Skip to main content

AkramNadwi

হাদিসের ইমামগণ, বিশেষ করে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলি

হাদিসের ইমামগণ, বিশেষ করে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম (রহ.), এই রিওয়ায়াতগুলোকে যুগে যুগে যাচাই-বাছাই করেছেন। তাঁরা দেখেছেন—কোন বর্ণনা প্রতিটি স্তরে টিকে আছে, আর কোনটিতে কোনো স্তরের সংযোগ নেই। যেখানে বর্ণনার সনদে ফাঁক পাওয়া গেছে, তা গ্রহণ করা হয়নি।

তদুপরি প্রতিটি যুগের রাওয়িদের পদ্ধতিও এক ছিল না। যেমন—কোনো হাদিসের সনদে যদি কাতাদা বা আ‘মাশের নাম আসে, তবে দেখা জরুরি—তাঁরা সত্যিই তা সরাসরি শুনেছেন, নাকি তাদলিস (অর্থাৎ মধ্যবর্তী সূত্র বাদ দিয়ে বর্ণনা) করেছেন। কারণ এ দুইজন এ ধরনের তাদলিসের জন্য পরিচিত ছিলেন। এ কারণে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম তাঁদের বহু বর্ণনা বর্জন করেছেন।

তদ্রূপ, যদি কোনো রিওয়ায়াতে ইমাম যুহরীর নাম থাকে, তবে খুঁজে দেখা হতো—তিনি কোথাও শুধু হুবহু কথা পৌঁছে দিয়েছেন, কোথাও নিজের ব্যাখ্যা যোগ করেছেন, আর কোথাও অন্যের কথা মিশিয়ে দিয়েছেন কি না। হাদিসের পরিভাষায় এটাকে ইদরাজ বলা হয়। আর ইমাম যুহরী সম্পর্কে জানা যায় যে, তিনি প্রায়ই ইদরাজ করতেন।

এখন, যুগে যুগে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঘটনাবলিকে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করার নামই ইতিহাস। রাসুল ﷺ-এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদন সাহাবাদের কাছে ছিল সরাসরি দ্বীন, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা হয়ে গেল রিওয়ায়াত বা বর্ণনা। অর্থাৎ তারা সরাসরি ঘটনাদর্শী ছিলেন না; বরং রাওয়িদের মাধ্যমে তা তাঁদের কাছে পৌঁছেছিল। আর এই বর্ণনাই ইতিহাসের আলোচ্য বিষয়।

তাই প্রয়োজন হলো—এই রিওয়ায়াতগুলোতে আমল করার আগে সেগুলোর যুগে যুগে বিশ্লেষণ করা, সঠিক ও ভ্রান্তকে পৃথক করা এবং সংযোজন-বিয়োজনের ছাঁকনির ভেতর দিয়ে যাচাই করা। এ কারণেই মুহাদ্দিসগণ প্রতিটি হাদিসের সাথে তার সনদ উল্লেখ করেছেন এবং গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সনদের অবিচ্ছিন্নতা অপরিহার্য করেছেন।

যেহেতু সবকিছুই বর্ণনার মাধ্যমে পৌঁছেছে, তাই রাসুল ﷺ-এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদন বর্ণনায় সেসবই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যা ইতিহাসের রিওয়ায়াতে ব্যবহৃত হয়—যেমন حدثنا، أخبرنا، أنبأنا ইত্যাদি।

আমরা অবশ্যই রাসুল ﷺ-এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদনকে দ্বীনই মানি; তবে এগুলোর রিওয়ায়াত, হাদিস বর্ণনা ও স্থানান্তরকে ইতিহাস বলি। মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় একে বলা হয় খবর, হাদিস, রিওয়ায়াত ইত্যাদি। এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, মূল পাঠ বোঝার আগে তার সনদ ও উৎস যাচাই অপরিহার্য—নইলে সনদের প্রয়োজনই থাকত না।

|| প্রশ্ন ও উত্তর :

প্রথম প্রশ্ন:
হাদিস সংরক্ষণের মানদণ্ড তো সাধারণ ইতিহাস সংরক্ষণের মানদণ্ডের চেয়ে অনেক উঁচু। তাহলে হাদিসকে ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত করলে কি এর গুরুত্ব কমে যায়?

উত্তর :
এ কথা সত্য যে মুহাদ্দিসগণ, বিশেষত ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম (রহ.), এমন মানদণ্ড স্থির করেছেন যা সাধারণ ইতিহাসের মানদণ্ডের তুলনায় বহু গুণ উচ্চতর। বরং সাধারণ ইতিহাস তো সে মানদণ্ডের অর্ধেক পর্যন্তও পৌঁছতে পারেনি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উচ্চ মানদণ্ডের কারণে কি হাদিস ইতিহাস নামক শ্রেণি থেকে বের হয়ে যায়? কখনোই না।

এটি বোঝার জন্য কিছু উদাহরণ দেখা যাক—

মানুষ ও শূকরের মাঝে অপার পার্থক্য আছে, তবুও দুজনেই প্রাণী-শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

মক্কা মুকাররমা ও অন্যান্য শহরের মাঝে পবিত্রতা ও মর্যাদার আকাশ-পাতাল তফাৎ আছে, তবু মক্কা নামেই এক শহর।

মাওলানা আবুল হাসান আলী নাদভী (রহ.) ও কোনো সাধারণ নাদভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় বিশাল ব্যবধান আছে, তবুও দুজনই ‘নাদভী’।

সারকথা : শ্রেণিভুক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে স্তর ও মর্যাদার পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই পার্থক্যের কারণে কোনো একটি বিষয় তার মূল শ্রেণি থেকে বেরিয়ে যায় না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন :
হাদিসকে ইতিহাস বললে কি তা শরিয়তের উৎস হিসেবে তার মর্যাদা হারায়?

উত্তর :
একেবারেই না। শরিয়তের উৎস তো রাসুল ﷺ-এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদন—এগুলোকে ইতিহাস বলা হচ্ছে না। বরং ইতিহাস শব্দটি প্রয়োগ করা হচ্ছে এগুলোর বর্ণনা, রিওয়ায়াত ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার ওপর।

অর্থাৎ, হাদিসকে ইতিহাস বলা মানে তার মৌলিক উৎসকে ছোট করা নয়; বরং এর স্থানান্তরের ধরণকে বোঝানো।

তৃতীয় প্রশ্ন :

কিছু লোক কোরআন ও হাদিসকে সমান মর্যাদায় রাখেন। তাঁরা বলেন—কোরআন হলো ‘ওহি মাতলু’ (যা তিলাওয়াত করা হয়) আর হাদিস হলো ‘ওহি গাইর মাতলু’ (যা তিলাওয়াত করা হয় না)। উভয়ই যেহেতু ওহি, তাহলে যেমন কোরআনকে ইতিহাস বলা যায় না, তেমনি হাদিসকেও বলা উচিত নয়। তাহলে কি হাদিসের মর্যাদা কমে যাবে না?

উত্তর :
এখানে সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য আছে। কোরআনকে প্রমাণ করার জন্য মানুষের বর্ণনার ওপর নির্ভর করতে হয় না। কোরআনের কোরআন হওয়াই তার প্রমাণ—এটি এক অতুলনীয়, অতিমানবীয় ও অনন্য গ্রন্থ।

কিন্তু রাসুল ﷺ-এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদন আমাদের কাছে পৌঁছেছে মানুষের বর্ণনার মাধ্যমে। আর যা মানুষের রিওয়ায়াত ও সংরক্ষণের ওপর নির্ভরশীল, তা পরিভাষায় ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত।

তবে এটাও স্পষ্ট থাকা দরকার—কোরআন সম্পর্কিত অনেক বিদ্যাও ইতিহাসের পরিধিতে পড়ে। যেমন—

কোরআনের তাফসির,

কোরআনের লেখা ও লিপির ইতিহাস,

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *