হৃদয়ের আকাশে রহমতের সূর্যোদয়
|১৬|০২|২০২৬|
ঈমানদাররা যেন ঘর ও মসজিদের উঁচু প্রান্তে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। তাদের পা পাহাড়চূড়ায় না পৌঁছালেও হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা তার চেয়েও উচ্চে উড়ে যায়। তারা প্রত্যাশার এক উজ্জ্বল শিখরে অবস্থান করছে দৃষ্টি প্রসারিত আকাশের দিকে, হৃদয় পবিত্র কম্পনে উদ্বেল।
তাদের অন্তরে একটিই প্রতীক্ষা: কবে সেই সৌভাগ্যের ক্ষণ দিগন্তে উদিত হবে? কবে আল্লাহর মহিমান্বিত মেহমান আমাদের দুয়ারে আসবেন? আর কবে আমাদের ঘুমিয়ে থাকা ভাগ্যে জেগে উঠবে আলোর স্পর্শ?
হঠাৎ দিগন্তের আঁচলে আলোর এক সরু রেখা উদ্ভাসিত হয়। হৃদয় প্রিয়তমের আগমনের সুসংবাদ পায়। মনে হয় যেন আকাশের উচ্চতা নেমে এসেছে পৃথিবীর কাছে, আর জগতের ঊর্ধ্বলোক থেকে এক সম্মানিত কাফেলা আমাদের জনপদের দিকে ধেয়ে আসছে। ধন্য সেই সভা, যা তোমার আগমনে সুশোভিত হয়; ধন্য সেই প্রাঙ্গণ, যা বান্দার সম্পর্ককে মহিমার শিখরে সংযুক্ত করে।
তারপর এমন এক বসন্তের আগমন ঘটে,
যার সৌন্দর্যে সূর্য ও চাঁদও যেন থমকে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে।
এই মাস আরশের বিস্তৃতি থেকে অবতরণ করে, নক্ষত্রমণ্ডল পেরিয়ে মাটির নগরে প্রবেশ করে। আর আমরা তার অভ্যর্থনায় পরিণত হই একান্ত ব্যাকুলতায়। যদি আসমানি পাখিদের ডানা আর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের বাহু একত্রিত হয়, তবুও তারা ধারণ করতে পারবে না সেই সর্বব্যাপী আনন্দ, যা এ বরকতময় মাসের আগমনে হৃদয়ে তরঙ্গিত হয়। এক অচেনা আলো অন্তরে নেমে আসে; চোখ দীপ্ত হয়ে ওঠে; মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে প্রশান্তির ছায়া; প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে মিশে যায় কৃতজ্ঞতার সুর। মনে হয় মানুষ তার সীমাবদ্ধ সত্তা ছাড়িয়ে অন্য এক আকাশে শ্বাস নিচ্ছে, যেন আত্মা ফিরে পেয়েছে তার হারানো দিকনির্দেশ।
সালাম সেই মাসের প্রতি, যে অনুগ্রহ ও রহমতের বার্তাবাহক।
সালাম তার প্রতি, যে সৌন্দর্য ও জ্যোতির উজ্জ্বল প্রদর্শনী।
সালাম তার প্রতি, যে উদারতা ও দানের অসীম ভাণ্ডার।
সালাম তার প্রতি, যে নৈকট্য ও মুনাজাতের ক্ষণ দান করে।
সালাম তার প্রতি, যে অশ্রুকে ইবাদত আর দোয়াকে জীবনের শ্রেষ্ঠ সত্যে পরিণত করে।
হে আল্লাহর মাস! আমরা অপরাধের ভারে ন্যুব্জ, তবু হাতে আশার প্রদীপ নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের আঁচল শূন্য হতে পারে, কিন্তু দৃষ্টি উত্থিত তোমার করুণার দিকে। এসো, আমাদের বিরান হৃদয়ে বসন্ত জাগিয়ে দাও; আমাদের শুষ্ক মাটিতে বর্ষিত করো রহমতের বৃষ্টি।
প্রিয়ের বিচ্ছেদে কেমন আনন্দ, হে সঙ্গী?
প্রাণের উল্লাসও তো হিজরের বেদনায় উৎসর্গিত হয়ে গেছে।
চাঁদের ক্ষুদ্র হিলাল উদিত হয়, মিলনের দুয়ার উন্মুক্ত হয়, বিচ্ছেদের দীর্ঘ অধ্যায় সমাপ্ত হয়। হৃদয়ের অস্থিরতা পায় প্রশান্তি। আত্মা, যে বহুদিন অজানা তৃষ্ণায় পথ হারিয়ে ফিরছিল, হঠাৎ পরিচিত এক ঝরনার ধ্বনি শুনতে পায়। শরতের শীতল দীর্ঘশ্বাস বিদায় নেয়, আর এমন বসন্ত আসে, যা ফুলের চেয়েও বেশি আনন্দ বিলায় হৃদয়ে। আকাশে আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়, কুরআনের তিলাওয়াত যেন আলোর ফোঁটার মতো ঝরে পড়ে জমিনে।
তোমার ঠিকানা যখন সমীরণে পেল উদ্যান,
বুলবুল নৃত্যে মেতে উঠল, কুঁড়িও মেলে দিল পাপড়ি।
রমজান ইবাদতের এক বিদ্যালয়, আর রোজা তার প্রথম পাঠ। এখানে মানুষ শেখে নিজের কামনার মুখোমুখি দাঁড়াতে। ঠোঁটে নীরবতার মোহর বসে, জিহ্বার বেপরোয়া স্বভাবকে লাগাম দেওয়া হয়। যে নফস গতকাল ছিল শাসক, আজ সে হয়ে যায় অনুগত। মানুষ উপলব্ধি করে, সে রুটির মুখাপেক্ষী হতে পারে, কিন্তু তার দাস নয়; সে পানির প্রয়োজন অনুভব করে, কিন্তু তার গোলাম নয়। যখন পেট খালি হয়, হৃদয় ভরে ওঠে; যখন দেহ দুর্বল হয়, সংকল্প দৃঢ় হয়ে যায়। এ ক্ষুধা শুধু শরীরের নয়, এ আত্মার জাগরণ; এমন এক জাগরণ, যা মানুষকে তার আসল মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
রোজাদারের আত্মা ধীরে ধীরে দুনিয়ার কলুষতার ঊর্ধ্বে উঠতে থাকে। না তৃষ্ণা তাকে অস্থির করে, না ক্ষুধা তাকে ব্যাকুল করে। তার অন্তরে জন্ম নেয় এক নতুন অন্তর্দৃষ্টি। যখন সে দেখে তার নফস নিয়ন্ত্রিত, তখন সে বুঝতে পারে, প্রকৃত শক্তি কামনার অনুসরণে নয়, বরং তার ওপর বিজয়ে। ফেরেশতারা ঈর্ষামিশ্রিত দৃষ্টিতে দেখে, মাটির এই অবয়ব কীভাবে আলোর দিকে যাত্রা করছে, ধূলির এই কণা কীভাবে সত্যের সূর্যের সঙ্গে সংলাপে মগ্ন হয়ে উঠছে।
ইফতারের ক্ষণ উপস্থিত হলে তা আর কেবল একটি খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙার নাম থাকে না; তা হয়ে ওঠে পূর্ণ কৃতজ্ঞতার এক পরিপূর্ণ মুহূর্ত। যে পানির চুমুকে রোজাদার ইফতার করে, তার স্বাদ কতই না অপূর্ব! তার সামনে জীবনের অমৃতধারাও তুচ্ছ মনে হয়। বান্দা তখন তার রবের মেহমান হয়ে যায়। পৃথিবীর চিকিৎসকেরা যতই স্নেহশীল ও সহানুভূতিশীল হোক না কেন, যে প্রলেপে আমাদের রবের সিলমোহর নেই, তা আমাদের কাছে ক্ষতেরই শত্রু। দোয়ার জন্য উঠানো হাত কখনো শূন্য ফিরে আসে না। যে একটি দরজা সে নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করেছিল, তার বিনিময়ে রহমতের অসংখ্য দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে যায়। তখন সে নিশ্চিত হয়, তার তুচ্ছ কুরবানিকে এক অসীম করুণা গ্রহণ করেছেন এবং তার সামান্য আমলকে নিজের সন্তুষ্টির মাধ্যম বানিয়েছেন।
রোজার সত্য কেবল দিনভর ক্ষুধার্ত থাকা নয়। এর সঙ্গে যদি অন্তরের সংশোধন, দৃষ্টির পবিত্রতা এবং ভাষার সততা যুক্ত না হয়, তবে তা কেবল পরিশ্রমেই সীমাবদ্ধ থাকে। রোজা লজ্জাশীলতার শিক্ষা দেয়, নীরবতায় সত্যের পাঠ দেয়, নির্জনতায় ইখলাসের সাধনা শেখায়। মুমিন নিজের আমল গুনে বেড়ায় না, প্রদর্শনীর বস্তু বানায় না। সে এ মাসকে বরণ করে যেন প্রিয়তম এসেছে। আর যখন তার বিদায়ের কথা মনে পড়ে, হৃদয়ে নেমে আসে এক মৃদু বিষণ্নতা, এমন বিষণ্নতা, যার গভীরে থাকে ভালোবাসার সুগন্ধ।
