স্মরণ : ‘অজ্ঞ’ বলায়, রাগান্বিত হয়ো না

আধ্যাত্মিকতাচরিত্র ও নৈতিকতা
Reminder: Do not be angered if you are called ignorant

بسم الله الرحمن الرحيم
যদি কেউ তোমাকে অজ্ঞ বলে, তাতে রাগ করো না। মানুষ কি কখনো সেই উপাধিকে ঘৃণা করে, যেটার সে সত্যিই যোগ্য? বরং সত্য তো এই, নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করাই জ্ঞানের দ্বার উন্মোচনের প্রথম চাবি এবং প্রজ্ঞার পথে প্রবেশের সবচেয়ে সত্য পথ।

তুমি কি দেখো না, তুমি তোমার স্রষ্টা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত নও, সৃষ্টিজগত সম্পর্কেও অজ্ঞ; এমনকি সেই আত্মা সম্পর্কেও অজানা, যা তোমার বুকের ভেতর বাস করে। তুমি কি তোমার কামনা-বাসনার উৎস জানো? হঠাৎ যে চিন্তাগুলো তোমার মন ও মস্তিষ্কে ভেসে ওঠে, তাদের উৎস কোথায়, তা কি তুমি জানো? আর সেই গোপন কারণগুলোর কথা, যেগুলো তোমার অন্তরে নানা আকাঙ্ক্ষা ও ঝোঁক সৃষ্টি করে, সেগুলোর খবর কি তোমার কাছে আছে?

তুমি তোমার নিজের অনুভূতি ও আবেগের সঙ্গেও পুরোপুরি পরিচিত নও; ভালোবাসা ও ঘৃণার রহস্যের সঙ্গেও তোমার পরিচয় খুবই সীমিত। তুমি কাউকে ভালোবাসো, অথচ জানো না কেন ভালোবাসো। আবার কাউকে অপছন্দ করো, কিন্তু বুঝতে পারো না, কখন, কীভাবে তোমার হৃদয়ে এই বিরাগ জন্ম নিল। অনেক সময় এমন হয়, কোনো একটি মুখ দেখামাত্র তোমার হৃদয় অকারণে, কোনো যুক্তি বা প্রমাণ ছাড়াই তার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আবার কখনো এমনও হয়, কারো সঙ্গে দেখা হতেই তার নিছক উপস্থিতিই তোমার কাছে ভারী ও অসহ্য মনে হয়, অথচ তার পেছনে দৃশ্যমান কোনো কারণ থাকে না। যেন তোমার অন্তরের গভীরে কোনো গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে, যার চাবিকাঠি তোমার হাতে তুলে দেওয়া হয়নি।

তুমি মনে করো, তুমি পথ চেনো। অথচ সেই পথ নিজেই আসলে অনুমান ও ধারণার এক জটিল গোলকধাঁধা। তুমি দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে তাতে এগিয়ে যাও; কিন্তু যখন কখনো ফিরে তাকাও, তখন বুঝতে পারো, তুমি তো আসলে ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে পথ চলছিলে, যেখানে তোমার ধারণাই তোমাকে বেশি পথ দেখিয়েছে, তোমার নিশ্চিত জ্ঞান নয়। কত কথাকেই তুমি অকাট্য সত্য বলে মেনে নিয়েছিলে, অথচ সময়ের প্রবাহ এসে একে একে উন্মোচন করেছে, সেগুলো ছিল কেবল কল্পনার প্রতারণাময় ছায়া।

অজ্ঞতার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, মানুষ অনেক সময় নিজের অজ্ঞতাকেই টের পায় না। হঠাৎ কোনো এক মুহূর্তে সন্দেহ এসে হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে, আর মনে এমন সব প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে, যা আগে কখনো ভাবনাতেও আসেনি। তখন মানুষ থমকে দাঁড়ায়, বিস্ময়ে, অনিশ্চয়তায়। যেন সে প্রথমবারের মতো নিজেকেই দেখছে। তখন সে নিজেকে প্রশ্ন করে: আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? আমি তাকে কেন ভালোবাসি, আর তাকে কেন ঘৃণা করি? এই আত্মার রহস্য কী, যে কখনো সন্তুষ্টির সাগরে ডুবে যায়, কখনো ক্রোধে উথলে ওঠে; কখনো শান্তি পায়, আবার কখনো অস্থিরতায় কাঁপতে থাকে?

অতএব, তুমি যদি অজ্ঞ হও, তাতে লজ্জার কিছু নেই, যদি সেই অজ্ঞতাই তোমাকে জ্ঞান অনুসন্ধানের পথে ঠেলে দেয়। নিজের অপূর্ণতা স্বীকার করাও অপমান নয়, যদি সেটিই পরিপূর্ণতার দরজা খুলে দেয়। প্রকৃত লজ্জা তো সেখানে, যেখানে মানুষ অজ্ঞ হয়েও দাবি করে যে সে সব জানে; নিজের অন্তরের অন্ধকারে বাস করেও মনে করে যে সে আলোর পথে চলছে।

তাই যদি কেউ তোমাকে বলে “তুমি অজ্ঞ”, তবে তাতে রাগ করো না। বরং মৃদু হেসে দাও, সে হাসি হবে সেই মানুষের হাসি, যে নিজের সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারপর শান্তভাবে বলো: হ্যাঁ, আমি অজ্ঞ… কিন্তু আমি জ্ঞানের একজন অনুসন্ধানী। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আমি তার সন্ধানে আছি, হয়তো কোনো একদিন তার আলোর কিছুটা আমাকেও ছুঁয়ে যাবে।

————-

ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, শিক্ষা, ইসলামি চিন্তাধারা

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8622

মুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্য দিকনির্দেশনা
★ বিশেষ
আধ্যাত্মিকতাচরিত্র ও নৈতিকতা

মুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্য দিকনির্দেশনা

সম্প্রতি একজন একাডেমিক আমাকে অনুরোধ করেছিলেন সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাসরত মুসলিমদের পরিস্থিতি সম্পর্কে চিন্তা করতে, যারা প্রাতিষ্ঠানিক অবিচার, প্রান্তিকীকরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে জীবন ও সম্পত্তির…

আরও পড়ুন →
একটি অস্থির যুগে পথভ্রষ্ট আত্মা
আধ্যাত্মিকতাচরিত্র ও নৈতিকতা এআই-অনূদিত

একটি অস্থির যুগে পথভ্রষ্ট আত্মা

এই যুগে মানুষ এমন সব শব্দ শুনছে যা তার পূর্বপুরুষেরা দীর্ঘ শতাব্দী ধরে শোনেনি; লোহার শব্দ যখন তা নড়ে, যন্ত্রের শব্দ যখন তা কাজ…

আরও পড়ুন →
আমার কাছে এমন একজন মানুষকে নিয়ে আসো যে
আধ্যাত্মিকতাআরবি ও ভাষা এআই-অনূদিত

আমার কাছে এমন একজন মানুষকে নিয়ে আসো যে

খাজা নাসির উদ্দিনের কাহিনীগুলো সত্যিই অদ্ভুত। বাহ্যিকভাবে এগুলো পড়ে মানুষ হাসে, কিন্তু সামান্য সময়ের জন্য হাসি থামিয়ে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে এই হাসি…

আরও পড়ুন →