শিরোনাম : মহরে ফাতেমি
—–
|| প্রশ্ন
সম্মানিত শায়েখ ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী হাফিজাহুল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বরাকাতুহ।
আল্লাহ তাআলার কাছে আশা করছি আপনি সব সময় কল্যাণ, সুস্থতা ও নিরাপত্তায় থাকবেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়াতাআলা আপনাকে সুস্থ-সবল রাখুন—আমীন, ইয়া রাব্বাল ‘আলামীন।
আমার একান্ত প্রশ্ন ও বিনীত অনুরোধ হলো—মহরে ফাতেমির প্রকৃত সত্য কী? প্রামাণিক সীরাত-সাহিত্যের আলোকে এটি কীভাবে বর্ণিত হয়েছে? দয়া করে উত্তর দিলে কৃতজ্ঞ থাকব।
আহকির—সাইয়্যেদ সাজিদ পীরজাদা হাসনি
|| উত্তর
ওয়াআলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বরাকাতুহু।
ইসলামি বিবাহের মৌলিক শরয়ি অধিকার ‘মহর’—কুরআন কারিম যাকে নারীর স্বতন্ত্র সম্পত্তি ঘোষণা করেছে। শরিয়ত নারীর এ অধিকার রক্ষা করলেও, বিবাহকে সহজসাধ্য ও বরকতময় রাখতে মহরে বাড়াবাড়ি, অপব্যয় ও অহংকার নিরুৎসাহিত করেছে। সমসাময়িককালে “মহর-ই-ফাতেমি” পরিভাষা ব্যাপক প্রচলিত; একদল এটিকে নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় অঙ্ক মনে করেন, আরেকদল সুন্নতের অপরিহার্য মানদণ্ড মানেন। তাই হাদিস, আসার-ই-সাহাবা ও আইম্মায়ে কেরামের বক্তব্যে এর সত্যতা অনুধাবন জরুরি।
প্রধানতম সূত্র হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর বর্ণনা। তিনি বলেন, ‘নারীর মহরে বাড়াবাড়ি করো না। মহরের আধিক্য যদি দুনিয়ায় সম্মান, কিংবা আল্লাহর কাছে মর্যাদার মানদণ্ড হতো, তবে রাসুলুল্লাহ সা.-এর তুলনায় বেশি যার হক আছে এমন কেউ নেই। অথচ তিনি কোনো স্ত্রী বা কন্যার মহর বারো উকিয়া অতিক্রম করেননি।’ (ইবন মাজাহ) এ বর্ণনা মহরের পরিমাণ ও সুন্নতের প্রকৃতি দুটোই স্পষ্ট করে। আসল সম্মানের মানদণ্ড তাকওয়া, সদাচরণ ও চরিত্র; মহরের অঙ্ক নয়।
সহিহ মুসলিমে উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সা.-এর স্ত্রীদের মহর ছিল বারো উকিয়া ও এক ‘নশ’। ‘নশ’ অর্ধ-উকিয়া; আর এক উকিয়া = ৪০ দিরহাম। ফলে ১২ উকিয়া = ৪৮০ দিরহাম, অর্ধ-উকিয়া = ২০, সর্বমোট ৫০০ দিরহাম। এ-ই রাসুলুল্লাহ সা.-এর স্ত্রীর মহর।
হজরত ফাতিমা যাহরা রা.-এর বিয়েতে হজরত আলি রা. ‘দির‘-উত-হুতামিয়া’ নামে বর্ম বিক্রি করে মহর দেন। বর্ণনাভেদে বর্মের দাম ৪০০ বা ৪৮০ দিরহাম। ইবনু সা‘দ, আবু ইয়ালা প্রমুখের বর্ণনায় স্পষ্ট—মহর ৪০০-৪৮০ দিরহামের মাঝামাঝি ছিল। পরবর্তীতে এ-ই ‘মহর-ই-ফাতেমি’ নামে প্রসিদ্ধ হয়।
একে কেবল ‘সংখ্যা’ ভাবা ঠিক নয়; মূল হলো দিরহামের রুপা-ওজন। এক দিরহাম ≈ ২.৯৭৫ গ্রাম। সুতরাং ৪০০ দিরহাম ≈ ১,১৯০ গ্রাম, ৪৮০ দিরহাম ≈ ১,৪২৮ গ্রাম। অর্থাৎ প্রায় ১.১৯-১.৪৩ কেজি রুপর সমান। বর্তমান বাজারদরে এর মূল্য আনুমানিক ১,২০০-১,৫০০ মার্কিন ডলার, যা দরের ওঠানামায় বদলায়। তাই বহু আলিম বলেন, নির্দিষ্ট মুদ্রায় এটি ‘স্থির’ না রেখে রুপার ওজনেই বিবেচনা করা উচিত।
ফুকাহায়ে কেরামও বলেন, বিবাহে সহজতা ও ভারসাম্য কাম্য। ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেন, ইমাম আহমদ রহ.-এর মতে প্রায় ৪০০ দিরহাম মহর মুস্তাহাব; সামর্থ্য থাকলে এটি উৎকৃষ্ট। ইবনুল কাইয়্যিম রহ. “যাদুল মা‘আদ”-এ উল্লেখ করেন—মহরের ন্যূনতম বাধ্যতামূলক সীমা নেই; অস্বাভাবিক বাড়াবাড়ি বরকত নষ্ট করে। উদ্দেশ্য—নারীর অধিকার সুরক্ষা, আবার বিবাহকে আর্থিক বোঝা না বানানো।
সুতরাং ‘মহর ফাতেমি’-র আসল শিক্ষা কোনো সংখ্যা নয়; বরং সুন্নতের সেই প্রাণ, যা বিবাহকে সরল, মধ্যপন্থী ও বরকতময় রাখে। রাসুলুল্লাহ সা.-এর শিক্ষা—পরিবারের মর্যাদা ও দাম্পত্য-সফলতা মহরের অঙ্কে নয়; ঈমান, সদাচার ও পারস্পরিক হকের আদায়েই নিহিত। তাই বিবাহ সহজ করো, তাকে অর্থসম্মত প্রতিযোগিতার ময়দান বানিয়ো না।
|| সারসংক্ষেপ
হজরত ফাতিমা যাহরা রা.-এর মহর ≈ ৪০০-৪৮০ দিরহাম, আর উম্মহাতুল মুমিনীনের ≈ ৫০০ দিরহাম। আজকের পরিমাপে এটি প্রায় ১.১৯-১.৪৩ কেজি রুপর সমান; বাজারমূল্য আনুমানিক ১,২০০-১,৫০০ ডলার। কিন্তু এর আসল গুরুত্ব টাকায় নয়; বরং সে-ই সুন্নতে নববীর শিক্ষায়, যা বিবাহকে সহজ, মধ্যপন্থী ও বরকতময় করে—এবং আমাদের সমাজে আজ যার প্রয়োজন প্রবল।
———
ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, শিক্ষা,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ AI, সম্পাদনা, মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
https://t.me/DrAkramNadwi/9366