যেদিন তুমি পরিশ্রমকে সাথি, সবরকে পাথেয়, ইখলাসকে প্রদীপ বানাবে, সেই দিনই জ্ঞান তোমার সহযাত্রী হবে; তখন আর কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে না—“আমরা কী করব?”—বরং যুগই তোমাকে জিজ্ঞেস করবে—“আমাদের কোন পথে চলা উচিত?”
যদি সত্যিই তুমি আল্লাহর কিতাবের হিকমত জনগণে পৌঁছে দিতে চাও, তবে দিন-রাত কুরআনের সঙ্গে জুড়ে দাও। কুরআনকে শুধুই তিলাওয়াতের বই ভাবো না; তাদাব্বুর, তাফাক্কুর, হিদায়াতের কিতাব ভেবে পড়ো। আয়াতে গভীর চিন্তা করো, তার নির্মিত শৃঙ্খলা ধরার চেষ্টায় থাকো, উদ্দেশ্য অনুধাবন করো—তোমার রব তোমাকে কী বলছেন!
সেসব তাফসির থেকে সতর্ক থাকো, যেখানে ইসরাঈলিয়াতের রূপকথা, ভিত্তিহীন কিসসা, বা পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের অকারণ পুনরুক্তি ঠাঁই পেয়েছে। এমন গ্রন্থ, যা ‘আল্লাহ কী চান’ বলার চেয়ে ‘কে কী বলেছেন’-এর ফিরিস্তি দিতেই ব্যস্ত, সেগুলো তোমাকে মূল হিদায়াত-স্রোত থেকে দূরে ফেলতে পারে। প্রথম মনোযোগ দাও আল্লাহর কালাম সরাসরি বুঝতে।
যদি হাদিস-গবেষণায় অগ্রসর হতে চাও, তবে আসল মসূয়াদে গভীর অধ্যয়ন করো। শুধু হাদিস পড়ে ক্ষান্ত থেকো না; রাওয়িদের অবস্থা বোঝো, ইলাল-হাদিস, আসনিদ-সংক্রান্ত সূক্ষ্মতা, মুহাদ্দিসিনের মানহাজ—এসব আয়ত্ত করো। এ-ই তো প্রকৃত মুহাদ্দিসদের পথ।
ভালো করে জেনে রাখো, শুধু কিতাবের ‘দাওরা’ করে বা করিয়ে কেউ মুহাদ্দিস হয় না। কেউ যদি চিকিৎসা, গণিত, পদার্থবিদ্যার কয়েকটা বই পড়ে ফেলে, সে কি তত্ক্ষণাৎ ডাক্তার, গণিতজ্ঞ, বিজ্ঞানী? না। তাহলে হাদিসের মতো সূক্ষ্ম বিদ্যা কি শুধু দাওরায় অর্জিত? দুঃখজনক, আজকাল দাওরাকেই বিদ্যার চূড়া ভেবে নেওয়া হয়েছে, অথচ বিদ্যার মানদণ্ড—গভীরতা, গবেষণা, ফিকহ ও ইসতিনবাত; কেবল পাঠ-পরিমাণ বা ইসনাদ বর্ণনা নয়।
যদি ফিকহ, ফতোয়া, কালাম-ইলমে জুড়তে চাও, তবে ক্ষমতাগুলো ব্যয় করো উম্মতকে জোড়ার কাজে, ভাঙার নয়। তোমার লক্ষ্য যেন মুসলিমকে কাফের ঘোষণা নয়, মানুষকে ইসলামের পথে ডাকা হয়। মতপার্থক্যে আগুন জ্বালানো নয়, হৃদয়ে মহব্বত সঞ্চারই হোক দাওয়াত।
মানুষকে সাহাবাদের প্রতি ‘অশ্লীল’ প্রমাণে জীবন গলিয়ে দেওয়ার বদলে, তাদের হৃদয়ে সাহাবাই কিরাম-এর ভালোবাসা, মহত্ব, অনুকরণ গড়ো। ঘৃণা নয়, ভালোবাসা; তাকফির নয়, দাওয়াত; লা’ন-তরজ না, হিতাকাঙ্ক্ষা; বদদোয়া নয়, দোয়া—এটাই নবীদের তরিকা, সালেহিনের মানহাজ; এ-ই পথ উম্মতকে আবার সম্মান, ঐক্য, জীবন দান করতে পারে।
মনে রেখো! উম্মত আজ এমন লোক চায় না, যারা কেবল বিতর্কের তালিকা লম্বা করে; প্রয়োজন তাদের, যারা কুরআন বোঝে, সুন্নাহ জীবিত করে, গবেষণায় বিদ্যা এগিয়ে, আখলাককে দাওয়াতের অলংকার বানায়, আর মানুষকে আল্লাহর কাছে টেনে আনে। এ পথ নিলে, তোমার জীবন জ্ঞানেও বরকতময় হবে, উম্মতের জন্য সম্পদ হবে, আর ইনশাআল্লাহ আখেরাতে মুক্তি ও সফলতার বাহন হবে।
—-
ক্যাটাগরি : শিক্ষা, উপদেশ, ইসলামি চিন্তাধারা,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/9705