Skip to main content

AkramNadwi

যাকাতের নিসাব ও সামাজিক ভারসাম্য।
|২৬|১২|২০২৫|

যাকাতের নিসাব ও সামাজিক ভারসাম্য।<br>|২৬|১২|২০২৫|<br>

|| প্রশ্ন:
সম্প্রতি আমি উর্দুতে একটি প্রবন্ধ লিখেছি, যেখানে যুক্তি দেখিয়েছি যে যাকাতের নিসাব নির্ধারণে রুপার পরিবর্তে সোনাকেই মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এর পরিপ্রেক্ষিতে, কুরআনের সুপরিচিত শিক্ষিকা ড. ফারহাত হাশমি আমাকে নিম্নোক্ত প্রশ্নটি পাঠিয়েছেন, যেখানে লেখা ছিলো:

“প্রিয় উস্তাজা জি,
সম্মানিত শাইখের উত্তরটি নিজেই অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও হিকমতে পরিপূর্ণ—আলহামদুলিল্লাহ। এখানে বিনীতভাবে দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করছি:
১) সরকার প্রতিবছর রুপার ভিত্তিতেই নিসাব ঘোষণা করে এবং ব্যাংকের মাধ্যমে যে যাকাত কর্তন করা হয়, সেটিও সেই নিসাব অনুযায়ী হিসাব করা হয়।
২) যদি সোনাকে নিসাবের ভিত্তি করা হয়, তাহলে বিপুলসংখ্যক যাকাতদাতা এর আওতার বাইরে চলে যাবে। অথচ অন্যদিকে দরিদ্র, মিসকিন এবং যাকাতের হকদার মানুষের সংখ্যা ও সংশ্লিষ্ট বাস্তবতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই ব্যবধান কীভাবে পূরণ হবে?”

|| উত্তর:
এই প্রশ্নগুলো ফিকহ, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলকে স্পর্শ করেছে। তাই এগুলোর জবাবও স্পষ্টতা ও ভারসাম্যের সঙ্গে দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথম বিষয়ে আসি। কোনো মুসলিম সরকার যখন আনুষ্ঠানিকভাবে নিসাব ঘোষণা করে এবং ব্যাংক কর্তনের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে যাকাত আদায়ের উদ্যোগ নেয়, তখন তা সিয়াসাহ শারইয়্যাহ অর্থাৎ জনশৃঙ্খলা ও সামষ্টিক কল্যাণের জন্য প্রয়োগিত প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়। এমন ব্যবস্থা কার্যকর হলে, ব্যক্তিগতভাবে ভিন্ন কোনো ফিকহি মত পোষণ করলেও সেই আদায় প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করা, অগ্রাহ্য করা বা অবৈধ ঘোষণা করার অধিকার কারও নেই। বাস্তব প্রয়োগে আনুগত্য রক্ষা করা জরুরি, যাতে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি না হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে চিন্তাশীল আলোচনা ও গবেষণার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। বরং আলেম সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের দায়িত্ব হলো যুক্তিসংগত, আন্তরিক ও দূরদর্শী পরামর্শ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, একটি মানদণ্ড গ্রহণের ফিকহি তাৎপর্য ও তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ব্যাখ্যা করে। বাস্তবায়নে আনুগত্য আর পরামর্শে নসিহত, এই দুইয়েরই শরিয়তে নিজস্ব ও স্বতন্ত্র স্থান রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে যাকাতের মৌলিক দর্শন স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি। যাকাতের উদ্দেশ্য কখনোই দরিদ্রের কাছ থেকে নিয়ে দরিদ্রের মধ্যেই বণ্টন করা নয়; বরং তা নেওয়া হয় ধনীদের কাছ থেকে এবং প্রদান করা হয় দরিদ্রদের। এটি সুপ্রতিষ্ঠিত সেই প্রসিদ্ধ হাদিসে, যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যাকাত সমাজের ধনীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে এবং তাদের অভাবীদের মাঝেই ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সুতরাং যাকাতের লক্ষ্য কেবল অর্থের প্রবাহ নয়; বরং অতিরিক্ত সম্পদের ন্যায়সঙ্গত স্থানান্তর, যারা সক্ষম, তাদের কাছ থেকে যারা অসক্ষম, তাদের দিকে।

আধুনিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যখন রুপাকে সর্বজনীন নিসাবের মানদণ্ড করা হয়, তখন রুপার মূল্যমানের তীব্র পতনের কারণে সেই সীমা অত্যন্ত নিচে নেমে আসে। এর ফল হলো, অসংখ্য মানুষ, যারা নিজেরাই মূল্যস্ফীতি, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তারাও যাকাতদাতা হিসেবে গণ্য হয়ে যান। বাস্তবে এরা অনেক সময় যাকাত গ্রহণের অধিক কাছাকাছি, যাকাত প্রদানের চেয়ে। এমন মানুষের ওপর যাকাতের বোঝা চাপানো তাদের সীমিত সম্পদকে আরও সংকুচিত করে এবং দারিদ্র্য লাঘবের পরিবর্তে তা গভীরতর হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে। এভাবে যে ব্যবস্থা কষ্ট লাঘবের জন্য প্রবর্তিত, সেটিই অনিচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট বাড়িয়ে তুলতে পারে।

আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণাও এখানে সংশোধন করা প্রয়োজন। অনেকেই মনে করেন, যাকাত ব্যবস্থা দারিদ্র্য সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্যই প্রণীত। বাস্তবে তা কখনোই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও, যখন ন্যায় ও তাকওয়া সর্বোচ্চ শিখরে, দরিদ্র মানুষ বিদ্যমান ছিল। যাকাত দারিদ্র্যকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করেনি, কিন্তু তার ভার লাঘব করেছে, হতাশা ও চরম অসহায়ত্ব রোধ করেছে এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা করেছে। যাকাতের ভূমিকা আদর্শবাদী কল্পলোক নির্মাণ নয়; বরং বাস্তব জীবনে ক্ষত সারানো, ভারসাম্য রক্ষা করা এবং মানবিক সম্মান সংরক্ষণ করা।

আজ বহু মুসলিম সমাজে দারিদ্র্যের স্থায়িত্ব তাই মূলত যাকাত ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়; বরং তার প্রয়োগের দুর্বলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার ফল। বড় সমস্যা হলো, অনেক ধনী মানুষ তাদের যাকাত সঠিকভাবে, সততার সঙ্গে বা নিয়মিত আদায় করেন না। আবার কেউ কেউ যাকাতকেই নিজেদের দায়িত্বের সর্বোচ্চ সীমা মনে করেন, অথচ তা আসলে ন্যূনতম কর্তব্য মাত্র। উপরন্তু, যাকাত একা দুর্বল অর্থনৈতিক নীতি, কর্মসংস্থানের স্বল্পতা এবং এমন টেকসই প্রকল্পের অভাবের ক্ষতিপূরণ দিতে পারে না, যা দরিদ্র মানুষকে মর্যাদার সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ করে দেয়।

ইসলাম সামাজিক কল্যাণের সম্পূর্ণ বোঝা কেবল যাকাতের কাঁধে চাপিয়ে দেয়নি। যাকাত যখন অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়, তখন স্বেচ্ছাদান নৈতিক ও ধর্মীয় প্রয়োজনে পরিণত হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, যাকাতের বাইরেও সম্পদের ওপর অধিকার রয়েছে। এই নীতিটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যখন ফরজ দায়িত্ব আদায়ের পরও প্রয়োজন রয়ে যায়। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রের ওপরও স্পষ্ট দায়িত্ব বর্তায়, সুদৃঢ় অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রকল্পে বিনিয়োগ করা এবং দরিদ্রদের এমনভাবে সক্ষম করে তোলা, যাতে তারা চিরস্থায়ী নির্ভরশীলতার বদলে স্বনির্ভর হতে পারে।

উপসংহারে বলা যায়, সরকার যখন নির্দিষ্ট কোনো নিসাবের ভিত্তিতে যাকাত সংগ্রহ করে, তখন ব্যক্তিগতভাবে ভিন্ন কোনো আলেমি মত থাকলেও সেই আদায় প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের কাছে চিন্তাশীল ও দূরদর্শী পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া বৈধই নয়, বরং অপরিহার্য। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রুপাকে সর্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করলে যাকাতের ভার এমন মানুষের ওপর এসে পড়ার ঝুঁকি থাকে, যারা প্রকৃত অর্থে ধনী নন, যা শরিয়তের মর্মের পরিপন্থী। যাকাত দারিদ্র্য লাঘব করে, তা সম্পূর্ণ নির্মূল করে না; ধনীদের সততার সঙ্গে যাকাত আদায়, উদার স্বেচ্ছাদান এবং ন্যায়সঙ্গত অর্থনৈতিক নীতিই মিলিতভাবে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন বোধ দান করুন, যা প্রজ্ঞায় প্রতিষ্ঠিত; এমন ন্যায় দান করুন, যা রহমতে স্নিগ্ধ; এবং এমন তাওফিক দিন, যাতে আমরা সম্পদের অধিকারগুলো এমনভাবে আদায় করতে পারি, যা কষ্ট বাড়ায় না, বরং প্রশান্তি আনে। আমিন।

 

———–

| ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, শিক্ষা, ইসলামি চিন্তাধারা।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8003

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *