Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম : স্ত্রীর অধিকার ও গৃহকর্মের সীমানা ——

শিরোনাম : স্ত্রীর অধিকার ও গৃহকর্মের সীমানা
———-  

|| প্রশ্ন

আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ, সম্মানিত শাইখ।

আমার একটি জিজ্ঞাসা আছে, যা স্বামীর উপর স্ত্রীর হকসংক্রান্ত।

আমি শুনেছি, স্ত্রীর এমন মানের জীবিকা পাওয়ার অধিকার আছে—যেমনটি তিনি পিতৃকুলে পেয়েছিলেন। সে-কারণে যদি তিনি পরিচারিকা-পরিচারক দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে বড় হন, তবে স্বামীর জন্য তা সরবরাহ করা আবশ্যক। কিন্তু ধরুন, তারা এমন এক দেশে গমন করেন যেখানে গৃহকর্মীর ব্যাবস্থা সাধারণ নয়, বরং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা (ডিশওয়াশার, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি) ঘরকন্নাকে সহজ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় স্ত্রী যদি গৃহকর্মীর দাবিই জারি রাখেন, তাহলে কি সেটি তাঁর প্রকৃত অধিকার এবং স্বামীর অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হবে?

 
|| উত্তর

ওয়া আলায়কুমুস-সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আপনাকে আল্লাহ উত্তম প্রতিফল দান করুন এবং উপকারী জ্ঞান ও সঠিক বুঝে সমৃদ্ধ করুন।

আপনার উত্থাপিত বিষয়টি নফকাহ তথা স্ত্রীর আর্থিক ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত বৃহত্তর আলোচনার অন্তর্ভুক্ত, যেখানে ’উর্‌ফ (প্রচলিত রীতি), স্বামীর সক্ষমতা ও সামাজিক মানদণ্ড—এই তিনটি উপাদান মূল নির্ণায়ক। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, 

﴿لْيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا﴾

“যার সামর্থ্য আছে সে যেন তার সামর্থ্যানুযায়ী ব্যয় করে, আর যার রিজিক সীমিত, সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকেই ব্যয় করে; আল্লাহ কারও ওপর তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না।” (সূরা আত্-তালাক ৬৫:৭)

আরও বলেছেন, وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ —“তোমরা তাদের সঙ্গে সম্মানজনকভাবে (প্রচলিত রীতি মোতাবেক) বাস কর।” (সূরা আন্-নিসা ৪:১৯)

ফুকাহা এই প্রশ্নে ভিন্নমত পোষণ করেছেন যে, গৃহকর্ম করা স্ত্রীর ওপর মৌলিক দায়িত্ব কি না। অনেক আলিম বলেছেন, যদি কোনো নারী এমন পরিবারে লালিত-পালিত হন যেখানে তিনি গৃহকর্মে যুক্ত ছিলেন না এবং স্বামীর সাধ্য থাকে, তবে স্ত্রীর জন্য গৃহকর্ম-সহায়িকা রাখা স্বামীর কর্তব্য। তবে এ বিধান কোনো অপরিবর্তনীয় “গৃহকর্মীর অধিকার” ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং স্ত্রীর সামাজিক অবস্থান ও বসবাসকারী সমাজের স্বীকৃত রীতির ওপর নির্ভরশীল।

ফলে এ বিষয়টি সম্পূর্ণই ’উর্‌ফের সাথে সম্পর্কিত, যা দেশ, কাল ও সংস্কৃতিভেদে পরিবর্তিত হয়। সুপ্রতিষ্ঠিত কায়দা হল: “আদত(রীতি)ই আইনি দালিল।” আরেকটি কায়দা: “যে আহকাম রীতির ওপরে দাঁড়ায়, রীতি বদলালে আহকামও বদলায়।”

অতএব, যদি দম্পতি এমন সমাজে স্থানান্তরিত হন যেখানে স্বচ্ছল পরিবারগুলোও গৃহকর্মী রাখাকে আর স্বাভাবিক মনে করে না, এবং প্রযুক্তির উন্নয়নে গৃহকর্মের শ্রম যথেষ্ট লঘু হয়েছে, তখন ঐ সব আলিমের রায়—যারা গৃহকর্মী রাখাকে আবশ্যক বলেছিলেন—তাদের যুক্তির ভিত্তিটিই অনুপস্থিত হয়ে যায়।

এ পরিপ্রেক্ষিতে স্বামীর দায়িত্ব হলো—স্ত্রীর অতীত জীবনের প্রতিটি সুবিধা হুবহু পুনরুত্পাদন করা নয়; বরং যে সমাজে তাঁরা বসবাস করছেন সেই সমাজস্বীকৃত মান ও স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী ভরণ-পোষণ প্রদান করা এবং কুরআনের “মা‘রূফের সাথে সহাবস্থান” আদেশ পালন করা। সুতরাং স্ত্রীর শৈশবে গৃহকর্মী থাকা-না-থাকা একাই এমন স্থায়ী আইনি অধিকার সৃজন করে না, যা নতুন বাস্তবতায়ও অপরিবর্তনীয় থাকবে।

শরিয়তের মূল-আত্মা

এই আইনি সিদ্ধান্তে দাম্পত্য জীবনে সুহৃদতা ও সদাচরণের গুরুত্ব ফিকে হয়ে যায় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে ঘরে পরিবারকে সাহায্য করতেন; স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতাই শরিয়তের উচ্চতর উদ্দেশ্যগুলোর প্রতিফলন। স্ত্রী যদি অসুস্থতা, গর্ভাবস্থা, সন্তান পালনের কষ্ট, অক্ষমতা বা অতিরিক্ত গৃহস্থালির চাপে সত্যিকারের অসুবিধায় পড়েন, তবে স্বামীর পক্ষে নিজ হাতে সাহায্য করা বা সামর্থ্য অনুসারে সহায়িকা নিয়োগ করা ইহসান ও মু‘আমালা-বিল-মা‘রূফেরই একটি রূপ।

তেমনি, মাঝে-সাঝে গৃহকর্মীর সহযোগিতা দাম্পত্য-সম্প্রীতি বাড়ায় ও কষ্ট লাঘব করে—এটি আইনি বাধ্যবাধক না হলেও উত্তম আখলাক ও উদারতার কাজ, যার জন্য পুরস্কার আছে।

অবশেষে, ইসলামী বিবাহ কেবল অধিকার নিয়ে আদালতসদৃশ টানা-হেঁচড়ার ময়দান হতে নয়; বরং তা স্থিরতা (সুকুন), মহব্বত (মাওয়াদ্দাহ), দয়া (রাহমাহ) ও সৎকাজে পারস্পরিক সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। অতএব, দম্পতিরা এসব বিষয় আলাপ-আলোচনা ও পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করবেন—শুধু আইনি দাবিদাওয়া নয়, বরং যা পারিবারিক সাম্য, শরিয়তের উদ্দেশ্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অধিকতর রক্ষা করে সেদিকেই মনোযোগ দেবেন।

———-

ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, ফিকাহ, উসরাহ

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/9780

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *