Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম : গরিব ঘরের নারীদের গয়নার যাকাত | ২৫|১২|২০

শিরোনাম : গরিব ঘরের নারীদের গয়নার যাকাত | ২৫|১২|২০

|| প্রশ্ন:

শ্রদ্ধেয় হাফিজ মাহমুদ কারিম সাহেব নিচের প্রশ্নটি পাঠিয়েছেন। প্রশ্নটি করেছে মৌ অঞ্চলের আনিস আহমাদ খাইরাবাদি। তিনি লিখেছেন:

শ্রদ্ধেয় ডক্টর মুহাম্মাদ আকরাম নদভি সাহেব, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আশা করি মহান আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন।

একটা ফিকহি-ব্যবহারিক মাসআলা নিয়ে বড় দ্বিধায় আছি। আপনার পথনির্দেশ খুব দরকার।
আমাদের সমাজে এমন অনেক মা-বোন আছেন, যাদের নিজস্ব কোনো রোজগার নেই। জীবনধারণের জন্য তারা পুরোপুরি স্বামী, ভাই বা ছেলের আয়ের ওপর নির্ভর করেন। টুকটাক কিছু আয়রোজগার যদি-বা থাকে, তা সংসারের রোজকার খরচেই ফুরিয়ে যায়। উল্টো ওই পুরুষরাই মা-বউ-বোনের যাকাতটা দিয়ে দেন।

অথচ দেখুন, এসব নারীর সম্বল বলতে হয়তো সামান্য সোনাদানা—ওই ধরুন এক-দেড় ভরি সোনা আর দু-একটা রুপোর মল বা নূপুর। ব্যস, এইটুকুর জন্যই তাদের ‘সাহিবু নিসাব’ বা ধনী বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে!

অথচ তাদের হাতে না আছে কানাকড়ি, না আছে কোনো বাঁধা আয়ের পথ।

আর গয়নাগুলোও তো তুলে রাখার জন্য নয়; একান্ত প্রয়োজন বা ব্যবহারের জন্যই রাখা।

আসল খটকাটা এখানেই—যিনি নিজেই অভাবী, তাকে দিয়েই কি না জোর করে যাকাত দেওয়ানো হচ্ছে! আর কার্যত সেই টাকাটা আসছে ঘরের পুরুষদের পকেট থেকেই।

গভীরভাবে ভাবলে মনে হয়, এটা যেন যাকাতের মূল মেজাজ আর শরিয়তের মাকসাদের বিপরীত। শরিয়ত তো চায় গরিবের সুবিধা। চায় তাদের বোঝা কমাতে।

নিবেদক,
আনিস আহমাদ খাইরাবাদ, মৌ।

|| উত্তর:

প্রশ্নটা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে আমাদের এই ভারত উপমহাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর গুরুত্ব অনেক। আনিস আহমাদ যে খটকাটার কথা তুলেছেন, তা একদম যথার্থ। শরিয়তের মাকসাদ বা উদ্দেশ্য, যাকাতের মূল স্পিরিট আর ফিকহি নীতি—সব দিক থেকেই বিষয়টা গভীর মনোযোগ দাবি করে।

গোড়াতেই একটা কথা পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। ইসলামে যাকাত ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো গরিব-দুখির বোঝা নামানো, তাকে অবলম্বন দেওয়া, তার প্রয়োজন মেটানো, সমাজে টাকাপয়সা নিয়ে ইনসাফ কায়েম করা।

যেসব নারী আসলেই অভাবী, যাদের আয়ের নিজস্ব কোনো উৎস নেই, যারা অন্যের ওপর নির্ভর করেন অর্থনৈতিক দিক থেকে—শরিয়তের চোখে তারা তো মূলত যাকাত পাওয়ার যোগ্য; যাকাত দেওয়ার কাতারে তারা পড়েন না।

আমাদের ভারত আর এই উপমহাদেশের আনাচকানাচে তাকালে একটা বাস্তবতা চোখে পড়বে।

গরিব আর মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরা যেটুকু সোনাদানা আগলে রাখেন, তা কি ব্যবসা বা মুনাফার জন্য? মোটেও না। ওটা তারা অনেক কষ্টে জমিয়ে রাখেন মেয়ের বিয়ে, কোনো বিপদ-আপদ বা নিজেদের মান-সম্মান রক্ষার কথা ভেবে। এখন তারা যদি সেই গয়না বেচে যাকাত দিতে যান, তবে কাল মেয়ের বিয়ে দেবেন কী করে?

এই কারণে দেখা যায়, গয়না থাকার পরেও তাদের অভাব মেটে না, রোজগারের পথও খোলে না; তারা সেই অভাবীই থেকে যান।

ফিকহের যুক্তিতেও কথাটা বেশ মজবুত—ব্যবহারের জন্য রাখা গয়নার ওপর যাকাত ওয়াজিব নয়। জুমহুর বা অধিকাংশ আলিম, অর্থাৎ মালিকি-শাফিয়ি-হাম্বালি মাজহাবের আলিমেরারা এটাই বলেন।

তাদের যুক্তি হলো, হাদিসে সোনা-রুপার ওপর যাকাতের যেসব নির্দেশ এসেছে, তা সাধারণ গয়নার বেলায় খাটে না।

