Skip to main content

AkramNadwi

“যে মাদরাসায়ে দীনিয়াতে হযরত (মাওলানা খলীল আহমদ সাহ

“যে মাদরাসায়ে দীনিয়াতে হযরত (মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী) শিক্ষক ছিলেন, সেটি যখন কলেজের অধীন করে দেওয়া হলো এবং তাতে দর্শন ও জ্যোতির্বিদ্যার বিদ্যা অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তখন তিনি বিষয়টি হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গোহী-কে অবহিত করেন। এর জবাব এভাবে আসে:
ইনসাফের সঙ্গে ভেবে দেখা উচিত, হাইউলা (আদিম পদার্থ) ও সূরতের অস্তিত্ব স্বীকার, অবিভাজ্য অংশের অস্বীকৃতি, এবং হাইউলা ও সূরতের চিরন্তনত্ব মেনে নেওয়া, এসবের পরিণামই বা কী?
এগুলো কি কিয়ামত অস্বীকার, চিরন্তন সত্তার বহুত্ব মেনে নেওয়া, এবং আল্লাহ তাআলা, যাঁর শান সর্বোচ্চ, তাঁর জন্য ইখতিয়ার অস্বীকার করা নয়? এসব ভ্রান্ত আকীদা মুখে উচ্চারণ করাই অন্ধকার ডেকে আনে; আর এরপর দলিলের মাধ্যমে সেগুলো প্রমাণ করা, শিক্ষার্থীদের সেগুলোর উপর প্রতিষ্ঠিত করা, এবং আপত্তি দূর করে তাদের মনকে নিশ্চিন্ত করা ( অন্তরে বিশ্বাস না থাকলেও) প্রকৃতপক্ষে কাফেরদের আকীদারই প্রতিষ্ঠা। যদি কোনো খ্রিস্টান বিদ্যালয়ে ইনজিল পড়ানো হয় এবং উদ্দেশ্য হয় ত্রিত্ববাদ ইত্যাদির খণ্ডন, তবু কি একে মন্দ বলা হবে না?
এটি সম্পূর্ণ ভুল এবং নিছক অজুহাত; অতএব আমি এ ধরনের চাকরিকে বৈধ মনে করি না।”
(তাযকিরাতুল খলীল, পৃ. ৬১–৬২)

তাযকিরাতুল খলীল-এ উদ্ধৃত তাঁর এই পত্র থেকে বিষয়টি একেবারেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে—দর্শনের মৌলিক তত্ত্বসমূহ, যেমন জগতের চিরন্তনত্ব ইত্যাদি, তিনি প্রকাশ্য কুফর বলে মনে করতেন। তাঁর দৃষ্টিতে এসব আকীদা জিহ্বায় আনা, যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা এবং শিক্ষার্থীদের মনে বসিয়ে দেওয়া, বাহ্যত খণ্ডনের শিরোনামেই হোক না কেন, আসলে কাফেরদের বিশ্বাসেরই প্রসার। সে কারণেই তিনি এমন শিক্ষাব্যবস্থা ও এমন চাকরিকেও অবৈধ বলতেন, যেখানে দর্শন বা এ ধরনের কুফরপূর্ণ তত্ত্বের পাঠদান অপরিহার্য।

সারকথা এই যে, মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গোহী রাহিমাহুল্লাহর কাছে দর্শন এমন কোনো বিদ্যা ছিল না, যাকে কেবল সংশোধনের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়; কিংবা কোনো পর্যায়েই তিনি একে ইসলামের অনুগত মনে করেননি। তাঁর মতে, দর্শন তার ভিত্তি ও বৌদ্ধিক কাঠামোর দিক থেকে ইসলামের বিরোধী এবং ঈমানকে ক্ষয়কারী এক জ্ঞান, যা ওহির শ্রেষ্ঠত্বের মোকাবিলায় মানববুদ্ধিকে চূড়ান্ত বিচারক বানায়। এরই ফলে আল্লাহ তাআলার সত্তা ও গুণাবলি, তাকদীর, পরকাল এবং অন্যান্য মৌলিক আকীদার ক্ষেত্রে সংশয়, ভ্রান্ত ব্যাখ্যা ও বিচ্যুতি জন্ম নেয়। তাই তিনি দর্শনকে নিছক একাডেমিক মতভেদের বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং দ্বীন ও ঈমানের জন্য এক গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

মাওলানা গঙ্গোহী রাহিমাহুল্লাহর অবস্থান ছিল, যে জ্ঞানের ভিত্তিই যদি ভ্রান্ত আকীদা, কুফরপূর্ণ তত্ত্ব ও অনৈসলামিক ধারণার উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তা না পড়া যায়, না পড়ানো যায়, শিরোনাম যদি সমালোচনা বা গবেষণাই হয় তবু। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এমন জ্ঞান দীনী পরিবেশে প্রবেশ করলে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের মননে বিষ ঢেলে দেয় এবং আকীদার সরলতা, দৃঢ়তা ও নিষ্ঠাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ কারণেই তিনি চাইতেন, দীনী মাদরাসাগুলো, বিশেষত দারুল উলূম দেওবন্দের মতো মহান প্রতিষ্ঠান, দর্শন ও এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও পবিত্র থাকুক, যাতে সেখান থেকে এমন আলেম তৈরি হন, যাদের আকীদা খাঁটি, ঈমান দৃঢ় এবং চিন্তা ওহির অধীন।

এই অবস্থান কোনো ক্ষণিকের উত্তেজনা, ব্যক্তিগত রুচি বা আবেগী প্রতিক্রিয়ার ফল ছিল না; বরং গভীর দীনী চেতনা, বিস্তৃত জ্ঞানদৃষ্টি এবং আকাবিরে উম্মাহর মানহাজের সঙ্গে নিবিড় সংযুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এক সুচিন্তিত, নীতিগত অবস্থান। মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গোহী রাহিমাহুল্লাহ দর্শনের বিরোধিতা করেছিলেন বুদ্ধি বা চিন্তাভাবনার বিরোধিতা করে নয়; বরং সেই বুদ্ধির বিরোধিতা করে, যা ওহি থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকেই সত্যের মানদণ্ড বানায়। তাঁর কাছে দ্বীনের সংরক্ষণ, ঈমানের নিরাপত্তা এবং ইসলামী আকীদার খাঁটি রূপের হিফাজতই ছিল সর্বাগ্রে, আর দর্শন এসব কিছুর জন্যই এক স্থায়ী ও তীব্র হুমকি। এই দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি দর্শনকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং উম্মতকে তার অনিষ্ট থেকে রক্ষায় সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়েছেন।

———-
| ক্যাটাগরি : স্মৃতিচারণ, তারিখ, ইসলামি চিন্তাধারা,

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8041

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *