Skip to main content

AkramNadwi

বুদ্ধির সীমা ও আল্লাহ্‌র জ্ঞান

বুদ্ধির সীমা ও আল্লাহ্‌র জ্ঞান

ড. মুহাম্মদ আকরাম নদভী
০৬/০৭/২০২৬

প্রশ্ন:
আমি ড. মুহাম্মদ আকরাম নদভী-এর সাক্ষাৎকার শুনে মনে করেছি যেন হাজার পৃষ্ঠার কোনো গ্রন্থের নির্যাস শুনছি। অনেক বিষয় আমার কাছে একেবারেই নতুন ছিল। তবে একটি কথা তিনি বললেন—স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে যত দলিলই পেশ করা হোক, সেটি চূড়ান্ত ও অখণ্ড নয়; অধিক বুদ্ধিমান কেউ চাইলে তা খণ্ডন করে দিতে পারে। এইভাবে তো সবই অর্থহীন হয়ে যাবে; প্রমাণ করার মতো বাকি কী-বা থাকবে?

উত্তর:
প্রশ্নটি বাহ্যত আল্লাহ্‌র অস্তিত্বের প্রমাণ নিয়ে হলেও আসলে এই প্রশ্ন জড়িয়ে আছে অধিক মৌলিক এক বিষয়ে—মানুষ কীভাবে জ্ঞান লাভ করে? বাস্তবতা অনুধাবনের মাধ্যমগুলো কী? আর সেই মাধ্যমগুলোর মধ্যে বুদ্ধির অবস্থান কোথায়?

১. জ্ঞানের উৎস বহুমাত্রিক
মানুষের জ্ঞানের উৎস এক নয়, আর প্রত্যেক সত্যও একই পদ্ধতিতে ধরা দেয় না।
• কিছু সত্য আসে ফিতরত থেকে।
• কিছু আসে ইন্দ্রিয় ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে।
• কিছু সত্য ইন্দ্রিয়াতীত, যেগুলি ওহির মাধ্যমে জানা যায়।

অতএব “যা কেবল বুদ্ধিতে প্রমাণিত নয় সেটি অবিশ্বাস্য” এই ধারণা নিজের মধ্যেই বিভ্রান্তিকর।

২. ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি এবং ফিতরতের আন্তঃসম্পর্ক
চোখ দেখে, কান শোনে, ত্বক স্পর্শ করে—ইন্দ্রিয় তথ্য জোগায়; বুদ্ধি সেগুলিকে গুছিয়ে ফলাফল টানে। কিন্তু রং, ধ্বনি বা গন্ধ সরাসরি বুদ্ধি উপলব্ধি করে না। বুদ্ধি নিজে সত্য সৃষ্টি করে না—সে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, সমন্বয় করে।

৩. ফিতরতের সাবলীল স্বর
মানুষের ভেতরে পূর্বপ্রোথিত কিছু উপলব্ধি থাকে—সত্যের অনুসন্ধান, ন্যায়-অন্যায়ের আদি বোধ, স্রষ্টাশক্তির সন্ধান; কুরআন এটাকেই বলে “فِطۡرَتَ ٱللَّهِ”। আল্লাহ্‌র ফিতরত দার্শনিক উৎপাদন নয়; ফিতরতের মূলে থাকা এক বাস্তব উপলব্ধি, যাকে বুদ্ধি চেতনায় তুলে, কায়েনাতের নিদর্শনের সঙ্গে সংযুক্ত করে।

৪. আয়াত, বুদ্ধি ও ফিতরতের সহযাত্রা
كُفِّي “سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ …”
মানুষের কর্তব্য—নিজের নফসকে দেখুক, বিশ্বজগৎ পর্যবেক্ষণ করুক, জীবন-মৃত্যু ও কায়েনাতের সামঞ্জস্য চিনুক; ফিতরত সে নিদর্শনের দিকে উদ্বুদ্ধ করে, বুদ্ধি সে নিদর্শন পড়ে অর্থোদ্ঘাটন করে।

৫. বুদ্ধির সীমা ও শক্তি
বুদ্ধি আল্লাহ্‌র মহান দান; তবে
• সে গায়েব সৃষ্টি করে না,
• ইন্দ্রিয় ছাড়া বৈষয়িক তথ্য জানে না,
• মেটাফিজিক্যাল বিশদ তথ্য নিজে তৈরি করে না।

তার কাজ—বুঝতে, সাজাতে, যাচাই করতে, ফল টানতে। সুতরাং সে জ্ঞানের উৎস নয়; জ্ঞানের মর্মব্যাখ্যাকারী।