মূলপাঠে (নস) যেসব শব্দ এসেছে—যেমন: ‘আল-ওয়ারিক’, ‘আর-রিক্কাহ’ কিংবা ‘আল-আওয়াকি’—আরবি ভাষা আর প্রথা অনুযায়ী এসব শব্দ দিয়ে তৈরি-করা মুদ্রা বা টাকাপয়সা (দিরহাম-দিনার) বোঝায়; পরার গয়না বোঝায় না।

ইমাম আবু উবাইদ কাসিম ইবনু সাল্লাম (রাহিমাহুল্লাহ) তো স্পষ্টই বলেছেন, আরবদের খাঁটি ও প্রচলিত ভাষায় ‘ওয়ারিক’ আর ‘আওয়াকি’ বলতে কেবল সেই দিরহাম বোঝাত যা নকশা করা এবং বাজারে চালু; গয়নাগাটিকে তারা এই নামে ডাকত না।

ইমাম ইবনু খুজাইমাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-ও পরিষ্কার করে দিয়েছেন, আরবি ভাষায় ‘ওয়ারিক’ বলতে ব্যবহারের গয়না বোঝায় না।

ইমাম শাওকানি (রাহিমাহুল্লাহ)-ও বিষয়টার ফয়সালা করেছেন। তিনি বলেছেন, যারা ‘ওয়ারিক’ বা ‘রিক্কাহ’ শব্দের দোহাই দিয়ে গয়নার যাকাত আবশ্যক বলেন, তাদের যুক্তি দুর্বল। কারণ, নির্ভরযোগ্য সব অভিধান ঘাঁটলে দেখা যায়, ওগুলো মুদ্রার নাম, গয়নার নয়। শব্দের মানেই বলে দিচ্ছে, গয়নায় যাকাত নেই।

সাহাবিদের আমল দেখলেও এই কথার সত্যতা মেলে।

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) জানিয়েছেন, অন্তত পাঁচজন বড় বড় সাহাবি—আনাস, জাবির, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার, আয়িশা এবং আসমা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)—গয়নার যাকাত দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না।

ইমাম ইবনু হাজম (রাহিমাহুল্লাহ)-ও সহিহ সনদের বরাতে এই কথাই বলেছেন হুবহু।

মা আয়িশার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কাজটা দেখলে বিষয়টি একদম দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। মুয়াত্তা ইমাম মালিক-এ এসেছে, তিনি তাঁর এতিম ভাতিজিদের লালনপালন করতেন। মেয়েগুলোর কিন্তু গয়নাগাটি ছিল। অথচ মা আয়িশা কখনোই সেসব গয়নার যাকাত দিতেন না।

আল্লামা মুহাম্মাদ আমিন শানকিতি (রাহিমাহুল্লাহ) এ নিয়ে চমৎকার একটা যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেন, মা আয়িশা তো এতিমের মালের যাকাত দেওয়ার পক্ষেই ছিলেন। এখন গয়নার ওপর যাকাত দেওয়া যদি জরুরি হতো, আর তিনি যদি সেই হুঁশিয়ারির কথা জানতেন, তবে কি তিনি এতিম বাচ্চাদের গয়নার যাকাত না দিয়ে পারতেন? এটা হতেই পারে না।

সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনু উমারের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমলও একই সাক্ষ্য দেয়। তিনি নিজের মেয়ে আর দাসীদের সোনার গয়না পরাতেন ঠিকই, কিন্তু কখনোই সেসবের যাকাত বের করতেন না।

এসব দলিল-প্রমাণের জোরে বলা যায়, যেসব গরিব নারীর সম্বল বলতে কেবল ব্যবহারের গয়না, যাদের আয়ের কোনো পাকা ব্যবস্থা নেই, যারা নিজের আর মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে গয়নাটুকু আগলে রেখেছেন—তাদের ওপর যাকাত ওয়াজিব নয়।

শরিয়তের পরিভাষায় তাদের ‘সাহিবু নিসাব’ বা ধনী বলা যাবে না। কারণ, তাদের এই গয়না তো বর্ধনশীল সম্পদ নয়; আর এটা এমন টাকাও নয় যা খরচ করে যাকাত দেওয়া সম্ভব।

তবে এই মা-বোনদের জন্য একটা নিরাপদ ও ভালো পরামর্শ হলো, গয়নাগুলো সিন্দুকে ফেলে না রেখে মাঝেমধ্যে ব্যবহার করুন। কোনো উৎসবে বা প্রয়োজনে পরুন। এতে বোঝা যাবে, এগুলো ব্যবসার পণ্য বা গুপ্তধন নয়, বরং শুধুই ব্যবহারের জিনিস।

এমনটা করলে জুমহুর বা অধিকাংশ ফকিহদের মতে তাদের ওপর আর যাকাত বর্তাবে না। তারা মনের খটকা দূর করে নিশ্চিন্তে এই সুযোগ বা ‘রুখসত’ গ্রহণ করতে পারবেন তখন।

সাঁটকথা, ইসলামি শরিয়ত ওই নারীকে গয়না থাকা সত্ত্বেও গরিবই মনে করে, যদি সেই গয়না তার মৌলিক প্রয়োজন, মান-সম্মান আর ভবিষ্যতের কঠিন বাস্তবতার রক্ষাকবচ হয়। এমন নারীর কাছ থেকে যাকাত আদায় করা শরিয়তের উদ্দেশ্যও নয়, ইনসাফের দাবিও নয়; আর অধিকাংশ আলেমের মতে তা জরুরিও নয়।

—————-

ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, শিক্ষা।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাসুদ শরীফ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7991

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *