Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম: ভালোবাসা এবং নির্জনতার বিষয়ক ভাবনা —–

শিরোনাম: ভালোবাসা এবং নির্জনতার বিষয়ক ভাবনা
—–
ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
১/৭/২০২৬

তারা বলল, “আমরা দেখছি—মানুষের সান্নিধ্যের চেয়ে তুমি নির্জনতা পছন্দ করেছ। জনসমাজ থেকে এমন ভাবে সরে দাঁড়িয়েছ যেন নিঃসঙ্গতার ভেতর এমন কিছু পেয়েছ যা ভিড়ের মাঝে মিলল না। ভীড় বাড়লেই তুমি আসর ত্যাগ করো, ভোজ জমলেই অনুপস্থিত থাকো। যাকে লোকে ভোগ বলে, তাতে তুমি কষ্ট লক্ষ করো; যাকে তারা আনন্দ গন্য করে, তাতে তুমি নিঃসঙ্গতার ছায়া দেখো।”

আমি বললাম, “হৃদয় একটি আয়না। আয়নাকে ঝাপসা করার জন্য মেলামেশার ধুলোবালির চেয়ে দ্রুত কিছু নেই; আর বিরামহীন কোলাহলই তার সবচেয়ে বড় শত্রু, কারণ তা আয়নাকে আলোক ধরার অবকাশই দেয় না। সত্য কেবল চোখে ধরা পড়ে না; সেজন্য দরকার স্বচ্ছ অন্তর, যেভাবে চাঁদের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠার জন্য প্রয়োজন স্থিরজল।”

তারা বলল, “পূর্বজরা বলেছেন—যে সৌন্দর্য ভালোবাসে সে যেন প্রসস্ত উদ্যান আর ফুলেল বাগানে ঘুরে বেড়ায়, কারণ পুষ্পই সৌন্দর্যের মুখপাত্র। যে সৌরভ খোঁজে, সে যেন সুগন্ধিবিক্রেতাদের আশ্রয় নেয়, কারণ প্রতিটি প্রাণেরই একটি জাগরণী সুবাস আছে। আর যে প্রেম বোঝে, সে যেন গীতী পাখিদের সান্নিধ্যে থাকে, কারণ তারা প্রেমের ফোয়ারা থেকে সুর তোলে। অথচ আমরা দেখি, তুমি সৌন্দর্য সন্ধান করো অথচ বাহ্য রূপ থেকে মুখ ফেরাও, সুবাসের কথা বলো কিন্তু গন্ধে অনাসক্ত, নিজেকে প্রেমিক বলো অথচ এমন সব মজলিস থেকে দূরে থাকো যেখানে মানুষ ভালোবাসা নিয়ে আলোচনা করে—মনে হয় তুমি নদের পথ এড়িয়ে সাগরে পৌঁছতে চাও!”

আমি বললাম, “তোমরা যা খোঁজো তার বহিঃপ্রকাশে, আমি খুঁজি তার জন্মস্থানে। তোমরা অর্থ খোঁজো বাজারে, প্রতিপত্তি রাজপ্রাসাদে, জ্ঞান গ্রন্থাগারে, ভোগ নির্দিষ্ট আস্তানায়— এতে দোষ নেই, কারণ প্রত্যেক কিছুরই উপায় আছে। তবে আমি শিখেছি—সর্বোচ্চ রত্ন বাজারে ঝুলে না, জনসমাবেশও তার হদিস রাখে না। সেগুলো তো নেমে আসে এমন হৃদয়ে, যা সব ব্যস্ততা থেকে ফাঁকা; যেমন আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে সেই মাটিতে, যা তাকে গ্রহণের জন্য প্রস্তুত।”

“মুক্তো জলের চাঁইয়ে নয়, সাগরের অতল থেকে তুলে আনতে হয়। আত্মার খনিজও তেমন—গভীরতায় যত ডুব দিই, উদ্ঘাটন তত স্বচ্ছ হয়।”

তারা বলল, “কে তোমার শায়খ, যে তোমাকে এ পথ শিখিয়েছে?” আমি বললাম, “আমার শায়খ কায়েস ইবনুল মুলাওয়াহ, অধিকাংশ মানুষ তাঁকে বুঝতে পারেনি; তাঁরা কাহিনি দেখেছেন, হৃদয় দেখেননি। তাঁরা ভেবেছেন, তিনি কোনো নারীর প্রেমিক; অথচ তিনি ছিলেন এক মহামানার্থের অনুরাগী। ‘লায়লা’ ছিল কেবল নাম, আর আকুলতা ছিল তাঁর পথ।

