সহীহ মুসলিম।

জ্ঞানচর্চা ও পদ্ধতিহাদিস
Sahih Muslim

———-

হাদিসের দুটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হলো সহীহ আল-বুখারি ও সহীহ মুসলিম। মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে সবসময় এগুলো পাঠ করা ও পড়ানো হয়েছে, এবং হাদিস ও ফিকহ বিশেষজ্ঞরা সেগুলোর উপর ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন।

সত্য এটাই যে, নির্বাচিত হাদিসের নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে সাধারণত সহীহ আল-বুখারিকে সহীহ মুসলিমের উপরে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে কিছু কারিগরি দিক ও বিশেষ গুণাবলীর কারণে সহীহ মুসলিমকে সহীহ বুখারির উপরে স্থান দেওয়া হয়।

মুসলিম হাদিসবিদদের সাধারণ পদ্ধতি অনুসরণ করে তাঁর সংকলন সাজিয়েছেন। এ কারণে তাঁর গ্রন্থ শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি উপকারী ও ব্যবহারিক—হাদিস সংগ্রহের যে পদ্ধতি তিনি গ্রহণ করেছেন, তা শিক্ষার্থী সহজে বুঝতে পারে। বিপরীতে, সহীহ বুখারিতে হাদিসগুলোকে একসাথে হাদিসশাস্ত্র ও ফিকহের দিক মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে। ফলে একই হাদিস (বা হাদিসের অংশ) বিভিন্ন ফিকহি অধ্যায়ের অধীনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

মুসলিমের পদ্ধতি বুঝতে সহজ হওয়ার একটি কারণ হলো, তিনি তাঁর গ্রন্থের শুরুতে একটি ভূমিকা (মুকাদ্দিমা) লিখেছেন, যেখানে তিনি নিজের শর্তসমূহ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি হাদিস বর্ণনাকারীদের তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন—

প্রথম শ্রেণি: যারা সততা, সত্যবাদিতা, স্মৃতিশক্তি, যথার্থতা ও ধারাবাহিকতার দিক থেকে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। তাঁদের হাদিস সহীহ হিসেবে গণ্য।

দ্বিতীয় শ্রেণি: যারা সততা ও সত্যবাদিতায় প্রথম শ্রেণির মতোই, তবে যথার্থতা ও ধারাবাহিকতার দিক থেকে কিছুটা দুর্বল।

তৃতীয় শ্রেণি: যাদের যথার্থতা ও ধারাবাহিকতায় দুর্বলতা আছে, অথবা যাদের নৈতিক সততা নিয়ে কোনো অভিযোগ আছে।

ইমাম মুসলিম প্রথম শ্রেণির রাবিদের হাদিসের উপর নির্ভর করেছেন এবং তাঁদের কোনো হাদিস বাদ দেননি। সহীহ বুখারির হাদিসগুলিও প্রধানত এ শ্রেণি থেকেই নেওয়া।

দ্বিতীয় শ্রেণির রাবিদের হাদিস থেকে মুসলিম সেরা অংশগুলো গ্রহণ করেছেন, তবে সেগুলোকে প্রথম শ্রেণির হাদিসের সহায়ক দলিল (মুতাবা’আত) হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির রাবিদের হাদিসের উপর এককভাবে নির্ভর করেননি। অর্থাৎ, যদি কোনো হাদিস শুধু দ্বিতীয় শ্রেণির রাবিদের কাছেই পাওয়া যায়, তবে মুসলিম তা তাঁর গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেননি।

তৃতীয় শ্রেণির বা তার নীচের রাবিদের হাদিস মুসলিম একেবারেই গ্রহণ করেননি এবং তাঁর গ্রন্থে অন্তর্ভুক্তও করেননি। আর যদি প্রথম শ্রেণির কোনো হাদিসে ইসনাদ (সনদ) বা মাতন (বক্তব্য) নিয়ে কোনো সমস্যা থেকে থাকে, মুসলিম তা যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

মুসলিম প্রতিটি অধ্যায় শুরু করেন প্রথম শ্রেণির রাবিদের ইসনাদ দিয়ে এবং সেগুলো যথাযথ ক্রমানুসারে সাজান। যদি কোনো ইসনাদে এমন একজন থাকেন যিনি বিশেষজ্ঞতার জন্য অধিক প্রসিদ্ধ, তবে তিনি তাঁর ইসনাদকে অগ্রাধিকার দেন। যদি সবাই সমান মর্যাদার হন, তবে তিনি ক্রমানুসারে সাজান এভাবে—

একই শহরের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ইসনাদকে অন্য শহরের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া,

