শিরোনাম: মীরের সন্ধ্যা : যখন বেদনা মহফিলে প্রদীপ জ্বালাল
—–
ড. মুহাম্মদ আক্রাম নাদভী
অক্সফোর্ড
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সেই গোধূলি। দিনের সমস্ত ব্যস্ততা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার আঁচলে গুটিয়ে আসছিল, আর আমি সি-সেনার ডিসি-তে এমন এক আসরের দিকে যাচ্ছিলাম যার আলোচনার কেন্দ্র কেবল একজন কবি নন, সমগ্র উর্দু হৃদয়ের ইতিহাস। এটি ছিল ‘অদবী বৈঠক’-এর তৃতীয় নিয়মিত সাহিত্যসভা, আর সে সন্ধ্যায় আলাপের মধ্যমণি ছিলেন মীর তকী মীর—যাঁর কবিতায় শব্দ কেবল শব্দ থাকে না, পরিণত হয় দীর্ঘশ্বাসে, অশ্রুতে, স্মৃতিতে, আর কখনো কখনো ভগ্ন এক সভ্যতার আর্তনাদ হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।
সেই আসরের সঞ্চালনা করছিলেন সিস্টার আনুশা ইমরান, সঙ্গে ছিলেন মুঈয্ মুহাম্মদ। বিকেল পাঁচটায় অনুষ্ঠান শুরু হতেই বোঝা গেল, এটি কোনো সাধারণ সমাবেশ নয়। সত্তরেরও বেশি ভ্রাতৃ-আপ্যা উপস্থিত, সবার মুখে সেই অপেক্ষার আবেশ, যেন প্রিয় কোনো কাহিনি পুনরায় শোনার মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছিল, তাঁরা কেবল একটি বক্তৃতা শুনতে নয়, উর্দুর সেই প্রাচীন প্রদীপের শিখার চারদিকে জড়ো হয়েছেন, যার আলো শতাব্দীর ব্যবধান পেরিয়েও আজও উজ্জ্বল।
মীরের কথায় প্রবেশ করা মানেই যেন এক শহরে ঢুকে পড়া—যে শহরের গলি কেবল ইট-পাথরে নয়, গড়ে উঠেছে স্মৃতি, ভালোবাসা, ভাঙন, হিজরত আর কবিতার মিশেলে। আমি শুরু করলাম উর্দু গজলের উৎপত্তি ও প্রকৃতি দিয়ে; ভাষার স্বভাব, তার সাংস্কৃতিক পটভূমি ও বিবর্তনের পথে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম মীরের জীবন ও রচনায়। মীরের সত্তায় আমি সবসময় দেখি এক বিস্ময়কর সংমিশ্রণ: একদিকে অতি কোমল, ভগ্ন, রক্তাক্ত হৃদয়; অপরদিকে শিল্পের ওপর এমন এক আস্থা, যেন কবি নিজের কাব্যের মাধ্যমে কালের ললাটে নিজের নাম লিখছেন।
কাজি আবু ইউসুফ ও ‘কিতাবুল খরাজ’ নিয়ে আলোচনার পর মীর-এ আসা বাহ্যত এক জগত থেকে আরেক জগতে পা ফেলা। ওখানে ছিল রাষ্ট্র, রাজনীতি, ক্ষমতা, ন্যায়বিচারের প্রশ্ন; এখানে আছে কবিতা, হৃদয়, প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও মানুষের অন্তর্জগতের সেই নামহীন অনুভূতি, যাকে ভাষা দেয় শুধু কবিতা। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, এই দুই জগত তত অচেনা নয়। রাষ্ট্র মানবের সামষ্টিক জীবনে অর্থ খোঁজে, আর কবিতা তার অন্তরজীবনে; একদিকে ন্যায়ের অনুসন্ধান, অন্যদিকে সৌন্দর্যের; শেষ বিচারে উভয়েরই খোঁজ একটাই—সেই অর্থ যা জীবনের গভীরতা, মর্যাদা ও তাৎপর্য বাড়িয়ে তোলে।
মীরের কবিতায় দিল্লি শুধু শহর নয়, এক হারানো জগৎ। যে দিল্লিতে ছিল প্রাণের রমক, জ্ঞানী-কুশলজনের জমায়েত, সাহিত্য-সংস্কৃতির লাবণ্য—সেই শহর জনশূন্য হলে মীরের ভেতরেও একটি নগর ভেঙে পড়ে। তাই তাঁর এই পঙ্ক্তিমালা কেবল নগরশোক নয়, এক সমগ্র সভ্যতার পতনের কাহিনি—
“কী ছিল সে বাসস্থান, পূর্বের বাসিন্দারা জিজ্ঞেস করো,
আমাকে গরিব ভেবে ব্যঙ্গভরা হাসিতে ডাকো!
দিল্লি—যে নগর ছিল দুনিয়ায় নির্বাচিত,
নির্বাচিতজনরাই যেখানে বাস করত প্রত্যহ।
দূর আকাশ লুটে নিয়ে পরিত্যক্ত করল যা,
আমরা তো সেইই উজাড় করা দেশে বসবাস করি।”
এখানে ‘দিল্লি’ ভূগোলের সীমা ছাড়িয়ে স্মৃতির স্বদেশ; এক মাতৃভূমি যা কাড়াকাড়ি করে নিয়েছে ইতিহাস, কিন্তু কবির হৃদয় থেকে ছিনিয়ে নিতে পারেনি। মীর যখন লক্ষনৌ-তে, তখনও তাঁর অন্তরের একটি জানালা দিল্লির দিকে খোলা থাকত। দূরত্ব বাড়ে, কিন্তু স্মৃতির ভূমিতে কোনো দূরত্ব নেই। নগর ছেড়ে যাওয়া সম্ভব, নগরের মাটি মন থেকে মুছে ফেলা নয়। মীরের দিল্লি-স্মৃতি আসলে নিজের অতীত সত্তার স্মৃতি; এক এমন জগৎ, যা ফেরে না, তবু কবিতায় চিরজীবী।
এখানেই মীরকে নিছক ‘দুঃখের কবি’ বলা তাঁর কৃতিত্বকে সংকীর্ণ করে ফেলে। মীর দুঃখকে শুধু ভোগ করেননি, শিল্পে রূপ দিয়েছেন; ব্যথাকে কেবল বর্ণনা নয়, ভাষার কোমলতা দিয়েছেন; পরাজয়কে পরাজয় থাকতে দেননি, কবিতার শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। তাঁর অশ্রুতেও এক রীতি আছে, দীর্ঘশ্বাসেও সুর। হৃদয় ক্ষতবিক্ষত, তবু ভাষা বিশৃঙ্খল নয়; অন্তর বিপন্ন, তবু কবিতা অনবদ্য নিয়ন্ত্রণ ও সামঞ্জস্যে পূর্ণ।
এবং এই মীরই নিজ শিল্পের ওপর এমন আস্থাও প্রকাশ করেন, যা উর্দু কবিতায় অনন্য—
“সারাজাহানে আমি ছায়া বিস্তৃত,
নিশ্চিত আমার উচ্চারিত শব্দ।”
এটা কেবল আত্মমুগ্ধতার ঘোষণাই নয়; নিজ সৃষ্টিশক্তির চেতনা। মীর জানতেন, তাঁর শব্দ ক্ষণিকের উচ্চারণ নয়, কালের স্মৃতিভাণ্ডারের অংশ হতে চলেছে। তাই পরের সব মহাকবি মীরের সামনে দাঁড়িয়ে আপন আসনের মাপকাঠি অনুধাবন করেছেন।
গালিব ও মীরের সম্পর্ক সেই কাব্যিক উত্তরাধিকার-শৃঙ্খলার মনোহর দ্যোতনা। গালিব যেভাবে মীরের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেছেন, তা উর্দুর দুই পরাক্রান্ত স্বরের এক নীরব সংলাপ। তাঁর কণ্ঠে মীরের প্রতি এক গভীর ভক্তি—
“গালিবের বিশ্বাস—নাসিখের বাণীতে,
যে মীরকে মানে না, সে কবিতায় নির্জলা।”
আর গালিবের আরেক অমর পঙ্ক্তি—
“রেখ্তে-র তুমি নও গুরু, হে গালিব,
শোনা যায়—আগেকালে ছিল এক মীর।”
এখানে গালিবের নিজস্ব দাপটও আছে, আবার মীরের মাহাত্ম্যের স্বীকারও। আশ্চর্যের বিষয়, মহান কবি যখন পূর্বসূরি মহান কবির সামনে নত