শিরোনাম: আমাদের পশ্চাৎপদতার কারণ অন্যের অগ্রগতি নয়
—–
লেখক: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
১৮/৬/২০২৬
হে আমার ভ্রাতৃগণ, হে আরব সম্প্রদায়,
আমাদের বৈঠকে, পত্রিকায় ও আলোচনায় কতবারই না শুনেছি—পূর্বের জাতিগুলো আমাদের ছাড়িয়ে গেছে, পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের ওপরে ছড়ি ঘোরাচ্ছে, চারদিকের জাতি-রাষ্ট্রগুলো শক্তি, জ্ঞান ও আধিপত্যের পথে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে, আর আমরা কেবল তাদের পদচিহ্ন গুনে, ইতিহাসের ছায়া ছুঁয়ে তাকিয়ে রয়েছি। এমনকি অনেকের মনে গেঁথে গেছে—আমাদের দুর্বলতার গোপন কুঠুরি হয়তো লুকিয়ে আছে তাদের শক্তিতে; আমাদের পশ্চাৎপদতার মূল কারণ হয়তো তাদের অগ্রগতি; আজ আমরা যে অসারতা, যে ব্যর্থতা বয়ে বেড়াই, তা হয়তো সরাসরি তাদের ক্ষমতার ফল।
কিন্তু যে সত্য আমরা দেখতে চাই না, যে সত্য থেকে আমরা পালিয়ে বেড়াই—যেন অসুস্থ রোগী আয়নার সামনে যেতে ভয় পায়,তা হলো: আমাদের পিছিয়ে পড়ার কারণ অন্যের এগিয়ে যাওয়া নয়।
পশ্চিম কী আমাদের অজ্ঞ বানিয়েছে যখন আমরা জ্ঞান অবহেলা করেছি? পূর্ব কী আমাদের শিল্পভিত্তি ধ্বংস করেছে যখন আমরা শিল্পকে বাদ দিয়েছি? উন্নত জাতিগুলোই বা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পঙ্গু করেছে কবে—যখন আমরা নিজ হাতে তাতে অবহেলা, দুর্নীতি ও কুপরিকল্পনার বিষ ঢেলেছি?
কোনো জাতিই অন্য জাতির মেধা চুরি করতে পারে না, তাদের ইচ্ছাশক্তি কেড়ে নিতে পারে না, তাদের শিক্ষা-অর্জন, শ্রম বা সৃজনশীলতা রুখে রাখতে পারে না। প্রত্যেক জাতি তার ভবিষ্যৎ নিজ হাতে গড়ে তোলে—দৃষ্টিভঙ্গি, দৃঢ়সংকল্প ও ধৈর্যের সমষ্টিতে। সুতরাং কোনো জাতিকে স্বমহিমায় উন্নীত হতে দেখলে প্রশ্ন তোলো না—ওরা কীভাবে উঠল? বরং নিজেকে জিজ্ঞেস করো—আমাদের জাতি কীভাবে যেখানে ছিল সেখানেই নিশ্চল হয়ে রইল।?
অনেক সময় আমাদের অবস্থা সেই লোকটার মতো, যে পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে দেখতে পায় অন্য কেউ শিখরে উঠছে। সে ভাবে—নিজের নীচে পড়ে থাকার কারণ এই উঠন্ত লোক। অথচ সে বোঝে না, শিখর একাধিককে জায়গা দেয়; পথ খোলা আছে; তাকে ঠেকায়নি অন্যের পদক্ষেপ, ঠেকিয়েছে তার দ্বিধা, আলস্য, কিংবা শিখরের দিকে তাকিয়ে থাকাই যার একমাত্র ব্যস্ততা।
হে আরব সম্প্রদায়,
বিদ্যাক্ষেত্রের দিকে তাকাও। যে জাতিগুলো অগ্রসর, তারা কি আসমান থেকে কোনো অনন্য মেধা নিয়ে নেমেছে? নাকি এই কারণে যে তারা বিদ্যালয়কে মেধার কারখানায়, বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার অভয়ারণ্যে এবং গবেষণাগারকে এমন এক কর্মশালায় পরিণত করেছিল যেখানে গতি কখনো থামে না? তারা বুঝেছে—আসল সম্পদ মাটির নিচে নয়, মাথার ভেতর; খনিজে নয়, সেই বুদ্ধিতে—যে পাথর থেকে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানে থেকে শক্তি, আর শক্তি থেকে সভ্যতা আহরণ করে।
রাজনীতির ময়দানে তাকাও। আজকের যে প্রভাব-প্রতিপত্তি, তা কাকতালীয় উপহার নয়; এটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দূরদর্শী প্রশাসন, এমন আইনব্যবস্থার ফল—যা রাষ্ট্র নিজে মানে, তারপরে নাগরিকদের মানতে বলে। আধুনিক রাষ্ট্র কেবল বক্তৃতায় দাঁড়ায় না; যেমন কোনো অট্টালিকা শুধু অলঙ্কারে টিকে না। এর মূল ভিত গাঢ়, যেন মহাবৃক্ষের গোড়ার শেকড় গভীর মাটিতে প্রোথিত।
সামরিক শক্তি দেখো। একসময় তলোয়ার ছিল শক্তির প্রতীক, অতঃপর কামান, আজ শক্তি প্রথমে জন্মায় গবেষণাগারে, তারপর যুদ্ধক্ষেত্রে। বিশ্ববিদ্যালয় এখন প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থার অংশ; গবেষক জাতির সৈনিক; বৈজ্ঞানিক সমীকরণ বারুদ-বিমানের চেয়েও কম কার্যকর নয়। কাজেই কেবল অস্ত্র কেনা যথেষ্ট নয়—অস্ত্র তৈরির মগজ থাকতে হবে।
অর্থনীতির দিকে তাকাও। যারা বিশ্বমঞ্চে শীর্ষে, তারা কি প্রাকৃতিক সম্পদে সবার চেয়ে ধনী ছিল? না; বরং তাদের মানুষ ছিল জ্ঞান, সংগঠন ও শৃঙ্খলায় শীর্ষস্থানীয়। অল্প সম্পদের দেশও নাগরিকের মেধায় সমৃদ্ধ হয়েছে; বিপুল সম্পদের দেশও দৃষ্টিহীন নীতিনির্ধারণে নিঃস্ব হয়েছে। আধুনিক কালে সম্পদ মাটি থেকে নয়—উৎপন্ন হয় জ্ঞান, উদ্ভাবন ও উৎপাদন থেকে।
আমাদের অনেকের অবস্থা সেই চাষির মতো, যে বহু বছর জমি অনুল্পে ছেড়ে দিয়েছে; মাটি শুকিয়ে গিয়েছে, ফসল পুড়ে মরেছে। এখন সে পড়শির সজীব বাগান দেখে প্রশ্ন করে—ওদের ফল ধরল কেন, আমারটায় দিল না? অথচ তার মনে ভালোই জানে—সমস্যা অন্যের উর্বর মাটিতে নয়; সে নিজেই জমিতে চাষ, সেচ, পরিচর্যা করেনি।
দীর্ঘকাল আমরা ব্যর্থতার কারণ অন্যত্র খুঁজে ফিরেছি—কখনো অন্যের ষড়যন্ত্র-কূটকৌশলে, কখনো শত্রুর শক্তিতে, আবার কখনো চারপাশের বৈশ্বিক উথ্থান-পতনে। নিঃসন্দেহে জাতিগুলো প্রতিযোগী, স্বার্থের সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী, শক্তিধর আরো শক্তি বাড়াতে চায়। কিন্তু প্রাণবান জাতি এগুলোকে অলসতার অজুহাত, পশ্চাৎপদতার অঙ্কুর করে না। তারা বাস্তবকে বাস্তবের মতো দেখে, তারপর নিজেকে জিজ্ঞেস করে—আমরা কী করতে পারি? অন্যে আমাদের সঙ্গে কী করেছে—এ প্রশ্নে আটকে থাকে না।
কোনো জাতির জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ বিপদ—নিজ গন্তব্যের দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলা। তখনই সে ইতিহাসের নির্মাতার আসন থেকে নেমে দর্শকে পরিণত হয়; ঘটনার কুশীলব থেকে ঘটনাচক্রের