এ মাস ধৈর্যের মাস। যে এতে আনুগত্য অবলম্বন করে, তার জন্য সুসংবাদ, তার প্রতিদান দুনিয়ার কোনো সাম্রাজ্যের মাপে মাপা যাবে না। সে এমন পুরস্কার পাবে, যার পরিমাপ স্বয়ং আল্লাহর হাতে। দুনিয়ার সব জাঁকজমক ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আনুগত্যের প্রতিদান চিরস্থায়ী। রোজাদারের জন্য রয়েছে এক বিশেষ দরজা, যেখান দিয়ে সে প্রবেশ করবে; রয়েছে এমন এক জান্নাত, যা তার আগমনের জন্য সজ্জিত৷ যেখানে নেই বিচ্ছেদ, নেই ভয়; নেই অবক্ষয়, নেই শঙ্কা।
হে রমজানের মালিক! আমরা এ দাবি করি না যে আমাদের চেয়ে বড় গুনাহগার আর কেউ নেই; কারণ এ স্বীকারোক্তির ভেতরেও কোথাও না কোথাও আত্মপ্রদর্শনের সূক্ষ্ম ছায়া থেকে যায়, আর এককতার দম্ভ অন্তরের ইখলাসকে কলুষিত করে। আমরা শুধু নিজেদের দুর্বলতার কথা জানি। আমাদের এতটুকু বোধ আছে, আমরা সম্পূর্ণ অভাবগ্রস্ত, আর তুমি সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী; আমরা ভুলে পরিপূর্ণ, আর তুমি আচ্ছাদন ও ক্ষমার আধার; আমরা দুর্বলতার প্রতিমূর্তি, আর তুমি সীমাহীন ক্ষমতার উৎস। আমাদের ললাট অনুতাপে নত, আর তোমার করুণার দরজায় আশার প্রদীপ কাঁপছে।
হে রমজান! এসো, তোমার পদধ্বনিতে হৃদয়ের বিরানভূমি সবুজ হয়ে উঠুক। আমাদের অন্তরে এমন প্রদীপ প্রজ্বলিত করো, যা পাপের ঘন অন্ধকার বিদীর্ণ করে দেয়। এমন এক প্রভাত দাও, যার আলোয় নফসের উচ্ছৃঙ্খলতা নিজেই অবনত হয়ে যায়। আমাদের সংকল্পকে দাও অবিচলতার শিলা, আমাদের হৃদয়কে দাও সেই কোমল স্নিগ্ধতা, যাতে অশ্রু ইবাদতে রূপ নেয়, নীরবতা দোয়ার মর্যাদা পায়। আমাদের এমন নৈকট্যের স্বাদ দাও, যাতে দুনিয়ার সব আকর্ষণ তুচ্ছ হয়ে যায়।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে তোমার প্রতীক্ষায় ছিলাম, নিজেদের বঞ্চনার মরুভূমিতে তোমার আগমনের দোয়া করতে করতে। আজ তুমি যখন আলোর চাদর জড়িয়ে আমাদের দিগন্তে উদিত হয়েছ, আমাদের এমনভাবে রূপান্তরিত করো, যেন তোমার বিদায়ের সময় আমাদের পরিচয়ই বদলে যায়। আমাদের হৃদয় আর আগের মতো না থাকে; আমাদের সংকল্প আর হোঁচটের অভ্যাসে অভ্যস্ত না থাকে; আমাদের দৃষ্টি আর দুনিয়ার কুয়াশায় হারিয়ে না থাকে।
এমন করো, যখন তুমি বিদায় নেবে, তখন আমরা নিজের ভেতর এক নতুন জন্মের রহস্য আবিষ্কার করি। গুনাহর অন্ধকার থেকে বেরিয়ে তওবার আলোয় স্নাত হয়ে দাঁড়াই; গাফলতের নিদ্রা ভেঙে সচেতনতার প্রভাতে জেগে উঠি। যেন তোমার বিদায় বঞ্চনা না হয়ে এক আমানত হয়ে থাকে, যা আমাদের অন্তরে চিরদিনের জন্য প্রদীপ হয়ে জ্বলতে থাকে; আমাদের হৃদয়ে জাগায় নতুন অন্তর্দৃষ্টি, আমাদের আমলে আনে নতুন পবিত্রতা, আর আমাদের জীবনে সৃষ্টি করে এক নতুন দিশা।
———-
ক্যাটাগরি : রামাদান, ইসলামি চিন্তাধারা, তাজকিয়াহ,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8427