প্রশ্ন:
শ্রদ্ধেয় ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী সাহেব! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আমরা আপনার লেখালেখি অত্যন্ত নিয়মিত ও গভীর আগ্রহের সাথে পাঠ করি, এবং সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যদের কাছে তা পৌঁছে দিই ও বিভিন্ন জায়গায় শেয়ার করি। আলহামদুলিল্লাহ, আপনার লেখা থেকে আমরা প্রভূত উপকৃত হচ্ছি।
এই মুহূর্তে আমাদের মনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যা আমাদের বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। কিছু মানুষ সুন্নাহ ও হাদিসকে অস্বীকার করে বলে থাকে যে আমাদের জন্য কেবল কুরআনই যথেষ্ট, হাদিস ও সুন্নাহর কোনো প্রয়োজন নেই। এই ফিতনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কিছু তরুণ এর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।
আমরা আপনার কাছ থেকে জানতে চাই—মুসলিমদেরকে এই ফিতনা থেকে কীভাবে রক্ষা করা যায়? এবং সুন্নাহ ও হাদিসের প্রামাণিকতা (হুজ্যিয়্যাত) ও দ্বীনের মধ্যে এদের স্থানকে সাধারণ মুসলমানদের সামনে, বিশেষ করে তরুণদের সামনে, কীভাবে কার্যকর ও জোরালো দলিলের ভিত্তিতে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা যায়? অনুগ্রহ করে এ বিষয়ে আমাদের দিকনির্দেশনা প্রদান করুন।
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আজকের মুসলিম সমাজের যেসব চিন্তাগত বিষয়ে গভীর ও সুবিবেচিত দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন, এই প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে সেগুলোর অন্যতম। সুন্নাহ ও হাদিস (সুন্নাহ ও হাদিসের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সংযোগের বিষয়ে আমার একাধিক প্রবন্ধ রয়েছে, বিস্তারিত জানার জন্য সেগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে) সম্পর্কে যে সংশয়-সন্দেহ তৈরি হয়, নিছক আবেগের বশে তা প্রত্যাখ্যান করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রথমে এটি বোঝা প্রয়োজন যে হাদিস ও সুন্নাহ অস্বীকার করার বা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পেছনের কারণগুলো কী, সেগুলোর মধ্যে কোনটি জ্ঞানগত আপত্তি আর কোনটি নিছক চিন্তাগত বিভ্রান্তি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে অন্তত দুটি মৌলিক কারণ সামনে আসে।
প্রথম কারণ: কুরআনই যথেষ্ট এবং সুন্নাহ ও হাদিসের কোনো প্রয়োজন নেই—এমন ধারণা পোষণ করা
কোনো ব্যক্তির অবস্থান যদি এমন হয় যে কুরআন মাজীদই যথেষ্ট এবং দ্বীন অনুধাবন ও পালনের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ও হাদিসের কোনো প্রয়োজন নেই, তবে এই অবস্থান খোদ কুরআনে বর্ণিত নবুওয়াত ও রিসালাতের মৌলিক ধারণার সাথেই সংগতিপূর্ণ থাকে না।
কারণ কুরআন মাজীদ রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নিছক অহী পৌঁছে দেওয়ার কোনো মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং তাঁকে রাসূল, শিক্ষক, ব্যাখ্যাদাতা, সর্বোত্তম আদর্শ (উসওয়ায়ে হাসানাহ) এবং আনুগত্যযোগ্য পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কুরআন বারবার আল্লাহর আনুগত্যের সাথে রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে:
أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ
«তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো» (সূরা আন-নিসা, ৪:৫৯)। অন্য স্থানে ইরশাদ হয়েছে:
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ
«যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল» (সূরা আন-নিসা, ৪:৮০)। এবং মুমিনদের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সিদ্ধান্তকে সর্বান্তঃকরণে মেনে নেওয়াকে ঈমানের অপরিহার্য শর্ত সাব্যস্ত করা হয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দেয়: কুরআন যদি নিজেই যথেষ্ট হয় এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাস্তব শিক্ষার কোনো প্রয়োজন না থাকে, তবে কুরআনের বিধানগুলোকে বাস্তবে কীভাবে রূপ দেওয়া সম্ভব?
