AkramNadwi

মুসলিম ও কাফির সমান নয়

মুসলিম ও কাফির সমান নয়

৪ মার্চ ২০২৬

بسم الله الرحمن الرحيم

ইসলামি শিক্ষার দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত মর্যাদার মাপকাঠি হলো ঈমান। বংশ, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি, মাযহাব, চিন্তাধারা, সামাজিক সেবা বা কেবল নৈতিক গুণাবলি, এসবের নিজস্ব গুরুত্ব থাকলেও আল্লাহর কাছে মানুষের আসল মর্যাদা নির্ভর করে এই সত্যের ওপর যে, তার হৃদয় কি ঈমানের আলোয় আলোকিত, নাকি কুফরের অন্ধকারে আচ্ছন্ন।

এই ভিত্তিতেই কিতাব ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিলসমূহ এবং উম্মতের প্রাথমিক যুগের আলেমদের ঐকমত্যপূর্ণ উপলব্ধি এ নীতি নির্ধারণ করেছে যে, যার অন্তরে সামান্যতম ঈমানও আছে, সে সেই ব্যক্তির চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যার অন্তরে ঈমানের বিন্দুমাত্র চিহ্নও নেই।

এই বিধান কেবল আবেগের বশবর্তী কোনো সম্পর্কের ফল নয়; বরং এটি একটি সুসংবদ্ধ আকিদাগত, দলিলভিত্তিক এবং যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

পবিত্র কোরআন ঈমান ও কুফরের পার্থক্যকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আমরা কি মুসলিমদেরকে অপরাধীদের মতো করে দেব? তোমাদের কী হলো, তোমরা কীভাবে বিচার করছ?”

এই প্রশ্নটি মূলত মানববুদ্ধিকে নাড়া দেওয়ার জন্য, ঈমানদার ও কাফিরকে কি কোনো অবস্থায় সমান বলা যেতে পারে? যখন ঈমানের অর্থ হলো আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস, তাঁর রাসুলের রিসালাতকে স্বীকার করা এবং তাঁর বিধানকে সত্য বলে মানা; আর কুফর হলো এসব সত্যকে অস্বীকার করা, তখন তাদের পরিণতি ও মর্যাদা সমান হওয়া আল্লাহর ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞার পরিপন্থী।

অতএব ঈমান ও কুফরের পার্থক্য কোনো মানুষের তৈরি পক্ষপাত নয়; এটি এক ঐশী নীতি।

সহিহ হাদিসসমূহ এই নীতিকে আরও স্পষ্ট করে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলবে এবং তার অন্তরে যব দানার সমান, বা গমের দানার সমান, কিংবা অণুপরিমাণ কল্যাণ (ঈমান) থাকবে, সে শেষ পর্যন্ত জাহান্নাম থেকে বের হয়ে আসবে।

এভাবে ঈমানের সর্বনিম্ন পরিমাণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে স্পষ্ট হয় ঈমানের ক্ষুদ্রতম স্ফুলিঙ্গও মানুষকে চিরস্থায়ী ধ্বংস থেকে রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট। যদিও কিছু মুমিন তাদের গোনাহের কারণে শাস্তি পেতে পারে, কিন্তু তাদের পরিণতি কাফিরদের মতো চিরস্থায়ী শাস্তি নয়। কারণ ঈমানের মূল বাস্তবতা তাদেরকে স্থায়ী কুফর থেকে আলাদা করে দেয়।

এছাড়া জামে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম সা. বলেছেন:
যার অন্তরে অণুপরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না; আর যার অন্তরে অণুপরিমাণ ঈমান থাকবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।

মুহাদ্দিসগণ এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এখানে “জাহান্নামে প্রবেশ করবে না” দ্বারা উদ্দেশ্য হলো চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে না। অর্থাৎ সে কাফিরদের মতো চিরকাল জাহান্নামে থাকবে না। অন্যান্য দলিল থেকে প্রমাণিত যে কিছু গুনাহগার মুমিন জাহান্নামে যেতে পারে, কিন্তু পরে শাফাআত অথবা আল্লাহর অনুগ্রহে সেখান থেকে বের হয়ে আসবে। এতে এই নীতি আরও দৃঢ় হয় যে ঈমানের উপস্থিতি মানুষকে চিরস্থায়ী শাস্তি থেকে পৃথক করে দেয়।

