আল্লাহর প্রেমের একটি উজ্জ্বল মীনার
———-
আমি এই মুহূর্তে একটি বিমানে আছি, একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য ইংল্যান্ড থেকে তুরস্ক যাচ্ছি। কিছু গবেষণার কাজ করছিলাম, হঠাৎ মাওলানা মুহাম্মদ আহমদ প্রতাপগড়ী রহমতুল্লাহি আলাইহির স্মৃতি মনে এলো। মনে হলো যেন হৃদয়ের নীরব কোণে বছরের পর বছর জ্বলতে থাকা একটি প্রদীপ হঠাৎ করে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কিছু ব্যক্তিত্বকে মানুষ স্মরণ করে না, বরং তাদের স্মৃতি নিজেই মানুষের উপর ভর করে। মাওলানা মুহাম্মদ আহমদ প্রতাপগড়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি এমনই একজন নির্বাচিত হৃদয়বান ছিলেন, যাদের সান্নিধ্যের সুগন্ধ সময়ের স্রোতেও আত্মায় মিশে থাকে।
হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আহমদ বিন গোলাম মুহাম্মদ প্রতাপগড়ী রহমতুল্লাহি আলাইহির জন্ম ১৩১৭ হিজরিতে প্রতাপগড় জেলার একটি গ্রাম ফুলপুরে হয়। শুরু থেকেই ইবাদত, জিকির এবং আধ্যাত্মিক রুচি তার প্রকৃতির অংশ ছিল। তিনি হযরত শাহ বদর আলী রহমতুল্লাহি আলাইহির সাথে সংশোধনমূলক সম্পর্ক স্থাপন করেন, যিনি হযরত শাহ ফজলুর রহমান গঞ্জ মুরাদাবাদী রহমতুল্লাহি আলাইহির খলিফাদের মধ্যে ছিলেন এবং তার কাছ থেকে অনুমতি ও খিলাফত লাভ করেন। পরবর্তীতে হযরত ওয়ারিস হাসান হুসাইনি রহমতুল্লাহি আলাইহির, শায়খুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহমতুল্লাহি আলাইহির খলিফার তত্ত্বাবধানে ছিলেন এবং লখনৌর টিলা ওয়ালি মসজিদে কঠোর সাধনা ও রিয়াজতের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তার প্রকৃত মহিমা ছিল না সাধনায়, না বাহ্যিক শায়খত্বে, বরং সেই আল্লাহর সাথে সম্পর্কের মধ্যে ছিল যা তার পুরো জীবনকে আলো, প্রেম এবং আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ করে দিয়েছিল।
তিনি আল্লাহর প্রিয় বান্দা ছিলেন, এবং এমন আল্লাহর প্রিয় বান্দা যাদের দেখে আল্লাহর স্মরণ হতো। তার মজলিসে না ছিল কোনো ভান, না ছিল কোনো আড়ম্বর, না ছিল উচ্চকণ্ঠ বক্তৃতা; কিন্তু তার নীরবতাও হৃদয়কে উষ্ণ করত। তিনি বারবার শুধু দুটি বিষয়ে উপদেশ দিতেন: কুরআন শরীফের সাথে সম্পর্ক এবং নবীজির সুন্নতের অনুসরণ। তার দৃষ্টিতে ওলায়েতের রহস্য এই দুটি বিষয়ের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল।
নদওয়াতুল উলামায় ছাত্রজীবনে প্রথমবার তার কথা শুনি। হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহমতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা আবরারুল হক রহমতুল্লাহি আলাইহি, এবং ক্বারী সিদ্দিক আহমদ বান্দভী রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখ বড়রা তার নাম অসাধারণ ভক্তি সহকারে উচ্চারণ করতেন। তারপর একদিন নদওয়ার অতিথিশালায় তার দর্শন লাভের সৌভাগ্য হয়। সাধারণ পোশাক, অত্যন্ত সহজ আসন, মৃদু কথা, এবং মুখে এক অদ্ভুত আলো। বাহ্যিকভাবে কিছুই অসাধারণ ছিল না, কিন্তু হৃদয় সাক্ষ্য দিচ্ছিল যে এই ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্যের মধ্যে থেকে।
এরপর বহুবার এলাহাবাদে তার সেবায় উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়, যেখানে তিনি শেষ সময়ে অবস্থান করতেন। একবার এমন একটি সৌভাগ্যবান দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়েছিল যা আজও স্মরণ করলে হৃদয়ে এক ধরনের আবেগ জাগে। তখন তার সেবায় হযরত মাওলানা আলী মিয়া নদভী রহমতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা আবরারুল হক রহমতুল্লাহি আলাইহি, এবং ক্বারী সিদ্দিক আহমদ বান্দভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উপস্থিত ছিলেন। জ্ঞান ও ওলায়েত, প্রেম ও আন্তরিকতা, এবং আলোর এক অদ্ভুত সমাবেশ ছিল। তখন হৃদয় থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই শের বেরিয়ে এলো:
“হাসন যার রঙে হয় যেখানে হয়
হৃদয়বানদের জন্য জীবনধন হয়।”
মাওলানা রহমতুল্লাহি আলাইহির জীবন ছিল সম্পূর্ণরূপে জাহিদ ও নির্লিপ্ত। দুনিয়া তার পায়ের নিচে আসত কিন্তু তার হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারত না। সরলতা ছিল তার পরিচয়। পোশাকে সরলতা, বাসস্থানে সহজতা, স্বভাবে নম্রতা, এবং প্রকৃতিতে এক অদ্ভুত সন্তুষ্টি। বড় বড় আলেমরা তার সেবায় উপস্থিত হতেন কিন্তু তার স্বভাবে কোনো পরিবর্তন আসত না। তিনি দর্শকদের সাথে বসতেন, তাদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করতেন, তাদের অবস্থা শুনতেন, এবং যা কিছু আসত তা অন্যদের মধ্যে বিতরণ করতেন।
মাওলানার সবচেয়ে বিশিষ্ট গুণ ছিল তার প্রেম; এমন প্রেম যা শুধু তার নিজস্ব গোষ্ঠী বা মতবাদে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার কাছে মুসলমানরাও আসতেন, হিন্দুরাও, আলেমরাও, সাধারণরাও, এবং প্রতিটি ব্যক্তি তার স্নেহে সমান অংশ পেত। তার মজলিসে পৌঁছে মত ও পথের কৃত্রিম দেয়ালগুলো ভেঙে যেত। মানুষ শুধু আল্লাহর বান্দা হিসেবে দেখা যেত, এবং প্রত্যেকের শুধু তার রবকে খুশি করার চিন্তা থাকত। আজকের কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে এই হৃদয়ের প্রশস্ততার মূল্য আরও বেশি অনুভূত হয়।
আমার মনে আছে, যখনই আমরা তার সেবায় উপস্থিত হতাম, তিনি অত্যন্ত স্নেহের সাথে আলিঙ্গন করতেন। তার বক্ষের উষ্ণতা এবং হৃদয়ের স্নেহ অনুভূত হতো। তার আলিঙ্গনময় প্রেমে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক স্বাদ ছিল। তখন বারবার এই শের মনে পড়ত:
“ওয়া আসকানা আলা জমা জালালা
আলাজ্জা মিন আল-মাদামা লিল-নাদিম।”
মাওলানা রহমতুল্লাহি আলাইহির পুরো অস্তিত্ব প্রেমের আগুনে গঠিত মনে হতো। তার মধ্যে যে সোজ ছিল, তা তার কথোপকথন, তার নীরবতা, তার দোয়া, এবং তার কবিতায় সবকিছুতে প্রতিফলিত হতো। যখনই তার কথা আসে, ফয়জীর এই শের স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুখে আসে:
“দারদ খিজদ আজ দিল-ই ফয়জী
সোজিশে দার কিতাব মি বিনাম।”
বাস্তবতা হলো মাওলানার জীবন এবং কবিতা উভয়ই প্রেমের জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তরের প্রতীক ছিল। তার কবিতায় কোনো ভান ছিল না, বরং একজন সত্যিকারের আল্লাহপ্রেমীর ব্যথা ছিল। ছাত্রজীবনে যখন তার দিওয়ান অধ্যয়ন করলাম, তখন মনে হলো যেন আমার মধ্যে কোনো হারানো জিনিসের পুনরুদ্ধার হয়েছে। তার কবিতা প্রেম ও জ্ঞানের এক নতুন স্বাদ দিয়েছিল।
আমি তার একটি কবিতার আরবি অনুবাদ করেছিলাম যা “আল-রায়েদ” এ প্রকাশিত হয়েছিল। যখন মাওলানা দেখলেন, তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন এবং একটি প্রেমময় চিঠি লিখেছিলেন, যাতে দোয়া ও স্নেহ ছিল। দুঃখের বিষয়, সেই মূল্যবান চিঠি সময়ের ধুলায় হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার আধ্যাত্মিক উষ্ণতা আজও হৃদয়ে সংরক্ষিত আছে।
মাওলানা মুহাম্মদ আহমদ প্রতাপগড়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি সেই সৌভাগ্যবান মানুষদের মধ্যে ছিলেন যাদের জীবনও প্রেম ছিল এবং যাদের বার্তাও প্রেম ছিল। তিনি ধর্মকে বিরোধ ও বিভেদের কারণ বানাননি, বরং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক এবং বান্দাদের সাথে প্রেমের মাধ্যম বানিয়েছিলেন। তার মজলিসে ওয়াজের ভারীতা ছিল না, বরং নীরব সান্নিধ্যের সেই প্রভাব ছিল যার সম্পর্কে কেউ সত্য বলেছেন: “দার কার-ই ইশক নালা ও আহে জরুর নি।”
আজ যখন বিশ্ব ধর্মীয় গোঁড়ামি, আধ্যাত্মিক ভান, এবং মতবাদী কোলাহলে ভরা, মাওলানা রহমতুল্লাহি আলাইহির মতো ব্যক্তিত্ব আরও বেশি স্মরণ হয়। তিনি এই সত্যের জীবন্ত উদাহরণ ছিলেন যে ওলায়েতের আসল সারমর্ম হলো মানুষকে আল্লাহর সাথে যুক্ত করা এবং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি প্রেম করা।
যখনই তার নাম মনে আসে, হৃদয়ে এক নীরব আগুন জ্বলে ওঠে, এবং মনে হয় যেন আল্লাহর প্রেমের একটি প্রদীপ এখনও এই পৃথিবীর অন্ধকারে আলো দিচ্ছে:
আমার দেহে এমন কোনো অঙ্গ নেই, যেখানে তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসা নেই;
মনে হয় যেন আমার প্রতিটি অঙ্গই হৃদয় হয়ে সৃষ্টি হয়েছে।
———-
ক্যাটাগরি : সিরাহ, আখলাক, তাজকিয়াহ, ইসলামি চিন্তাধারা
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/9063