তারা বলল, “তাঁর মধ্যে কী দেখলে?” আমি বললাম, “তিনি প্রেমকে অপমান করেননি—দরজায় দরজায় ভিক্ষা করেননি, আবেগের হাটে নিলামে তোলেননি, ক্ষণস্থায়ী কামনার সোপানও বানাননি। সময় যখন তাঁকে লাইলার কাছ থেকে আলাদা করে দিল, তখন তিনি নিম্নতার পথে নামলেন না, জানালার ফাঁকেও দাঁড়ালেন না, পথঘাটকে বানালেন না তাঁর অপমানের নাট্যমঞ্চ। তিনি বেরিয়ে গিয়েছিলেন মরুভূমিতে—মানুষের দুনিয়া যখন তাঁকে সঙ্কুচিত করল, আল্লাহর দুনিয়া তাঁকে প্রশস্ত করল।”

“সেখানে তিনি আকাশকে ছাদ, বালুকে বিছানা, বাতাসকে সঙ্গী, তারাকেসম্পাতে আলাপন বানালেন। নিঃসঙ্গতায় তিনি সঙ্গ, এবং নীরবতায় কথা আবিষ্কার করলেন। যখন জনপদের মাটি তাঁকে আঁট করে ধরল, মরু তাঁর জন্য প্রসারিত হলো। তিনি বালুতটে হাঁটলেন যেমন মানুষ বাজারে হাঁটে; পার্থক্য এতে—ওরা কেনাবেচা করে, তিনি দুনিয়া হারিয়ে হৃদয় জিতে নেন।”

তারা বলল, “তবু তো তিনি লাইলাকে পেলেন না!” আমি বললাম, “তোমরা মনে কর লাইলাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তোমরা প্রেম মাপো প্রাপ্তির মানদণ্ডে, আমরা মাপি হৃদয়-পরিবর্তনের গভীরতায়। তোমরা সাফল্য ভাবো পৌঁছতে, আমরা দেখি চলার ভেতরেই সার্থকতা। প্রিয় সত্য হলে পথটাই লক্ষ্য হয়ে যায়; তাতে প্রতিটি পা ফসল, প্রতিটি ক্লেশ অনুগ্রহ, প্রতিটি আকুলতা জীবন হয়ে ওঠে।”

“আল্লাহমুখী পথিক মাইলফলক গণনা করেন না; গণনা করেন—প্রতিটি ধাপে তার ভেতর কী উদ্ঘাটন ঘটল, কোন আবরণ ঝরল, কতটুকু নূর উদ্ভাসিত হল। এ কারণেই দোয়া আমাদের কাছে প্রাপ্তির চেয়ে সুস্বাদু—দোয়া মানে দয়ালুর সান্নিধ্যে থাকা। প্রার্থনা পূর্ণ হলে প্রার্থী সরে যায়; কিন্তু দোয়াকারী এখনও দরজায়, আর দরজাই তার জন্য দানের চেয়ে প্রিয়।”

“এইজন্য কুরআন আমাদের নিকট জান্নাতের নেয়ামের চেয়ে প্রিয়; কেননা কুরআন প্রিয়তমের আহ্বান, জান্নাত তাঁর দান—আর আহ্বানের লাবণ্য কি দানের মিষ্টির সমান! মসজিদমুখী পা পৃথিবীর সব লালসার চেয়েও স্নিগ্ধ; কারণ শরীর মসজিদের দিকে চলে, আর হৃদয় ছুটে আল্লাহর দিকে।”

সুতরাং কায়েসই আমাদের শায়খ—তিনি লাইলার প্রেমে দগ্ধ হয়ে ক্ষয় হয়েছেন বলে নয়, বরং এজন্য যে তিনি শিখিয়েছেন—ভালোবাসা মালিকানা নয়, রূপান্তর; আকুলতা ঘাটতি নয়, পূর্ণতার এমন স্তর, যা কেবল ভোগকারীই চেনে; বঞ্চনাও ধন—যদি তা হৃদয়কে সত্য সাধনায় ধাবিত করে। প্রকৃত প্রেমিক প্রেয়সীর চিত্রে থেমে থাকে

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *