শিরোনাম : মৌলানা আবুল আ‘লা মওদূদী রহ.। (১৯০৩–১৯৭৯)
|৬ |ডিসেম্বর |২০২৫|
❖ প্রশ্ন
একজন নাদভী আলেম লিখেছেন:
অসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
মুহতারাম মওলানা ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী দামাত বারাকাতুহুম,
আমি যে পরিবেশে কর্মরত, সেখানে একটি নির্দিষ্ট মতধারার অনুগামীদের প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। এদের মধ্যে মতবাদগত পক্ষপাত এতই তীব্র যে, কখনো যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে আমি মওলানা মওদূদী রহ.-এর নাম উল্লেখ করি, সঙ্গে সঙ্গে এমন ব্যবহার করা হয় যেন আমি কোনো কুফরের কথা উচ্চারণ করেছি! তারপরই আমাকে ‘ফিতনা-এ-মওদূদিয়্যাত’ নামের বইটি পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আপনার লেখাগুলো থেকে বুঝা যায়, মওলানা মওদূদী রহ.-এর ব্যাপারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ন্যায়সঙ্গত, ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রাজ্ঞ। তাই বিনীত অনুরোধ, দয়া করে তাঁর প্রকৃত স্থান, মূল্য ও অবদান সম্পর্কে একটি দলিলসমৃদ্ধ ব্যাখ্যা দিন, যাতে সত্য বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে।
❖ উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
এই মুহূর্তে দীর্ঘ ও বিশদ আলোচনা সম্ভব নয়; তবে কয়েকটি সংক্ষিপ্ত অথচ সারগর্ভ কথা উপস্থাপন করছি, যাতে আপনার প্রশ্নের মূল দিক পরিষ্কার হয় এবং যে অস্বস্তির কথা আপনি উল্লেখ করেছেন, সেটাও অনেকটাই প্রশমিত হয়।
ভারতবর্ষের ধর্মীয়-শিক্ষাগত ইতিহাসে তাকালে সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়—
ফরঙ্গী মহল ও রাহিমিয়া মাদরাসার পর যে সব মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের অধিকাংশই নির্দিষ্ট মতবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। উদ্দেশ্য ছিল না দীনকে তার মূল সার্বজনীনতা ও প্রাণময়তায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া; বরং হানাফি ফিকহের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা, কঠোর তাকলিদ, আশআরি-মাতুরিদি কালামের কিছু বিশেষ ব্যাখ্যা, সুফিবাদের নির্দিষ্ট প্রবণতা এবং নানা মতবাদী উপাদান প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠা করা।
ফলাফল খুবই দুর্ভাগ্যজনক হলো—
উম্মাহর ভেতর ঐক্যের পরিবর্তে মতবাদের বিভাজন দৃঢ় হলো; তর্ক-বিতর্ক, বাকযুদ্ধ ও খণ্ডন-প্রতিখণ্ডনকে ‘ইলমি কাজ’ মনে করা হলো; একে অপরের বিরুদ্ধে বিদ্রূপ, নিন্দা, রায়দানের প্রবণতা ধর্মীয় দায়িত্বে পরিণত হলো। মানুষের মনে সত্য দীনকে বোঝার চেয়ে মতবাদের প্রতি আনুগত্যই বড় হয়ে দাঁড়াল।
এই মানসিকতার ভয়াবহতা বোঝার জন্য কেবল সেই সময়কার বইয়ের শিরোনামগুলো দেখলেই যথেষ্ট—
فؤوس الکملۃ علی رؤوس الجہلۃ, سوط الرحمن علی حاسد النعمان, ظفر مبین علی جمع الشیاطین, إمكان کذب الباری تعالیٰ, إمكان نظیر النبی ﷺ, المہند علی المفند—
এবং সাম্প্রতিক যুগে এরই ধারাবাহিকতা فتنۃ مودودیت, زلزلہ, زلزلہ در زلزلہ ইত্যাদিতে দেখা যায়।
এগুলো স্পষ্ট করে দেয়—
গভীর চিন্তা, সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তি, ন্যায়সঙ্গত পর্যালোচনা—এসবের কোনো স্থান ছিল না। মতভেদকে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিন্নতা নয়, বরং শত্রুতা, সন্দেহ কিংবা কখনো তাকফিরের স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে মুসলিম উম্মাহ চিন্তার প্রশস্ততা হারিয়েছে।
এই দমবন্ধ পরিস্থিতিতে যে ব্যক্তিত্ব পুরনো দলাদলির সীমানা ভেঙে, মতবাদের সংকীর্ণতা অতিক্রম করে খাঁটি দীনকে উপস্থাপনের উদ্যোগ নিলেন, তিনি ছিলেন আল্লামা শিবলী নোমানী।
তিনি মুসলমানদের পারস্পরিক বিরোধ নয়, বরং ওরিয়েন্টালিস্ট ও ইসলামবিরোধী সমালোচনার বৈজ্ঞানিক জবাব দেওয়াকে নিজের দায়িত্ব মনে করেছিলেন। নদওয়াতুল উলামা প্রতিষ্ঠার পর তিনি সেখানে নিজের মুক্তমনা, ভারসাম্যপূর্ণ ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রকৃত প্রতিফলন পেলেন।
এ ঐতিহাসিক সত্য যে—
উম্মাহর ভেতর থেকে মতবাদের সংকীর্ণতা, দলগত পক্ষপাত ও অনর্থক বিতর্ক দূর করার ক্ষেত্রে নদওয়ার ভূমিকার তুলনা আরব-অজম কোথাও পাওয়া কঠিন।
এই ধারারই এক দৃঢ় ও অনন্য কড়ি হলেন মওলানা সায়্যিদ আবুল আ‘লা মওদূদী রহ.
তিনি শুধু উপমহাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী ইসলামী চিন্তার নবায়নে নতুন স্রোতধারা সৃষ্টি করেছেন। তাঁর চিন্তা, বিশ্লেষণ শক্তি, ভারসাম্য ও সাহসিকতার দিক থেকে তিনি নিজ যুগের এক উচ্চতর প্রতিনিধিত্ব করেন।
যদি তাঁর অবদানগুলো বিন্যাস করে দেখা হয়—
১⃣ প্রথমত,
তিনি ইসলামকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন বা সংকীর্ণ মতবাদের খাঁচায় আবদ্ধ করে দেখাননি; বরং এক পূর্ণাঙ্গ, সমন্বিত ও সুশৃঙ্খল জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর রচনাগুলো সাক্ষ্য দেয়—
দীনের প্রাণ কুরআন-সুন্নাহতে, কোনো গোষ্ঠী কেন্দ্রিক ধর্মীয় সংস্কৃতিতে নয়।
২⃣ দ্বিতীয়ত,
শতাব্দীর পর শতাব্দীতে দীনের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া অনেক ভ্রান্ত রীতি—
অশরঈ তসাওউফ, দলগত জড়তা, অতিরিক্ত তাকলিদ, উদ্ভাবিত রীতিনীতি—
মওলানা মওদূদী রহ. সেগুলো সুস্পষ্টভাবে আলাদা করেছেন। দীনকে তার স্বচ্ছ, অমিশ্রিত রূপে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন।
৩⃣ তৃতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক,
তিনি আধুনিক মানুষের ভাষায়, আধুনিক চেতনার স্তরে, এবং পাশ্চাত্যের জ্ঞান-দর্শনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ইসলামকে উপস্থাপন করেছেন।