শিরোনাম : পৃথিবী বদলানোর আগে নিজেকে বদলাও
——-
আমার হৃদয় যেন এক ব্যথিত আর অসুস্থ সত্তা—ক্লান্ত, অবসন্ন, শক্তিহীন। নানা ভাবনা ও আবেগ তাকে টানাটানি করছে, প্রবৃত্তি ও কামনা তাকে ছিঁড়ে ফেলছে, আর রীতি-রেওয়াজ ও অভ্যাস তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আধুনিকতার বাহারি ঢঙ ও ফ্যাশন তার লাগাম ধরে বসে আছে। ফলে সে আর ভালো-মন্দ, উপকারী-অপকারী, সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তার কাছে সুখ বলতে কেবল নিজের তাত্ক্ষণিক চাহিদা পূরণ—যা চায়, তা এখনই পাওয়া। রোগ তাকে আরও অসুস্থ করছে, নেশা তাকে আরও মত্ত করছে। বরং সে এক পর্যায়ে পৌঁছেছে—দুনিয়ার প্রতি উন্মত্ত আসক্তি, পাগলামি, মোহ আর বিভ্রমে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।
আমার বুদ্ধিও যেন বিপর্যস্ত—অবসন্ন, অসুস্থ, ভারসাম্যহীন। তার চিন্তার কাঠামো ভেঙে পড়েছে, মাপকাঠি বিকৃত হয়ে গেছে, মানদণ্ড হারিয়ে ফেলেছে সঠিকতা। মতের জটিলতা ও ভুল সিদ্ধান্তের ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে সে সত্যে পৌঁছাতে অক্ষম, সঠিক সিদ্ধান্ত উদ্ভাবনে দুর্বল, আর সোজা পথে বিষয়গুলো পরিচালনায় অদক্ষ। আমার অসুস্থ হৃদয় তাকে এমনভাবে বন্দি করে রেখেছে যে, সে তার নির্দেশের দাস, তার ইশারার গোলাম, তার চাওয়ার অনুসারী।
হায় আফসোস! আমার এই প্রবৃত্তির শৃঙ্খলে বাঁধা হৃদয় ও বুদ্ধি আমাকে টেনে এনেছে কত বিপদ, কত বিপর্যয়, কত দুঃখ ও দুর্ভোগের দিকে।
আমি যখনই আমার সমাজের দিকে তাকাই, দেখি—এ যেন আমারই প্রতিচ্ছবি। এখানে কামনা-বাসনার পূজা, আবেগের দাসত্ব, রীতি-রেওয়াজের অন্ধ অনুসরণ, ফ্যাশনের পেছনে ছোটা—সবই চলছে। ভালো-মন্দের মানদণ্ড ভেঙে পড়েছে, ন্যায় ও সুবিচারের পাল্লা বিকৃত হয়ে গেছে।
আমার সত্তা কত দুর্বল, আমার অক্ষমতা কত গভীর! আমি নিজের সংশোধনেই অক্ষম, সমাজ পরিবর্তন তো দূরের কথা। অকল্যাণ ছড়িয়ে পড়েছে, অবস্থা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। স্থলে-জলে সর্বত্র যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, তা আমারই হাতের কামাই, আমার মতো মানুষেরই কর্মফল।
আমি আজ নিজের ওপর পরাজিত, ইচ্ছাশক্তিহীন, শক্তি-সামর্থ্য হারানো এক মানুষ। কখনো মনে হয়—হায়, যদি জন্মই না নিতাম! যদি বিস্মৃত কোনো স্মৃতি হয়ে থাকতাম! কিংবা যদি জড় পদার্থ হতাম—একটি পাথর, একটি গাছ, একটি নিঃজীব সত্তা!
