শিরোনাম : ভাষা ও সাহিত্য: মানব সভ্যতার যৌথ উত্তরাধিকার
———
মানব ইতিহাসের গভীর অধ্যয়ন এই সত্যকে স্পষ্ট করে যে মানুষের চিন্তাশীল, সাংস্কৃতিক এবং আধ্যাত্মিক জীবন বিভিন্ন জ্ঞান ও কলার পারস্পরিক সহযোগিতায় গঠিত ও বিকশিত হয়। মানুষ আদিকাল থেকেই তার প্রয়োজন, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং চিন্তার অনুসন্ধানের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করে আসছে, এবং এই জ্ঞানই পরবর্তীতে বিভিন্ন জ্ঞান ও কলার রূপ ধারণ করেছে। সুতরাং সভ্যতার নির্মাণ, সমাজের সংগঠন, নৈতিক মূল্যবোধের গঠন এবং চিন্তার সচেতনতা সবই জ্ঞানের বিভিন্ন প্রকাশ। যদি এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, তবে জ্ঞান ও কলাকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে: এক, সেই জ্ঞান যা মানুষের বস্তুগত, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক প্রয়োজনের সাথে সম্পর্কিত, এবং দুই, সেই জ্ঞান যা তার ধর্মীয়, নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনের দিকনির্দেশনা দেয়।
প্রথম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, বাণিজ্য, অর্থনীতি, জ্যামিতি, নির্মাণ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান এবং অন্যান্য সমস্ত জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত যা মানুষের জীবনের বাহ্যিক এবং সাংস্কৃতিক দিকগুলির সাথে সম্পর্কিত। এই জ্ঞান মানুষের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, বুদ্ধি এবং সমষ্টিগত চিন্তার ফলস্বরূপ উদ্ভূত হয়। তাদের উদ্দেশ্য মানুষের জীবনকে সহজ, সংগঠিত এবং উন্নত করা। এই জ্ঞানই মানুষকে বস্তুগত সম্পদ সরবরাহ করে, সমাজকে স্থিতিশীলতা দেয়, এবং সভ্যতাকে প্রসারিত করে। যেমন, চিকিৎসা মানুষের শরীরের রোগের চিকিৎসা করে, জ্যামিতি নির্মাণের ভিত্তি প্রদান করে, অর্থনীতি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সংগঠিত করে, এবং বিজ্ঞান মহাবিশ্বের ঘটনাবলী বোঝার ক্ষেত্রে মানুষের দিকনির্দেশনা দেয়।
এই জ্ঞানের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল যে এটি কোনো একটি জাতি, বর্ণ বা ধর্মের সম্পত্তি নয় বরং সমগ্র মানবতার যৌথ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। গ্রিক দার্শনিক চিন্তা, ভারতীয় গণিত গবেষণা, মুসলিম সভ্যতার চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক অবদান, এবং ইউরোপের শিল্প বিপ্লব, সবই আসলে মানব জ্ঞানের একটি ধারাবাহিক যাত্রার বিভিন্ন গন্তব্য। কোনো জাতি এই দাবি করতে পারে না যে জ্ঞান শুধুমাত্র তারই উত্তরাধিকার, কারণ মানব বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতা কোনো নির্দিষ্ট বর্ণ বা ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞানের প্রকৃতি বিশ্বজনীন; এটি যেখানে উৎপন্ন হয়, শেষ পর্যন্ত সমগ্র মানবতার উপকারের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় শ্রেণি ধর্মীয় জ্ঞানের, যার মধ্যে কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির, উসুলুল ফিকহ, কালাম এবং তাসাউফ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এই জ্ঞানের উৎস হলো আল্লাহর ওহী, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং নবীদের শিক্ষা। তাদের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তার সাথে পরিচয় করানো, তার নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা, এবং তাকে জীবনযাপনের সঠিক নীতিমালা প্রদান করা। যদি মানব জ্ঞান মানুষের বস্তুগত এবং সাংস্কৃতিক জীবনকে সংগঠিত করে, তবে ধর্মীয় জ্ঞান তার অভ্যন্তরীণ, নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক চেতনার গঠন করে। এই জ্ঞানই মানুষকে এই অনুভূতি দেয় যে জীবন শুধুমাত্র বস্তুগত আরামের নাম নয় বরং এর একটি নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যও রয়েছে।
ধর্মীয় জ্ঞান মানুষের মধ্যে জবাবদিহিতা, তাকওয়া, ন্যায়বিচার, দয়া, ত্যাগ এবং নৈতিক দায়িত্বের চেতনা জাগ্রত করে। তারা তাকে শেখায় যে মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার নৈতিকতা, চরিত্র এবং আল্লাহর বন্দেগিতে, শুধুমাত্র বস্তুগত উন্নতিতে নয়। এই কারণেই মানব ইতিহাসে সেই সভ্যতাগুলোই দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে যারা বস্তুগত উন্নতির সাথে নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকেও সংরক্ষণ করেছে।
ভাষা ও সাহিত্য মানব জ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত, এবং তারা মানব সভ্যতার মৌলিক স্তম্ভগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভাষা শুধুমাত্র শব্দের সমষ্টি বা প্রকাশের একটি মাধ্যম নয় বরং মানব চিন্তা, সভ্যতা, ইতিহাস, অনুভূতি এবং সমষ্টিগত চেতনার রক্ষক। মানুষ তার চিন্তা, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, ধারণা এবং পর্যবেক্ষণ ভাষার মাধ্যমেই অন্যদের কাছে স্থানান্তরিত করে। এই ভাষাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানব অভিজ্ঞতাকে সংরক্ষণ করে এবং সভ্যতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। যদি ভাষা না থাকে তবে না জ্ঞান স্থানান্তরিত হতে পারে, না ইতিহাস সংরক্ষিত থাকতে পারে, এবং না সভ্যতা তার পরিচয় বজায় রাখতে পারে।
তদ্রূপ, সাহিত্য মানব অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং সমষ্টিগত চেতনার প্রতিচ্ছবি। সাহিত্যে একটি জাতির স্বপ্ন, ভয়, আশা, বঞ্চনা, সাফল্য, নৈতিক মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক প্রবণতা সংরক্ষিত থাকে। কবিতা ও সাহিত্য শুধুমাত্র শব্দের অলংকার বা শৈলীর সৌন্দর্যের নাম নয় বরং মানব আত্মা এবং সমষ্টিগত অভিজ্ঞতার প্রকাশ। একটি জাতির সাহিত্যের অধ্যয়ন আসলে সেই জাতির মনোবিজ্ঞান, সভ্যতা, ইতিহাস এবং চিন্তার মেজাজের অধ্যয়ন।