শিরোনাম : ঋণ ও যাকাত: হিসাবের সঠিক নীতি
|১৬| মার্চ |২০২৬|
❖ প্রশ্ন
আসসালামু আলাইকুম শাইখ,
আমার একটি স্টুডেন্ট লোন আছে, যা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। পাশাপাশি আমার বাড়ির ওপর একটি মর্টগেজও রয়েছে। যাকাত হিসাব করার সময় এই দুটিকে কি ঋণ হিসেবে বিবেচনায় আনবো?
❖ উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নটি যাকাত হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। সেটি হলো, কারো ওপর বিদ্যমান ঋণ তার যাকাতের দায়কে কীভাবে প্রভাবিত করে। ইসলামের ফকিহগণ এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন, এবং তাদের আলোচনার সারকথা হলো: যে ঋণ বাস্তবিক অর্থে একজন মানুষের ওপর পরিশোধযোগ্য দায় হিসেবে বিদ্যমান, তা যাকাত হিসাবের সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যাকাত ফরজ হয় সেই সম্পদের ওপর, যার ওপর মানুষের পূর্ণ মালিকানা এবং সম্পূর্ণ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ থাকে। ফিকহের ভাষায় একে বলা হয় আল-মিলকুত-তাম্ম অর্থাৎ পূর্ণ মালিকানা। যদি কারো সম্পদের একটি অংশ ইতোমধ্যে অন্য কারো প্রাপ্য হয়ে থাকে (কারণ তা একটি বাধ্যতামূলক ঋণ হিসেবে পরিশোধ করতে হবে) তাহলে সেই অংশকে আর সম্পূর্ণভাবে তার নিজস্ব সম্পদ বলা যায় না। এ কারণেই ফকিহগণ বলেছেন, ঋণ যাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণকে কমিয়ে দেয়।
এর পেছনের যুক্তিটিও স্পষ্ট। যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত, সে তার হাতে থাকা সমস্ত সম্পদের ওপর অবাধ মালিকানা ভোগ করে না। কারণ এর একটি অংশ কার্যত ঋণদাতার অধিকারভুক্ত। আর যাকাত মূলত সেই সম্পদের ওপরই ফরজ হয়, যা মানুষের অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়। তাই যে সম্পদ ঋণ পরিশোধের জন্য নির্ধারিত, তা উদ্বৃত্ত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয় না এবং যাকাত হিসাবের সময় তা গণনায় ধরা হয়।
এই ভিত্তিতেই অধিকাংশ ফকিহ মত দিয়েছেন যে বৈধ ও বাধ্যতামূলক ঋণ যাকাত হিসাবের সময় বিবেচনায় নেওয়া উচিত। যদি কারো ওপর এমন কোনো ঋণ থাকে, যা তাকে পরিশোধ করতেই হবে, তবে সেই দায়কে যাকাত হিসাবের সময় স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এই নীতি সব ধরনের বাস্তব ও বৈধ আর্থিক দায়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
সুতরাং স্টুডেন্ট লোন, মর্টগেজ কিংবা এ ধরনের অন্যান্য আইনগত ও বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়, সবই সেই ঋণের অন্তর্ভুক্ত, যা যাকাত হিসাবের সময় বিবেচনায় আনা যেতে পারে। কারণ এগুলো এমন আর্থিক অঙ্গীকার, যা একজন ব্যক্তিকে পরিশোধ করতেই হবে। ফিকহি আলোচনাগুলোতেও এগুলোকে মানুষের নিট সম্পদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, এমন ঋণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে যাকাত হিসাবের পদ্ধতি হলো এই: প্রথমে একজন ব্যক্তি তার সব যাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। যেমন—সঞ্চয়, নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং অন্যান্য যাকাতযোগ্য সম্পদ। এরপর সেই মোট সম্পদ থেকে তার ওপর বিদ্যমান ঋণের পরিমাণ বিবেচনায় নেওয়া হবে। এরপর যদি অবশিষ্ট সম্পদ নিসাবের সীমায় পৌঁছে থাকে, তাহলে সেই অবশিষ্ট সম্পদের ওপর যাকাত আদায় করা হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন। শরিয়তের উদ্দেশ্য কখনোই মানুষের ওপর অযথা কষ্ট চাপিয়ে দেওয়া নয় কিংবা তাদেরকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বোঝার মধ্যে ফেলা নয়। বরং যাকাতের বিধান মানুষের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ঋণকে বিবেচনায় নেওয়ার মাধ্যমে ইসলামি শরিয়ত নিশ্চিত করেছে যে যাকাত কেবল সেই সম্পদের ওপরই ধার্য হবে, যা সত্যিকার অর্থেই মানুষের উদ্বৃত্ত সম্পদ হিসেবে তার কাছে বিদ্যমান।
সংক্ষেপে বলা যায়, যে কোনো বাস্তব ঋণ, যা একজন ব্যক্তির ওপর পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক, তা যাকাত হিসাবের সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে। এর মধ্যে স্টুডেন্ট লোন, মর্টগেজসহ অনুরূপ আর্থিক দায়সমূহও অন্তর্ভুক্ত। এসব দায় বিবেচনায় নেওয়ার পর যে সম্পদ বাস্তবিক অর্থে ব্যক্তির কাছে অবশিষ্ট থাকে, সেই সম্পদের ওপরই যাকাত গণনা করা হবে।
———-
ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, ইসলামি চিন্তাধারা,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8703