কুরআন নামাজের নির্দেশ দেয়, কিন্তু নামাজের বাস্তব রূপ, ওয়াক্তের বিবরণ, রাকাতের সংখ্যা এবং বহু ব্যবহারিক বিধান আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ থেকেই জানতে পারি। কুরআন জাকাত দেওয়ার নির্দেশ দেয়, কিন্তু জাকাতের নিসাব, পরিমাণ এবং বণ্টনসংক্রান্ত বিস্তারিত কার্যপদ্ধতি সুন্নাহ দ্বারাই স্পষ্ট হয়। হজের নির্দেশ কুরআনে রয়েছে, কিন্তু হজের বাস্তব পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণ ছাড়া নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। একইভাবে রোজা, বিবাহ, পারস্পরিক লেনদেন, সামাজিক আচরণ, আখলাক এবং অসংখ্য দ্বীনী বিধানের বাস্তব কাঠামো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পুণ্যময় আদর্শ থেকেই প্রতিভাত হয়।
তাই এ কথা বলা যে “আমরা কুরআন মানব কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর কোনো প্রয়োজন নেই”—প্রকৃতপক্ষে একটি অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধ তৈরি করে। কুরআন নিজেই যে রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ দিচ্ছে, সেই রাসূলের ব্যাখ্যা, শিক্ষা এবং বাস্তব নমুনাকে দ্বীন থেকে বাদ দিয়ে কুরআনের পূর্ণ অনুসরণের দাবি কীভাবে করা যেতে পারে?
রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরআনের বিপরীতে কোনো সমান্তরাল বা ভিন্ন ধর্ম নিয়ে আসেননি; তিনি ছিলেন কুরআনের শিক্ষক এবং তার জীবন্ত তাফসীর ও বাস্তব রূপ। কুরআন হলো একটি হিদায়াতনামা, আর রাসূলুল্লাহ ﷺ হলেন সেই হিদায়াতের মূর্ত প্রতীক। এ কারণেই কুরআন মাজীদ:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
«নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ» (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১)—বলে মুমিনদের জন্য তাঁকে অনুকরণের মাপকাঠি বানিয়েছে।
কুরআন ও সুন্নাহকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করানো কোনো সঠিক জ্ঞানগত পদ্ধতি নয়। সঠিক প্রকাশভঙ্গি হলো—কুরআন হলো অহীর মূল উৎস, আর সুন্নাহ হলো সেই অহীর নববী ব্যাখ্যা, প্রয়োগ এবং বাস্তব রূপায়ন। এই দুটির পারস্পরিক সম্পর্ক না বুঝলে ইসলামি শরিয়তের সামগ্রিক কাঠামোটি বোঝাই অসম্ভব।
দ্বিতীয় কারণ: হাদিসের মধ্যে দুর্বল, জাল ও পরস্পরবিরোধী বর্ণনার উপস্থিতি
দ্বিতীয় কারণটি তুলনামূলকভাবে অধিক বোধগম্য। একজন মানুষ যখন হাদিসের কিতাবগুলো অধ্যয়ন করে, তখন সে দেখতে পায় যে সমস্ত বর্ণনা একই মানের নয়। কোনোটি সহীহ, কোনোটি হাসান, কোনোটি যঈফ; কিছু বর্ণনার ওপর মুহাদ্দিসগণ মুনকার, শায কিংবা মাওযূ‘ (জাল)-এর হুকুম লাগিয়েছেন। এমন কিছু বর্ণনাও রয়েছে যেগুলোর বিষয়ে মুহাদ্দিসদের পরস্পরের মাঝে মতপার্থক্য বিদ্যমান।
এই পরিস্থিতি দেখে কারো মনে এমন প্রশ্ন জাগতে পারে যে—হাদিসের ভেতর যখন সহীহ ও দুর্বল উভয় প্রকার বর্ণনাই রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে এদের মাঝে পার্থক্য করা সম্ভব নয়, তখন হাদিসের গোটা ভাণ্ডারকেই অনির্ভরযোগ্য মনে করে ছেড়ে দেওয়াই কি সহজতর ও নিরাপদ নয়?