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা হলো, কোনো গুনাহগার মুসলিম যদি তওবা না করেই মৃত্যুবরণ করে, তবুও তাকে কাফির বলা যায় না এবং সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের অধিবাসী হয় না। তার ব্যাপারটি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল: তিনি চাইলে ক্ষমা করে দেবেন, চাইলে অপরাধের পরিমাণ অনুযায়ী শাস্তি দেবেন; কিন্তু ঈমানের মূল অস্তিত্ব থাকার কারণে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামি হয় না। এই অবস্থান কোরআন-সুন্নাহর সমষ্টিগত বোঝাপড়া এবং ন্যায় ও অনুগ্রহের সমন্বিত ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

এই আকিদাগত নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, একজন মুসলিম, সে যে কোনো ফিকহি বা কালামি মতাদর্শের সঙ্গেই যুক্ত থাকুক না কেন, ঈমানের মূল বাস্তবতার কারণে একজন অমুসলিমের তুলনায় অবশ্যই শ্রেষ্ঠ। সে সুন্নি হোক বা শিয়া, বেরলভি হোক বা সালাফি, আশআরি হোক বা মাতুরিদি, যদি সে আল্লাহর একত্ব ও মুহাম্মদ সা. এর রিসালাত স্বীকার করে এবং নিজেকে ইসলামের পরিসরের ভেতর মনে করে, তবে সে ঈমানের নিয়ামতের অধিকারী।

ফিকহি মতভেদ ও কালামি বৈচিত্র্য ইসলামের ইতিহাসে সবসময়ই ছিল, এবং এসব সত্ত্বেও কিবলামুখী মুসলমানদের সাধারণত মুসলিম হিসেবেই গণ্য করা হয়েছে। সুতরাং একজন মুসলিম, তার বোঝাপড়া বা আমলে দুর্বলতা থাকলেও ঈমানের মূল থাকার কারণে সেই ব্যক্তির চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যে ঈমান থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।

এ বিষয়টি যুক্তির ধারায়ও বোঝা যায়। ঈমান হলো সত্যের স্বীকৃতি এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের নাম; আর কুফর হলো সেই সত্যকে অস্বীকার করা এবং সেই সম্পর্ক ছিন্ন করা। সত্যকে স্বীকার করা নিজেই অস্বীকারের চেয়ে উত্তম। যখন মূল বিশ্বাসই ভিন্ন, তখন আংশিক কর্ম বা পার্থিব গুণাবলি এই মৌলিক পার্থক্যকে মুছে দিতে পারে না।

অতএব যার অন্তরে অণুপরিমাণ ঈমান আছে, সে সেই ব্যক্তির চেয়ে শ্রেষ্ঠ যার অন্তরে ঈমান একেবারেই নেই। কারণ প্রথম ব্যক্তির সঙ্গে স্রষ্টার সম্পর্ক অটুট, যদিও তা দুর্বল হতে পারে; আর দ্বিতীয় ব্যক্তি সেই সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

রাসুলুল্লাহ সা. এর এই বাণী “মুমিনের মর্যাদা কাবা শরিফের মর্যাদার চেয়েও অধিক” এই সত্যকেই আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রকাশ করে যে, ঈমান মানুষকে এমন এক আত্মিক মহিমা দান করে যা বস্তুগত সব পরিমাপের ঊর্ধ্বে। ঈমান মানুষকে কেবল একটি সামাজিক পরিচয় দেয় না; বরং তাকে এক পবিত্র সম্পর্ক এবং আখিরাতের আশার সঙ্গে যুক্ত করে। আর এই সম্পর্কের কারণেই ঈমানের সামান্যতম অংশও অপরিসীম মূল্যবান হয়ে ওঠে।

সারকথা এই যে, ঈমান এমন এক মহান নিয়ামত, যার ক্ষুদ্রতম পরিমাণও মানুষকে চিরস্থায়ী ক্ষতি ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারে। ঈমানের ক্ষীণতম আলোও কুফরের পূর্ণ অন্ধকারের চেয়ে বহু গুণ শ্রেষ্ঠ। সুতরাং যার অন্তরে ঈমানের মূল সত্তা বিদ্যমান, সে যে কোনো মসলকি পরিচয়েরই হোক না কেন, সে অবশ্যই সেই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, যার অন্তরে ঈমান একেবারেই নেই।

এই সিদ্ধান্ত কোনো পক্ষপাতের ফল নয়; বরং কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিল, প্রাথমিক যুগের আলেমদের ঐকমত্য এবং সুসংগত যুক্তিবোধ, এই তিনের সুষম সমন্বয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ঈমানের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করার, তার মর্যাদা উপলব্ধি করার এবং এর ওপর দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

———-

ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, উপদেশ, শিক্ষা।

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8610

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *