শিরোনাম : লিঙ্গ, জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব।
———–
আমাকে দুটি প্রশ্ন করা হয়েছিল, আর আমি এখানে ধারাবাহিকভাবে তার উত্তর দিয়েছি।
প্রশ্ন ১:
মাদরাসার পরিসরে নারীরা প্রায়ই কেন উপেক্ষিত হয়, এবং তাদের অধিকার ও অবদানকে বাস্তবে সম্মানিত করার জন্য কী করা যেতে পারে?
উত্তর:
আধুনিক অনেক মাদরাসার প্রেক্ষাপটে নারীদের প্রান্তিককরণ দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত একটি বাস্তবতা। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, এই উপেক্ষা ইসলামি শিক্ষার মূল শিক্ষার প্রতিফলন নয়; বরং এটি সাংস্কৃতিক প্রভাব, যা ধীরে ধীরে ইসলামি শিক্ষার চেতনার ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে।
ইতিহাসে দেখা যায়, নারীরা কেবল ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারীই ছিলেন না, বরং স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। এর উজ্জ্বল উদাহরণ হজরত আয়েশা বিনতে আবু বকর (রাঃ) (মৃত্যু ৬৭৮ খ্রিস্টাব্দ), যিনি বিপুল পরিমাণে হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং শীর্ষ সাহাবাগণ তার কাছে ফতোয়া ও ব্যাখ্যার জন্য রুজু করেছেন। তেমনি দ্বাদশ শতাব্দীর আলিমা ফাতিমা আস-সামারকান্দিয়্যাহ ছিলেন একজন সম্মানিত ফকিহ ও শিক্ষিকা। আমার গ্রন্থ “আল-মুহাদ্দিসাত” প্রমাণ করে যে ইসলামি ইতিহাসে হাজারো নারী হাদিসের রাবি, শিক্ষক ও মুরব্বি হিসেবে সরাসরি পবিত্র জ্ঞান সংরক্ষণ ও প্রচারে অবদান রেখেছেন।
এই ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার উপায় হলো নারীদের যথাযথ কর্তৃত্ব প্রদান করা। আর ইসলামে কর্তৃত্ব অর্জনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো জ্ঞান। কোরআন নিজেই জ্ঞানকে সম্মান ও নেতৃত্বের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে (সূরা আয-জুমার ৩৯:৯)। নবী করীম ﷺ ঘোষণা করেছেন যে, জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ ও নারীর জন্য ফরজ। যখন নারীদের কঠোর ও নিয়মিতভাবে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার সুযোগ দেওয়া হয়, তখন তাদের কণ্ঠ ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিতে সেই বৈধতা লাভ করে, যা আসলেই আলিমদের জন্য নির্ধারিত।
বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু বাহ্যিক অংশগ্রহণ নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন, যা নারীদের শেখানো, ব্যাখ্যা করা ও মাদরাসার পরিসরে অবদান রাখার প্রকৃত সুযোগ করে দেয়। নারীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা—আলিম, শিক্ষক ও কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে—পুনরুজ্জীবিত করলে মুসলিম সমাজে তাদের অধিকার ও অবদানকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি ও সম্মান দেওয়া সম্ভব। এভাবে সমাজ ইসলামি বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেকে আবারও সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে, যেখানে মর্যাদা ও কর্তৃত্ব লিঙ্গভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস থেকে নয়, বরং জ্ঞান ও তাকওয়া থেকে উদ্ভূত হয়।
প্রশ্ন ২:
কিছু সমাজে কি এমন এক নিঃশব্দ বিশ্বাস রয়েছে যে নারীরা পুরুষদের মতো কার্যকরভাবে দ্বীনের খেদমত করতে পারে না? আর এ মানসিকতাকে কীভাবে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পরিবর্তন আনা যাবে?
উত্তর:
হ্যাঁ, কিছু সমাজে এমন একটি নিঃশব্দ হলেও গভীরভাবে প্রোথিত বিশ্বাস বিদ্যমান, যে নারীরা স্বভাবগতভাবেই পুরুষদের মতো দ্বীনের খেদমত করতে সক্ষম নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আসলে সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা ও পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো থেকে উদ্ভূত, ইসলামি শিক্ষার মৌলিক নীতিমালা থেকে নয়। এ ধরনের মনোভাব ইতিহাসে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ—যেমন ফিকহ, হাদিস, শিক্ষা ও সামাজিক নেতৃত্বে তাদের অবদান—উপেক্ষা করে। নবী করীম ﷺ -এর যুগ থেকেই বহু খ্যাতিমান আলিমা নারীরা গভীর জ্ঞানচর্চায় পারদর্শিতা প্রদর্শন করেছেন এবং মুসলিম সমাজকে পথনির্দেশ দিয়েছেন।
এই মানসিকতাকে বদলাতে হলে প্রয়োজন জ্ঞান ও কাঠামোগত উভয় ধরনের উদ্যোগ। প্রথমত, নারীদের শিক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন অপরিহার্য। যখন তাদের গভীর ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দেওয়া হয়, তখন তারা দ্বীনের সেবায় বৈধতা ও কর্তৃত্ব লাভ করে। দ্বিতীয়ত, সমাজকে নারীদের ঐতিহাসিক অবদানকে সামনে আনতে হবে এবং তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এতে তারা বাস্তব আদর্শ পাবে, যা প্রথাগত ভুল ধারণা ও গৎবাঁধা মানসিকতাকে ভেঙে দেবে।
তদুপরি, সংস্কার বলতে বোঝায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে নারীরা শিক্ষা দিতে পারবেন, দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারবেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন। এ ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে দ্বীনের খেদমতে যোগ্যতার মাপকাঠি হলো জ্ঞান, চরিত্র ও তাকওয়া—লিঙ্গ নয়। এর মাধ্যমে সমাজ ধীরে ধীরে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে পারবে এবং সামাজিক অনুশীলনকে কোরআনের সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে যে, সকল মুমিন—পুরুষ হোক বা নারী—ঈমান সংরক্ষণ ও প্রচারে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারে (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৫)।
——————–
ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, শিক্ষা।
—
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7044