বাহ্যত এটি এক ধরনের সতর্কতা মনে হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানগত বিচারে এই যুক্তিবিন্যাস একেবারেই সঠিক নয়।
কারণ কোনো জ্ঞানভাণ্ডারে জাল, দুর্বল বা অনির্ভরযোগ্য তথ্য বা উপকরণের উপস্থিতি সেই পুরো ভাণ্ডারকেই বর্জন করার দলিল হতে পারে না; বরং এর মাধ্যমে প্রমাণের সত্যতা নিরূপণের প্রয়োজনীয়তাই সাব্যস্ত হয়। ঠিক এখানেই হাদিসশাস্ত্রের (ইলমুল হাদিস) অসাধারণ গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশিত হয়।
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সভ্যতাই নিজেদের অতীত, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীকে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করে। ঐতিহাসিকগণ সবসময় অনুসন্ধান করেন—কোন বর্ণনাটি নির্ভরযোগ্য, কোনটি দুর্বল, কোন বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি কেমন ছিল, কার বক্তব্য স্থান ও কালের বিচারে সম্ভব আর কারটা নয়। কোনো ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায় কিছু বিবরণ জাল বা অপ্রামাণিক প্রমাণিত হলে কোনো বিবেকবান ইতিহাসবিদ পুরো ইতিহাসকেই অস্বীকার করে বসেন না; বরং তিনি পর্যালোচনার মূলনীতি তৈরি করেন এবং নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য উপাদানের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য নিরূপণ করেন।
ইসলামি জ্ঞানগত ঐতিহ্যে হাদিসের ক্ষেত্রে ঠিক এই কাজটিই করা হয়েছিল অভাবনীয় বিশালতায়, অতীব সূক্ষ্মতায় এবং নিরবচ্ছিন্ন বৈজ্ঞানিক সতর্কতার সাথে।
হাদিসশাস্ত্রের অভূতপূর্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য
হাদিসের সমালোচকগণ কেবল বর্ণনার মূল পাঠ (মতন) দেখেই ক্ষান্ত হননি; বরং তাঁরা বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত অবস্থা, তাঁদের সততা, তাকওয়া, স্মৃতিশক্তি, পরস্পরের সাক্ষাতের সম্ভাবনা, শ্রবণকাল, হাদিসের বিভিন্ন সনদ বা সূত্র, শব্দগত পার্থক্য, সনদের অবিচ্ছিন্নতা বা বিচ্ছিন্নতা, মতনের মধ্যকার জটিলতা ও লুকায়িত ত্রুটি (ইলাল)—সবকিছুকে গবেষণার আওতায় নিয়ে এসেছেন।
এমনকি বর্ণনাকারীদের পরিচয় ও মূল্যায়নের জন্য স্বতন্ত্র একটি শাস্ত্র ‘ইলমুর রিজাল’ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার বর্ণনাকারীর জীবনী, তাঁদের নির্ভরযোগ্যতা (সিকাহ), নির্ভুলতা (যাবত), শিক্ষক, ছাত্র এবং হাদিসশাস্ত্রে তাঁদের অবস্থান নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করা হয়েছে। ‘জারহ ওয়া তা‘দীল’-এর গোটা বিজ্ঞান গড়ে উঠেছে কেবলমাত্র এই উদ্দেশ্যে যাতে বর্ণনাকারীদের নৈতিক ও জ্ঞানগত মান যাচাই করা যায়।
মানব ইতিহাসের পাতায় এটি নিঃসন্দেহে এক অতুলনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক কীর্তি।
