শিরোনাম: আওয়ারাগির আস্বাদ
—–
লেখক: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
২২/৬/২০২৬
কয়েক দিন আগে সাগরপাড়ের এক বিদেশপ্রবাসী ছাত্রের চিঠি পেলাম। চিঠি নয়, যেন সুহৃদতার পোশাকে মোড়া অস্থিরতার বাতায়ন। সে লিখেছে:
“হুজুর! গত দুই মাস ধরে সোশ্যাল মিডিয়ার হাটে-বাজারে কিছু লোক আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। কেউ তাচ্ছিল্য করছে, কেউ ঠাট্টা-বিদ্রূপ ছুড়ছে, কেউ তিরস্কারের জিভ লম্বা করছে, আর কেউ এমন সব গালির ‘পুষ্প’ বর্ষণ করছে যার সুগন্ধ বোধ হয় শুধু তারাই টের পায়।”
চিঠি পড়ে আমার মুখে হাসি ফুটল—সেই হাসি, যা পথিকের মুখে ফুটে ওঠে যখন কেউ তাকে ঝড় দিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে, অথচ সে নিজে পাহাড়ের অপর প্রান্তে নিশ্চিন্তে বসে আছেন।
আমি জবাব দিলাম: ভাই, তুমি যে দুনিয়ার খবর দিচ্ছ, আমার দৃষ্টিতে তার অস্তিত্বই নেই। লোকজন কী লেখে জানিই না। তাদের লেখা পড়ি না, আড্ডায় যাই না, বিতর্ক শুনি না। কোনো নিবিড় বন্ধু প্রেমের তাড়নায় কোনো উদ্ধৃতি পাঠিয়ে দিলেও আমি রাস্তার পোস্টার চোখে পড়ে উপেক্ষা করার মতন এড়িয়ে যাই। আর কারও এ ‘খিদমতে’ বাড়াবাড়ি উৎসাহ দেখা দিলে তার নম্বরকেই এমন নিস্তব্ধতার জিম্মায় দিই, যেখান থেকে আর কোনো শব্দ ফেরে না।
আমার অবস্থা সেই লোকটির মত, যে নিজের ঘরে দীপ জ্বেলে বই পড়ছে, আর বাইরে গলিতে কয়েকজন তার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে। সে স্লোগানের প্রতিধ্বনি যখন কানে পৌঁছায়ই না, তার শান্তি কি কিছুমাত্র বিঘ্নিত হতে পারে?
অনেকে অবাক হয়—আমার রাগ ওঠে না কেন? আমি বলি, রাগের জন্য আগে খবর নেয়া দরকার, খবরের জন্য পড়া দরকার, পড়ার জন্য আগ্রহ দরকার, আর এসব কিছুর দোরগোড়ায় আমি একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছি—‘পথ বন্ধ’।
একজন বললেন, “হুজুর! লোকজন তো আপনার বিরুদ্ধে কলম চালাচ্ছে।” আমি জবাব দিলাম, “চালাতে দিন। কলম যেমন সত্য লিখে পুরস্কার অর্জন করে, তেমনি মিথ্যা লিখতে লিখতে ক্লান্তও হয়ে পড়ে।”
তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন, “মানুষ কী বলে তা নিয়ে কি আপনি চিন্তিত নন?” বললাম, “যারা নিজেদের দিন অন্যের নামে কথা বলে কাটায়, তারা কথা বলুক বা চুপ থাকুক, তাদের বক্তব্যের দ্বারা তারা কখনো ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারেনি।”
সোশ্যাল মিডিয়া এক অদ্ভুত জগৎ—অনেকে নিজের চিন্তার চেয়ে অন্যের নামেই বাঁচে। তারা সেই পতঙ্গস্বরূপ, যারা আলোকস্তম্ভ হতে চায় না, বরং সারাটা জীবন প্রদীপ বেষ্টন করে কেবল প্রমাণ করে যে পাক খেতে তারা ওস্তাদ।
তবে এ বিষয়ে আমার আরেকটি দিকও আছে। যখন কেউ অপ্রস্তুত পরিবেশে আমার অনুপস্থিতিতে আমার মন্দ বলে, শরিয়তের পরিভাষায় সেটাই ‘গিবত’। আর গিবত বড় বিচিত্র—এ জগতে সম্ভবত একমাত্র ব্যবসা, যেখানে খাটুনি একজন করে, মুনাফা গিয়ে জমা হয় আরেকজনের নামে।
কখনও ভাবি, এ মানুষগুলো কত দানবান! নিজেদের সময় ব্যয় করে, শক্তি ক্ষয় করে, রাতের ঘুম বিসর্জন দেয়, আর শেষাবধি নীরবে আমলের একটি অংশ আমার নামে হস্তান্তর করে ফেলে। যেন কেউ নিজের পকেটের টাকা বের করে অপরের পকেটে রেখে ঘোষণাও করে—“দেখ, কী বীরত্ব!”
হ্যাঁ, মানুষ গুনাহে জড়াক, এ আক্ষেপ অবশ্যই থাকে—আমি কারও জন্য পাপ কামনা করি না। কিন্তু সে যদি আমার আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও সে পথেই অবিচল থাকে, তার সিদ্ধান্তের দায় তো আমার নয়। আর যখন ক্ষতিটা তারই ও ফায়দা আমার, আমি কিসের শোক করব?
আসল সংকট অন্যত্র। কলম ধরলে আমার চোখের সামনে না থাকে শত্রু, না ভক্ত। আমি কারও সন্তুষ্টির বেতনভোগী নই, কারও অসন্তোষের বন্দি নই। যা লিখি, এই নিয়তে লিখি, হয়তো কোনো মুমিনের অন্তরে গিঁট খোলার সহায় হবে, কোনো ছাত্রের মনে আলো জ্বলে উঠবে, কোনো অনুসন্ধিৎসুকে পথের দিশা মিলবে।
লোকের ধারণা, লেখকের গন্তব্য প্রশংসা। প্রকৃত লেখকের গন্তব্য প্রায়শই তার যাত্রার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।
বলা হয়, মজনুর কাহিনি লায়লা থেকে শুরু হলেও ক্রমে লায়লা নিজেই এক উপমা হয়ে যায়; আসল ছিল প্রকৃত সত্তা ছিল সেই অস্থিরতা, যা তাকে নজদের মরুভূমির ধুলো ঝাড়তে বাধ্য করেছিল। গন্তব্য অনেক আগেই পেছনে ফেলে আসা হয়েছিল; যাত্রাপথটাই হয়ে উঠেছিল এক পরমানন্দ।
মজনুর কাছে মরুভূমি কেবল বালুর বিস্তার ছিল না; ছিল তার শৌখিন হৃদয়ের প্রতিবিম্ব। প্রতিটি টিলা এক প্রশ্ন, প্রতিটি ঝড়ো হাওয়া এক বার্তা, প্রতিটি মিরাজ নূতন এক তাড়া। মানুষ তাকে পাগল বলত, অথচ হয়তো সে-ই ছিল তাদের চেয়ে বেশি সচেতন, যারা ঘরের কোণে বসে বুদ্ধির কাব্য পাঠ করত।
আমার মনেও প্রায়ই প্রতিধ্বনিত হয়—আমার অবস্থা খানিকটা এ কাহিনিরই অনুরূপ। আমার ‘লায়লা’ নয় খ্যাতি, নয় জনপ্রিয়তা, নয় করতালির শব্দ, নয় সোশ্যাল মিডিয়ার পরিসংখ্যান। আমার লায়লা হল—কোনো মুমিনের উপকার, কোনো মস্তিষ্কে জ্বলে ওঠা আলোকস্তম্ভ, কোনো হৃদয়ে নেমে আসা প্রশান্তি।
এই লায়লার খোঁজে আমি কলমের মরুপথে হেঁটে যাই। এ যাত্রাপথে কেউ যদি পথের ধারে দাঁড়িয়ে চেঁচায়, কেউ কঙ্কর ছুড়ে, কেউ ধুলো উড়িয়ে দেয়, আমি রাগ করি না; কারণ তাদের অবস্থা সেই ধুলোবালির মতো,