র প্রদীপ, যে গ্রামের গলিতে গলিতে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
চারদিক থেকে “ঈদ মোবারক” ধ্বনি ভেসে আসত, সেই ধ্বনিগুলো যেন আকাশে ছড়িয়ে পড়া সাদা কবুতর, যা প্রতিটি হৃদয়ে এসে বসে যেত।

মসজিদ থেকে মানুষ বের হলে মনে হতো, যেন বাঁধ ভেঙে এক নদী প্রবাহিত হচ্ছে। আলিঙ্গন যেন দুই বিচ্ছিন্ন আত্মার আশ্রয় পাওয়া, আর করমর্দন যেন হৃদয় হাতের মুঠোয় এসে ধুকধুক করছে।
সেখানে কোনো দূরত্ব ছিল না, কোনো ভয় ছিল না, সবকিছুই ছিল উন্মুক্ত, আলোকোজ্জ্বল, আর প্রাণবন্ত।

আর ঘর… ঘর তো যেন জান্নাতের এক কোণ।
মায়ের হাতের সেমাই শুধু মিষ্টি ছিল না, তা ছিল ভালোবাসার মুক্তো, যা প্রতিটি লোকমার সঙ্গে হৃদয়ে গেঁথে যেত।
বাসনের শব্দ, শিশুদের হাসি, অতিথিদের আনাগোনা, সব মিলিয়ে এক এমন জগৎ, যেখানে আনন্দ শুধু অনুভূতি নয়, বরং এক পূর্ণ জীবন।

আমরা সবাই এক থালা থেকে খেতাম, তবুও কখনো অভাব হতো না।
কারণ, আমাদের মাঝে বরকত শ্বাস নিত,
এক নীরব অতিথির মতো, যে প্রতিটি হৃদয়কে ভরে দিত।

আর তারপর… আমি আবার ফিরে এলাম অক্সফোর্ডে,
সেই একই নীরবতা, সেই একই অচেনাভাব, সেই একই নিঃসঙ্গতা।

সেদিন প্রথমবার গভীরভাবে অনুভব করলাম, ঈদের আসল অর্থ হলো মিলন।
নিঃসঙ্গতায় ঈদ পালন করা যেন এক পরিত্যক্ত মসজিদে একা আজান দেওয়া,
স্বর তো প্রতিধ্বনিত হয়, কিন্তু কোনো সাড়া আসে না;
ডাক ফিরে এসে নিজের বুকেই আঘাত হানে।

অক্সফোর্ডের ঈদ ছিল এক কবিতা,
সুশৃঙ্খল, পরিমিত, কিন্তু শীতল;
যেন বরফের ওপর লেখা কোনো পংক্তি।

আর জিমদাহর ঈদ ছিল এক গজল,
স্বতঃস্ফূর্ত, উষ্ণ, হৃদয়ে গেঁথে যাওয়ার মতো;
যেন প্রিয়জনের কণ্ঠস্বর।

সেখানে আমি ছিলাম শুধু একজন ব্যক্তি,
আর জিমদাহতে আমি ছিলাম এক সমগ্র,
এক পরিবার, এক ঐতিহ্য, এক মাটির অংশ।
সেখানে আমি নিজেই ছিলাম মাটি,
আর সেই মাটিতে আনন্দ জন্মাতো,
যেমন বৃষ্টির পর সবুজে ঢেকে যায় ভূমি।

আজও যখন সেই প্রথম ঈদের কথা মনে পড়ে,
মনে হয় যেন আমার ভেতরে দুটি নদী বয়ে চলেছে,
একটি নিঃশব্দ, শীতল, স্বচ্ছ;
অন্যটি উষ্ণ, উত্তাল, জীবনভরা।

আর আমি দাঁড়িয়ে আছি তাদের মিলনস্থলে, এক এমন পথিক, যার এক পা বর্তমানের কঠিন জমিনে,
আরেক পা ডুবে আছে অতীতের নরম, সিক্ত মাটিতে।

হৃদয়ের গভীর কোনো কোণে এই সত্য সবসময় জ্বলজ্বল করে,
ঈদ সেই নয়, যা ক্যালেন্ডারের পাতায় আসে;
ঈদ তো সেখানে, যেখানে হৃদয় আপনজনদের সঙ্গে একসাথে স্পন্দিত হয়,
যেখানে “ঈদ মোবারক” শুধু একটি শব্দ নয়,
বরং এক জীবন্ত জগৎ,
যা শ্বাস নেয়, হাসে,
এবং ভালোবাসার মতোই চিরকাল বেঁচে থাকে।

———-

ক্যাটাগরি : রহলাহ, ইসলামি চিন্তাধারা, জামা’ত, আখলাক,

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8742

বক্বরি ঈদ নয় “ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ)
আরবি ও ভাষাইবাদত এআই-অনূদিত

বক্বরি ঈদ নয় “ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ)

ভারতে ঈদুল আজহাকে “বকরি ঈদ” বলা হয়। সাধারণত গ্রামাঞ্চলের ভাষায় “قاف” (ক্বাফ) উচ্চারণ হয় “کاف” (কাফ)-এর মতো। শৈশবে আমরা ভাবতাম, যেহেতু এই ঈদে কোরবানি…

আরও পড়ুন →
মুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্য দিকনির্দেশনা
★ বিশেষ
আধ্যাত্মিকতাচরিত্র ও নৈতিকতা

মুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্য দিকনির্দেশনা

সম্প্রতি একজন একাডেমিক আমাকে অনুরোধ করেছিলেন সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাসরত মুসলিমদের পরিস্থিতি সম্পর্কে চিন্তা করতে, যারা প্রাতিষ্ঠানিক অবিচার, প্রান্তিকীকরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে জীবন ও সম্পত্তির…

আরও পড়ুন →
একটি অস্থির যুগে পথভ্রষ্ট আত্মা
আধ্যাত্মিকতাচরিত্র ও নৈতিকতা এআই-অনূদিত

একটি অস্থির যুগে পথভ্রষ্ট আত্মা

এই যুগে মানুষ এমন সব শব্দ শুনছে যা তার পূর্বপুরুষেরা দীর্ঘ শতাব্দী ধরে শোনেনি; লোহার শব্দ যখন তা নড়ে, যন্ত্রের শব্দ যখন তা কাজ…

আরও পড়ুন →