৬. “অখণ্ড দলিল”-এর ভ্রম
দার্শনিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—শ্রেষ্ঠ চিন্তকরাও স্রষ্টা-ধারণায় একমত হননি। নিছক বুদ্ধি তাই সবাইকে বাধ্যতামূলক এক সিদ্ধান্তে আনতে পারে না। তবে বুদ্ধি স্রষ্টার অস্তিত্বকে বাতিল করার প্রকৃষ্ট দলিলও দেয়নি। “অখণ্ড প্রমাণ নেই” ≠ “স্রষ্টা নেই”। ‘দলিলের অনুপস্থিতি’ আর ‘অস্তিত্বের অস্বীকার’—দুটি ভিন্ন ব্যাপার।

৭. জ্ঞানভিত্তি ধারাবাহিক
• আগুনের গরম—ইন্দ্রিয়াত্মক ও পরীক্ষিত সত্য
• ঐতিহাসিক ঘটনা—মৌখিক-লিখিত নির্ভরযোগ্য সূত্র
• গাণিতিক সত্য—যুক্তি ও স্বতঃপ্রমাণ
• গায়েব—ওহি

যদি কেউ ঘোষণা দেয়—“শুধু বুদ্ধিগতভাবে প্রমাণিত জিনিসই গ্রহণযোগ্য”—তাহলে সে মানবীয় জ্ঞানের অর্ধেকই ছেঁটে ফেলবে।

৮. ওহি ও বুদ্ধি—প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহায়
বুদ্ধি নবি-পাঠ-প্রমাণ খতিয়ে দেখে। কিন্তু ফেরেশতা, আখেরাত, জান্নাত-জাহান্নামের বিস্তারিত বিবরণ আনতে পারে ওহি। এখানে ওহি পথপ্রদর্শক, বুদ্ধি সহযাত্রী।

৯. “আপত্তিসাধ্য” বলে বাতিল?
কোনো দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তিযুক্ত-সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয় কি?—এটাই বিবেচ্য। নেহায়েত “আপত্তির সম্ভাবনা আছে”—এটি কোনো প্রমাণকে অকার্যকর করে না; নইলে “সব প্রমাণ খণ্ডনযোগ্য”—এই দাবিরও খণ্ডন সম্ভব, তখন সংশয়ের দোলাচলে পড়ে যাব।

১০. ফিতরতের সুস্থ পদ্ধতি
• ফিতরতের জাগরণ
• নফস ও আকাশ-পৃথিবীর আয়াত পর্যবেক্ষণ
• ইন্দ্রিয়-সঞ্জাত তথ্যের বিশ্লেষণ
• বুদ্ধির সংগঠন
• ওহির শরণ—যেখানে বুদ্ধির সীমা শেষ
• দোআ—আল্লাহ্‌র কাছে হেদায়েতের প্রার্থনা

১১. সমন্বিত জ্ঞানচিত্র
ফিতরত টানে, ইন্দ্রিয় চেনায়, ওহি জানান দেয়, বুদ্ধি বোঝে-গুছিয়ে-পরখে সেতুবন্ধ গড়ে। বুদ্ধিকে অস্বীকারও নয়, সর্বময় শাসকও নয়। সে সত্যের স্রষ্টা নয়—সত্যসন্ধানীর সঙ্গী; ওহির প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—তার বোঝাপড়ার সাপোর্ট।

১২. ভারসাম্যপূর্ণ পথ
মানুষ দার্শনিক কোলাহল থেকে খানিক সরে, নিজের গভীরে নেমে, ফিতরতের স্বর শুনে, নিজ নফস ও কায়েনাতের আয়াত পাঠ করে, ওহির সামনে মন খুলে, বুদ্ধিকে যথাস্থানে কাজে লাগিয়ে, এরপর প্রভুর নিকট দোআ করুক—“হে আল্লাহ্, সত্যকে সত্যরূপে দেখার ও অনুসরণের তাওফিক দিন।”

আল্লাহ্‌র ফিতরত শুধু এমন এক দলিলের নাম নয় যার বিপরীতে কোনো আপত্তি অবশিষ্ট থাকে না; বরং—ফিতরত, নিদর্শন, বুদ্ধি ও ওহি-নির্ভর এক সমগ্র জ্ঞানব্যবস্থা। বুদ্ধি পথচিহ্ন বুঝে, সেতু গড়ে; তবে হেদায়েতের চূড়ান্ত দরজা খোলে তবেই, যাঁর দিকে সব নিদর্শন ইঙ্গিত করে।

বুদ্ধির প্রকৃত গৌরবও এখানেই—সে নিজের ক্ষমতা চিনে, নিজের সীমাও জানতে পারে; সে সত্যের জননী নয়—সত্যসন্ধানে বিশ্বস্ত সঙ্গী।
———
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ: এই নিবন্ধটি AI দ্বারা অনুবাদ করা হয়েছে।
https://t.me/DrAkramNadwi/10317

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *