শিরোনাম: বুদ্ধু ও তার ছাগলের গল্প
—–
লেখক: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
১৮/৬/২০২৬
আমাদের গ্রামে এক ব্যক্তি ছিলেন, যাকে পুরো গ্রাম ‘বুদ্ধু’ নামে চিনত। যদিও তার প্রকৃত নামটা ছিল অন্য কিছু, সম্ভবত বাবা-মা অশেষ আদরে রেখেছিলেন। কিন্তু নামও বড় অদ্ভুত জিনিস—কখনো মা-বাবা নাম রাখেন, কখনো কালের হাওয়া। মা-বাবার দেওয়া নাম কাগজপত্রে বেঁচে থাকে, আর কালের দেওয়া নাম মানুষের মুখে। ফলে ঐ ব্যক্তির আসল নাম সরকারি রেজিস্টারে কোথাও চাপা পড়ে গিয়েছিল, আর ‘বুদ্ধু’ ছিল জনসাধারণের আদালতের সেই রায়, যার বিরুদ্ধে কোনো আপিল চলে না।
বুদ্ধু নিজে ততটা ক্ষতিকর ছিলেন না, যতটা ক্ষতি করত তার ছাগল। ধরুন বুদ্ধু যদি হয় নীরব এক রাজ্য, তবে ছাগলটি সে রাজ্যের সচল সেনাবাহিনী। গ্রামের গলিগুলো ছিল তার চারণভূমি, লোকজনের উঠোন তার রেস্তোরাঁ, আর মাঠ-ঘাট ছিল তার জন্য এমন, যেন কারও জন্য খোলা পুঁথি।
ছাগলটির দুটি গুণ ছিল, যা সাধারণত বড় বড় লোকদের মধ্যেই দেখা যায়: এক—নিজের সীমানা সম্পর্কে কোনো বোধ নেই; দুই—অন্যের মালিকানার প্রতিও কোনো শ্রদ্ধা নেই।
ভোর হলেই সে এমন দাপট নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরোত, যেন কোনো জায়গীর তার জমিজমা পরিদর্শনে যাচ্ছে। গলায় বাঁধা ঘণ্টা কেবল অলংকার ছিল না, যেন তার কর্তৃত্বের পদক। সে হাঁটলেই ঘণ্টা বাজত, আর ঘণ্টা বাজলেই গ্রামের লোকদের বুক কাঁপত। যেমন কোনো কালে শহরের প্রাচীরে শত্রুর পতাকা দুললেই সবাই দরজা বন্ধ করত, ঠিক তেমনি ছাগলের ঘণ্টাধ্বনি শুনে গৃহস্থ বউরা উঠোনে দৌড়ত, চাষিরা মাঠে ছুটত।
কিন্তু ছাগল তো ছাগলই—হাওয়ার মতো দরজা পেরিয়ে যায়, জলের মতো পথ করে নেয়, আর ট্যাক্স আদায়কারীর মতো ঠিক সেইখানেই হাজির হয়, যেখানে তার আগমন কারও কাম্য নয়।
কারও শুকিয়ে যাওয়া মেথি তার খাদ্য হতো, কারও সবজি তার পেটে যেত, কারও আটা-ভরা ঝুড়ি তার জন্য ভোজের আসর হয়ে উঠত। একবার তো এক বাচ্চারnকাঠের স্লেটও চিবিয়ে খেয়ে ফেলল। বাচ্চাটা কান্না জুড়ে দিলে বুদ্ধু গভীর দার্শনিক ভঙ্গিতে বলল, ‘বেটা, বিদ্যা যদি এতই জরুরি হতো, ছাগল কি তা খেত?’ কথাটা শুনে বাচ্চার চেয়ে তার মাস্টারই প্রায় কেঁদে ফেলল।
অভিযোগের শেষ ছিল না। প্রতিদিনই কেউ না কেউ বুদ্ধুর দরজায় আসত—কারও ফসলের শোক, কারও সবজির, কারও উঠোনের।
কিন্তু বুদ্ধুর স্বভাব ছিল অদ্ভুত শান্ত—প্রতিটি অভিযোগ তিনি এমনভাবে শুনতেন, যেন কোনো বয়োবৃদ্ধ দুনিয়ার নশ্বরতা নিয়ে উপদেশ পাচ্ছেন।
‘আচ্ছা, দেখি।’