এই হতাশা ও নিরাশার গভীরে ডুবে যখন আমি দুঃখের ভার বইছিলাম, পৃথিবী আমার চোখে অন্ধকার হয়ে এসেছিল, প্রশস্ত পৃথিবীও যেন আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল—নিজের সঙ্গে লড়াই করছি, এমন সময় হঠাৎ এক অপরিচিত সঙ্গী উপস্থিত হলো। তাকে আমি চিনতাম না, তবু তার ভেতর থেকে এক পরিচিতির সুবাস পেলাম। সে আমাকে এমনভাবে অভিবাদন জানাল, যেন দীর্ঘদিনের প্রিয়জন। আমি তার অভিবাদনের জবাব দিয়ে বললাম :
তুমি আমাকে এমন সময়ে ব্যাহত করলে, যখন আমি গভীর চিন্তার সাগরে ডুবে ছিলাম। জানি না, তোমার এই আগমন আমার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে, নাকি দুঃখ আরও বাড়াবে।
সে বলল :
কী এমন ঘটেছে যে তুমি তোমার কাজকর্ম ছেড়ে দিয়েছ, পরিবার-পরিজন থেকে দূরে সরে গেছ, সমাজ ও চারপাশ সব ভুলে গেছ?
আমি বললাম :
যে মানুষ তার প্রতিপালককে ভুলে গেছে অথচ তিনি তাকে স্মরণ রাখেন, যে তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ অথচ তিনি তাকে অনুগ্রহে ভরিয়ে দেন, যে তাঁর কাছ থেকে পালায় অথচ তিনিই তার প্রয়োজন পূরণ করেন—তার খবর নিয়ে তুমি কেন এত আগ্রহী? আমি নিজের চেয়ে বড় মন্দ আর কিছু দেখিনি। আমার চোখ আছে, তবু দেখি না; কান আছে, তবু শুনি না; বুদ্ধি আছে, তবু তার দিশা নেই; হৃদয় আছে, তবু তা পথ দেখায় না। আমার আপনজন আছে, তারা আমার খোঁজ নেয়, আমি তাদের খোঁজ নেই না। বন্ধু আছে, তারা সম্পর্ক রাখে, আমি তা ছিন্ন করি। সমাজ আমাকে উপকার দেয়, আর আমি তার প্রতি বিশ্বস্ত নই।
সে বলল :
তোমার হতাশা কি এতদূর পৌঁছেছে? নিরাশা কি পুরোপুরি তোমাকে গ্রাস করেছে?
আমি বললাম :
আমি এক গভীর রোগে আক্রান্ত। আমার ভেতরে, আমার চারপাশে, সবখানে এই বিপর্যয়। আমি জানি না, কীভাবে পৃথিবীকে সংশোধন করব, কীভাবে তাকে পবিত্র করব, কীভাবে মানুষের আত্মশুদ্ধির পথ খুঁজে পাব।
সে বলল:
পৃথিবীকে বাগান-নদীতে রূপান্তর করতে যেও না, মরুভূমিকে সবুজ চারণভূমি বানানোর স্বপ্ন দেখো না। এ এমন এক কাজ, যার কোনো পথ নেই। তুমি যদি এর পেছনে ছুটো, তবে অসম্ভবের পেছনেই ছুটবে, আর নিজের ওপর এমন বোঝা চাপাবে, যা বহন করা তোমার সাধ্যের বাইরে। বরং বুঝে নাও, তোমার করণীয় কী? আর তাতেই নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যস্ত রাখো।
আমি বললাম :
আরও স্পষ্ট করে বলো।
সে বলল :
আল্লাহ তোমাকে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন এবং এমন বোঝা যেন তোমার ওপর না দেন, যা তুমি বহন করতে পারো না। তুমি নিজের থেকেই শুরু করো। তোমার গুনাহের জন্য তোমার রবের কাছে ক্ষমা চাও। আখিরাতের জন্য কাজ করো। দুনিয়ার কোনো সম্মানই মূল্যবান নয়, যদি তা আখিরাতের সম্মানের সঙ্গে যুক্ত না হয়। হে নিরাপত্তার ভ্রমে থাকা মানুষ! তোমার জীবনের একটি সীমা আছে, একদিন তা শেষ হবে, আর তুমি ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়াবে।
আমি বললাম:
তাহলে কি নিজের দেশ ও দ্বীনের সঙ্গীদের ব্যাপারে উদাসীন থাকা নিষ্ঠুরতা নয়?