পরিবারের ধারাবাহিক ইসনাদকে অগ্রাধিকার দেওয়া,

ছোট (কম রাবি বিশিষ্ট) সনদকে বড় (বেশি রাবি বিশিষ্ট) সনদের উপর অগ্রাধিকার দেওয়া।

প্রথম শ্রেণির ইসনাদগুলো সংগ্রহ শেষ করার পর মুসলিম দ্বিতীয় শ্রেণির ইসনাদগুলো আনেন, যা তিনি সহায়ক দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ধরনের সহায়ক দলিল বা মুতাবা’আত দুই প্রকার:

সম্পূর্ণ মুতাবা’আহ (مُتابعة تامة): শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইসনাদে সহায়ক থাকে।

আংশিক মুতাবা’আহ (مُتابعة قاصرة): ইসনাদের আংশিক অংশে সহায়তা থাকে।

মুসলিম প্রথমে সম্পূর্ণ মুতাবা’আহ, তারপর আংশিক মুতাবা’আহ উল্লেখ করেন।

আরেকটি বিশেষ দিক হলো, মুসলিম অত্যন্ত সতর্কভাবে প্রতিটি হাদিস সঠিক শব্দে বর্ণনা করেছেন এবং বিভিন্ন রেওয়ায়েতের শব্দভিন্নতাগুলোও সযত্নে ইঙ্গিত করেছেন।

সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহ

সহীহ মুসলিম-এর উপর একাধিক ব্যাখ্যাগ্রন্থ (শরহ) রচিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো কাজি ইয়াদ এবং ইমাম নববীর রচিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ। তবে এই ব্যাখ্যাগুলো মূলত মাতন (হাদিসের বক্তব্য/টেক্সট) নিয়ে অধিক আলোচনা করেছে, ইসনাদ (সনদ/বর্ণনাশৃঙ্খল) নিয়ে নয়। এর ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাঁরা মুসলিমের হাদিস নির্বাচনের পদ্ধতি এবং তাঁর কারিগরি সমালোচনা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

ফলত, মুসলিমের সংকলন নিয়ে যে সমালোচনা করা হয়েছে—তিনি কোন হাদিস অন্তর্ভুক্ত করেছেন আর কোনটি বাদ দিয়েছেন—এসব বিষয়ে মুসলিমের অবস্থান রক্ষার মতো যথাযথ প্রতিরক্ষা তাঁদের ব্যাখ্যাগুলোতে পাওয়া যায় না।

আবার, এই দুই ব্যাখ্যাকার মুসলিমের মূল গ্রন্থে অধ্যায় বিভাজন এবং অধ্যায় শিরোনাম সংযোজন করেছেন—যা নিজে মুসলিম করেননি। এই কাজ করতে গিয়ে তাঁরা দুটি ব্যাপার ঘটিয়েছেন:

হাদিস বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে ফকিহদের চিন্তাধারাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

এবং, মুসলিম যেসব রেওয়ায়েতকে অন্যগুলোর চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তাঁদের এই অধ্যায়বিন্যাসের ফলে সেই অগ্রাধিকার পাল্টে গেছে।

অতএব, ইমাম মুসলিমের পদ্ধতি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। নচেৎ আমরা তাঁর এই মহান কাজের মহিমা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হবো।

————–

ক্যাটাগরি : হাদিস, শিক্ষা, উপদেশ।
—
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/6957

প্রদর্শনের জন্য মস্তিষ্ক
আধ্যাত্মিকতাচরিত্র ও নৈতিকতা

প্রদর্শনের জন্য মস্তিষ্ক

শোনা যায়, এক শহরে এমন এক আলেম বাস করতেন, যার জ্ঞানের খ্যাতি তার প্রকৃত জ্ঞানের চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল। তাঁর বাড়ির দরজায় একটি ফলক…

আরও পড়ুন →
হাদিস “واضربوه عليها ابن عشر” এর তাহকিক
নামাজপরিবার

হাদিস “واضربوه عليها ابن عشر” এর তাহকিক

এই বিষয়ে দুটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে: || প্রথম হাদিস: আবু দাউদ তাঁর সালাত অধ্যায়ের "কখন বালককে সালাতের আদেশ দিতে হবে" এই হাদিসটি তিরমিজিও বর্ণনা…

আরও পড়ুন →
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নামাজের বর্ণনা
নামাজফিকহ এআই-অনূদিত

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নামাজের বর্ণনা

তারা বলল: আমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামাযের বর্ণনা এমনভাবে দিন, যেন তা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়, কোনো জটিলতা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না…

আরও পড়ুন →