একজন মুহাদ্দিস কেবল এই বলে কোনো হাদিস গ্রহণ করতেন না যে “কথাটি আমার ভালো লেগেছে”; বরং তিনি খতিয়ে দেখতেন—এই বর্ণনাটি কার মাধ্যমে এসেছে, তাঁর পূর্বে বর্ণনাকারী কে ছিলেন, তাঁদের উভয়ের মাঝে সাক্ষাৎ হওয়া সম্ভব ছিল কি না, বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত ছিলেন কি না, তাঁর স্মৃতিশক্তি কেমন ছিল, অন্যান্য নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীগণ একই ঘটনা কীভাবে বর্ণনা করেছেন, বিভিন্ন সনদের মাঝে কী পার্থক্য রয়েছে এবং এর বিপরীতে অধিকতর শক্তিশালী কোনো সনদ বা বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে কি না।
এই সামগ্রিক অনুসন্ধানের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল—রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো কথা যেন যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ করা না হয়।
এখানে একটি অত্যন্ত গভীর জ্ঞানগত সূক্ষ্মতা অনুধাবন করা আবশ্যক:
হাদিসসমূহের মাঝে সহীহ ও যঈফের এই পার্থক্য হাদিসশাস্ত্রের দুর্বলতার প্রমাণ নয়, বরং এর পরম শক্তি ও সততার প্রমাণ।
মুহাদ্দিসগণ যদি যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রতিটি বর্ণনাকে একবাক্যে গ্রহণ করে নিতেন, তবে আপত্তি তোলা সংগত হতো। কিন্তু তাঁরা তা করেননি। তাঁরা গ্রহণ ও বর্জনের সুস্পষ্ট মূলনীতি তৈরি করেছেন, বর্ণনাকারীদের তীব্র সমালোচনা করেছেন, সনদসমূহের তুলনা করেছেন, পাঠ্যের বৈসাদৃশ্য মিলিয়ে দেখেছেন, এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিজের শিক্ষক বা সমসাময়িক মুহাদ্দিসের রায়ের সাথেও দ্বিমত পোষণ করেছেন।
এই জ্ঞানগত ঐতিহ্য থেকেই সহীহ, হাসান, যঈফ, মুরসাল, মুনকাতি‘, মু‘আল্লাক, শায, মুনকার, মু‘আল্লাল এবং মাওযূ‘র মতো সুনির্দিষ্ট পরিভাষাগুলোর জন্ম হয়েছে। এই পরিভাষাগুলো এই কথারই জীবন্ত সাক্ষ্য যে মুহাদ্দিসদের কাছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিকে কোনো কথা বা কাজের সম্বন্ধ করা ছিল এক গুরুদায়িত্বপূর্ণ আমানত, যাকে নিছক অন্ধভক্তি বা আবেগের বশে গ্রহণ করা যায় না।
“কিছু হাদিস ভুল, তাই সমস্ত হাদিস বাদ দাও” — এই যুক্তি কেন ভ্রান্ত?
এই যুক্তির মৌলিক ভ্রান্তি হলো—একটি সংকলনের কিছু অংশ অপ্রামাণিক হওয়ার কারণে গোটা সংকলনকেই অনির্ভরযোগ্য ঘোষণা করে দেওয়া।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো লাইব্রেরিতে যদি দশ হাজার বই থাকে এবং তার মধ্যে একশত বই জাল বা নকল প্রমাণিত হয়, তবে জ্ঞানগত নীতি কি এটি হবে যে বাকি নয় হাজার নয়শত বইকেও কোনো যাচাই ছাড়াই ফেলে দিতে হবে? না। সঠিক পদ্ধতি হলো প্রতিটি বইয়ের সত্যতা ও মান আলাদাভাবে যাচাই করা।
হাদিসের ক্ষেত্রেও সঠিক পথ “সব মেনে নাও” বা “সব বর্জন করো” নয়; বরং সঠিক পথ হলো—“গবেষণা ও যাচাই করো; যা সহীহ তাকে সহীহ হিসেবে গ্রহণ করো, যা দুর্বল তাকে দুর্বল হিসেবে জানো, আর যা জাল তাকে বর্জন করো।”
বস্তুত হাদিস অস্বীকারকারীদের এমন কোনো নতুন পরিশ্রমে যাওয়ার প্রয়োজন নেই যা মুসলিম মনীষীগণ বহু শতাব্দী আগেই অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সম্পন্ন করে গেছেন। গোটা হাদিসভাণ্ডারকে নতুন করে সন্দেহ করার আগে তাদের দেখা উচিত যে এই ভাণ্ডারের সুরক্ষা ও মূল্যায়নের জন্য মুসলিম আলিমগণ কোন কোন মূলনীতি তৈরি করেছিলেন এবং সেই মূলনীতিগুলোর প্রয়োগে কী ফলাফল পাওয়া গেছে।
হাদিসের ইতিহাস নিজেই এর একটি জবাব
হাদিসের ইতিহাস এই দৃষ্টিকোণ থেকেও বিস্ময়কর যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী ও কর্মসমূহ কেবল কোনো একটি একক প্রজন্মের মাধ্যমে বাহিত হয়ে থেমে যায়নি; বরং তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পঠন, পাঠন, লিখন, শ্রবণ, পুনরাবৃত্তি এবং পর্যালোচনার মাধ্যমে অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পুণ্যময় জীবনকে সংরক্ষণ করেছেন, তাবেয়ীগণ তা পরবর্তী স্তরে পৌঁছে দিয়েছেন, তাবে-তাবেয়ী এবং পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ তা সংগ্রহ, বিন্যাস ও নিখুঁতভাবে যাচাই করেছেন।
এ কথাও স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে হাদিসের গোটা ভাণ্ডার একই সমমানের নয়। হাদিসের বিভিন্ন কিতাবের মান ও নির্ভরযোগ্যতা এক নয়, এবং প্রতিটি কিতাবে বিদ্যমান প্রতিটি বর্ণনার মর্যাদাও সমান নয়। তাই “হাদিসের কিতাব” এবং “সহীহ হাদিস”-কে সমার্থক মনে করাও জ্ঞানগতভাবে সঠিক নয়।
একইভাবে কোথাও একটি দুর্বল বর্ণনা দেখে গোটা সুন্নাহকে প্রশ্নবিদ্ধ করাও সংগত নয়। মূল প্রশ্ন হলো—সেই নির্দিষ্ট বর্ণনাটির মর্যাদা কী, মুহাদ্দিসগণ তার ব্যাপারে কী রায় দিয়েছেন, তার সপক্ষে অন্য কোনো প্রমাণ আছে কি না এবং হাদিসসংগ্রহে তার অবস্থান কোথায়?
আসল প্রয়োজন: হাদিসের প্রতিরক্ষা নয়, হাদিস অনুধাবনের প্রশিক্ষণ
বর্তমান যুগে এই ফিতনার মোকাবিলা নিছক আবেগী স্লোগান দিয়ে করা সম্ভব নয়। কোনো তরুণকে যদি বলা হয় “হাদিস নিয়ে প্রশ্ন তোলাই পথভ্রষ্টতা,” তবে তার মনের ভেতরের বুদ্ধিবৃত্তিক সংশয়টি আরও গভীর হতে পারে। প্রয়োজন হলো তাকে হাদিসের প্রামাণিকতা, সংকলনের ইতিহাস, বর্ণনার মূলনীতি, ইলমুর রিজাল, জারহ ওয়া তা‘দীল এবং হাদিস সমালোচনার পদ্ধতির এক সহজবোধ্য অথচ প্রামাণ্য পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
একইভাবে এটিও পরিষ্কার করা দরকার যে হাদিসের প্রামাণিকতার অর্থ এই নয় যে কোনো বইয়ে “হাদিস” নামে পাওয়া যেকোনো বাক্যকেই নিশ্চিত সত্য বলে মেনে নিতে হবে। বরং আহলে ইলমগণ নিজেরাও এর জন্য অত্যন্ত কঠিন শর্তাবলী ও মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
অতএব দুটি চরমপন্থা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি:
এক চরমপন্থা হলো—যেকোনো কথিত বর্ণনাকেই কোনো যাচাই ছাড়াই সহীহ হাদিস মনে করা;
আর দ্বিতীয় চরমপন্থা হলো—যেহেতু কিছু বর্ণনা দুর্বল বা জাল, তাই হাদিসের গোটা ভাণ্ডারকেই প্রত্যাখ্যান করে বসা।
এই দুটি অবস্থানই জ্ঞানগতভাবে ভ্রান্ত। সঠিক পথ হলো গবেষণা, পর্যালোচনা, নিয়মনীতি এবং শাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হওয়ার পথ।
উপসংহার
সুন্নাহ ও হাদিস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা রোধে দুটি বিষয় মৌলিকভাবে হৃদয়াঙ্গম করা আবশ্যক:
প্রথমত, কেউ যদি মনে করে যে কুরআনের উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর কোনো প্রয়োজন নেই, তবে তাকে কুরআনের নিজস্ব রিসালাতের ধারণা, রাসূলের আনুগত্যের আদেশ এবং মুমিনদের জীবনে রাসূলের অবস্থানের সাথে এই দাবির সমন্বয় সাধন করতে হবে। কুরআনই রাসূলের আনুগত্যকে অপরিহার্য করেছে; ফলে রাসূলের বাস্তব শিক্ষাকে দ্বীন থেকে বাদ দেওয়া কুরআনের প্রতি আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং কুরআনের একটি মৌলিক দাবিকে অস্বীকার করার শামিল।
দ্বিতীয়ত, কারো আপত্তি যদি হাদিসের মধ্যে দুর্বল, জাল, শায বা মুনকার বর্ণনার উপস্থিতির কারণে হয়, তবে তার সমাধান গোটা ভাণ্ডারকে প্রত্যাখ্যান করা নয়; বরং হাদিসশাস্ত্রের বৈজ্ঞানিক মূলনীতিগুলোকে উপলব্ধি করা। মুহাদ্দিসগণ নিজেরাও সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য নিরূপণের জন্যই এই মহান শাস্ত্র নির্মাণ করেছেন। সেই শাস্ত্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে গোটা হাদিসভাণ্ডারকে ফেলে দেওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক ইনসাফের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
আজ মুসলিমদের প্রয়োজন হাদিসের নিছক অন্ধ পক্ষাবলম্বন নয়, বরং হাদিস অনুধাবনের জ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ। তাদের বোঝাতে হবে যে সুন্নাহ নিছক কোনো ঐতিহাসিক বিবরণ নয়, বরং তা হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সেই জীবন্ত হিদায়াত যার মাধ্যমে কুরআনের আলো মানুষের বাস্তব জীবনে রূপ নিয়েছিল; আর হাদিস নিছক কোনো তথ্যের স্তূপ নয়, বরং এটি এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার যার সুরক্ষায়, পর্যালোচনায় ও বিশ্লেষণে মুসলিম মনীষীগণ শতাব্দীর পর শতাব্দী অতুলনীয় নিষ্ঠা ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম ব্যয় করেছেন।
এই বিবেচনায় সুন্নাহ ও হাদিসের সাথে যুক্ত থাকা কেবল অতীতের সাথে সম্পর্কের নাম নয়; এটি প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষা ও জীবনাদর্শের আলোকে কুরআনকে যথাযথভাবে অনুধাবন করার নাম। আর হাদিসের ওপর বুদ্ধিবৃত্তিক আস্থার অর্থ অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং সেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও অনুসন্ধানের ওপর আস্থা যার মাধ্যমে উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিকে আরোপিত বাণীর প্রামাণিকতা যাচাইয়ের এক নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।
আধুনিক যুগে হাদিস বর্জনের ফিতনার সবচেয়ে কার্যকর প্রতিকার হলো—কুরআন ও সুন্নাহর পারস্পরিক সম্পর্ককে খোদ কুরআনের আলোকেই স্পষ্ট করা, হাদিসশাস্ত্রের অনুপম সমালোচনামূলক ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা, এবং যেকোনো আপত্তির জবাব আবেগ দিয়ে নয়, বরং দলিল, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার সাথে উপস্থাপন করা।
———
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ AI
🔗 https://t.me/DrAkramNadwi/10392