এই একটিমাত্র বাক্য গ্রামের এতটাই চালু ছিল যে অভিযোগকারীরা আগেই উত্তর জানত। অনেকে মজা করে বলত, বুদ্ধু যদি কোনো দিন বাদশা হতেন, তবে তার সাম্রাজ্য চলত ‘আচ্ছা, দেখি’ নীতিতে।
এদিকে ছাগল রোজ নতুন নতুন জয় ছিনিয়ে আনছিল।
শেষ পর্যন্ত গ্রামের ধর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল, যখন এক সকালে খবর রটল—ছাগল মসজিদে ঢুকে পড়েছে! খবরে গ্রাম জ্বলে উঠল শুকনো ঘাসে আগুনের মত।
একজন বলল, ‘আমি চোখে দেখেছি!’ আরেকজন বলল, ‘আমি তখন অজু করছিলাম।’ তৃতীয়জন শপথ করে জানাল, ‘ছাগল কাতারের ফাঁকে হাঁটছিল, যেন নামাজিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করছে।’
এ পর্যন্ত যার যার ফসলই নষ্ট হয়েছে, উঠোনই তছনছ হয়েছে—সবাই ভেবেছে ক্ষতি শুধু তার। কিন্তু মসজিদের ব্যাপার সবার; মসজিদ তো এমন ছাদ, যার নিচে সব মতভেদ সাময়িক আশ্রয় পায়। সুতরাং সিদ্ধান্ত হল—পঞ্চায়েত বসবে।
পঞ্চায়েতের দিনে গ্রাম দেখার মতো। বয়োজ্যেষ্ঠরা লাঠি হাতে এলেন, তরুণরা উচ্ছ্বাস নিয়ে, আর যারা কোনো ব্যাপারই বোঝে না, তারাও এল; কারণ প্রতি পঞ্চায়েতে থাকা তাদের জন্মগত অধিকার!
মজলিস জমল। পরিবেশে এমন গাম্ভীর্য, যেন কোনো সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বিচারে বসা হয়েছে।
বুদ্ধুকে ডাকা হল। তিনি এলেন, সালাম দিলেন, এক কোণে বসলেন। মুখে সেই উদাস ভাব, যা হয় অতিমাত্রায় নিরীহ কিংবা মারাত্মক লোকদের মুখে।
অভিযোগ-পত্র খোলা হল। এক বয়োবৃদ্ধ বক্তৃতা করলেন, দ্বিতীয়জন সমর্থন করলেন, তৃতীয়জন মসজিদের পবিত্রতা ব্যাখ্যা করলেন, চতুর্থজন ছাগলের পূর্ববর্তী অপরাধের ফিরিস্তি পড়লেন—একেবারে কোনো প্রসিকিউটরের মতো।
শেষে চূড়ান্ত স্বরে বলা হল, ‘বুদ্ধু! তুমি কী বলো? তোমার ছাগল মসজিদে ঢুকেছে!’ মজলিসে নিস্তব্ধতা।
সব চোখ বুদ্ধুর দিকে। সবার ধারণা, আজ তার কাছে কোনো উত্তর নেই; আজ সব ‘আচ্ছা, দেখি’ বাতাসে মিলিয়ে যাবে।
বুদ্ধু কয়েক মুহূর্ত মাথা নত রাখলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠল মাথা। চোখে সেই নিরীহ ঝিলিক, যা হঠাৎ আক্রমণের আগে বিড়ালের চোখে দেখা যায়।
তিনি বললেন, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
লোকে বলল, ‘করো।’
বুদ্ধু বললেন, ‘আমাকেও কি কখনও মসজিদে দেখেছ?’
মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল। লোকজন একে অপরের দিকে তাকাল। প্রশ্নটা এত সরল যে কোনো কূটচাল নেই, এত অদ্ভুত যে উদ্দেশ্য ধরা যায় না।
একজন খেপে উঠে বলল, ‘কথা তোমার নয়, তোমার ছাগলের।’
বুদ্ধু মাথা নাড়লেন, ‘আমিও তো তাই বলছি। ছাগল তো জানে না মসজিদ কী, ঘর কী, মাঠ কী। ও তো জানোয়ার—পবিত্রতা বোঝেনা,না