পরিপূর্ণ সংস্কার-প্রকল্প।
আধুনিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই রচনার মূল ভাব হলো সমগ্র সমাজ-সংস্কার; এর ভেতরে বহুমুখী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইস্যু, পাশাপাশি ভাষাগত শৈলী ও প্রমাণমূলক যুক্তি-কাঠামোর ব্যাপক চর্চা রয়েছে। গ্রন্থে ইবনু মুকাফ্ফা রাষ্ট্রকে অবাস্তব কোন ধারণা নয়, বরং কর্মচারী, সৈন্য, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সমন্বিত বাস্তবকে মনে করেছেন।
রাষ্ট্র মানে মানুষের দৈনন্দিন জীবন—নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, অঞ্চল-শাসক, বিচারক, সীমান্তরক্ষী, রেকর্ড-রক্ষক, নাগরিকদের কাছ থেকে গৃহীত সম্পদ যা কল্যাণে ফিরে আসে—সবকিছুর সমষ্টি। তাই তিনি সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে বিশেষ গুরুত্ব দেন। আব্বাসীয় উত্থান ও স্থিতিশীলতায় সৈন্যদের ভূমিকা ছিল মৌলিক; কিন্তু বেতন ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তায় ভোগা সৈন্যদল কখনোই স্থায়ী শাসনের ভিত্তি হতে পারে না। ইবনু মুকাফ্ফার দৃষ্টি দূরদর্শী—সমস্যা ঘটার পর নয়, আগেভাগেই নিয়মের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করতে চান।
বিচারব্যবস্থাতেও তাঁর একই দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি লক্ষ করেন, বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রায়ের বৈচিত্র্য জনজীবনে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনতে পারে; তাই রাষ্ট্রের সার্বজনীন বিষয়গুলিতে নির্দিষ্ট মাত্রার একত্ব দরকার। একে কেবল তত্ত্বগত ফিকহি বিতর্ক হিসেবে নয়—রাজ্যযন্ত্রের নিয়মানুবর্তিতা হিসেবে দেখতে হবে। বিচারক-জনতার অধিকার ও দায় পরিস্কার জানা, শাসনাদেশ-বৈপরীত্য দূর করা—এগুলো তাঁর উদ্দেশ্য।
ইবনু মুকাফ্ফা জানতেন, সদিচ্ছা একা যথেষ্ট নয়। সৎ শাসক থাকলেও যদি পুরো প্রশাসনিক মেশিন দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তবে রাষ্ট্র চলবে না। ব্যক্তিগত পুণ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা—দুটি মিলেই পূর্ণ সংস্কার। তাই তিনি মানুষ ও নীতি, চরিত্র ও প্রশাসন—সবদিক একসঙ্গে আলোকপাত করেন।
খাজনা ও রাষ্ট্রীয় রাজস্ব-ব্যবস্থাও তাঁর আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র যা সংগ্রহ করে, তা কোনো আমির, সচিব অথবা প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রধান অবলম্বন। সুতরাং রাজস্ব আহরণ এমন পদ্ধতিতে হতে হবে, যা জনপদের উন্নয়ন টিকিয়ে রাখে, রাজস্বধারা অব্যাহত রাখে এবং জনগণকে জুলুম থেকে রক্ষা করে। এই চিন্তা স্পষ্ট করে—ইবনু মুকাফ্ফা রাজত্বকে রাজনৈতিক লোভ নয়, বাস্তব দায়িত্ব বলে গণ্য করেছেন।
তবে আমার দৃষ্টিতে রচনার গভীরতম অংশ হলো ‘খাসাস’ ও ‘আওয়ান’—অভিজাত সহযোগী বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণ। খলিফা যতই বুদ্ধিমান হন না কেন, তিনি সবকিছু নিজ চোখে দেখতে পারেন না; তাঁকে খবরাখবর দেওয়া, লিখন-পঠন, বিচার-সালিশ ও প্রদেশ-পরিচালনায় সহায়তা করার জন্য বিশ্বস্ত লোক প্রয়োজন। যদি তারা আমানত-দার ও হেকমত-সম্পন্ন হয়, তবে শাসকের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছায়; আর যদি কামনা-বাসনা ও লোভে ডুবে থাকে, তবে তারা সত্য গোপন করে, শাসকের নিকটতা নিজেদের সম্পদ ও ক্ষমতা-দখলের অস্ত্র বানায়। ইবনু মুকাফ্ফা এই প্রসঙ্গে জোরালো ভাষায় সমালোচনা করেছেন—অনেকে বংশমর্যাদা, জ্ঞান, রাষ্ট্রের জন্য কৃতিত্ব বা যোগ্যতা ছাড়াই কেবল লেখকত্ব বা দারবার-পরিচারক হওয়ার সুবাদে অসামান্য প্রভাব অর্জন করেছে।
এ চিত্রের সামাজিক তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। বিপদ সবসময় সীমান্তের শত্রুর থেকে আসে না; কখনো-বা আসে পাশের মসনদে বসা সেই ব্যক্তির হাত ধরে, যে তার মতটিকে শাসকের মত বানিয়ে ফেলে, নিজের লাভকে রাষ্ট্রের স্বার্থ বলে জাহির করে। তাই ইবনু মুকাফ্ফার রাজনৈতিক দৃষ্টিতে ‘সহযোগী-নির্বাচন’ নৈতিক প্রশ্ন ছাড়িয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের প্রশ্ন।
এই কারণেই “রিসালা ফি আস্-সাহাবা” কালের গণ্ডি ভেঙে আজও প্রাসঙ্গিক। ইবনু মুকাফ্ফার উত্থাপিত সমস্যা শুধুই আব্বাসীয়দের নয়; সর্বযুগের ক্ষমতার সমস্যা—শাসক কাকে বেছে নেবেন? সত্য কে তাকে জানাবে? তার সহযোগীদের কে নজরদারি করবে? ক্ষমতার নৈকট্য কীভাবে লোভ ও স্বৈরাচারে পরিণত হওয়া থেকে রোধ করা যাবে? কীভাবে সংস্কারকে ব্যক্তি-নির্ভর না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক করা যাবে?
সুতরাং এ রচনা কেবল রাজনৈতিক সাহিত্য নয়; বরং রাষ্ট্রচিন্তায় আরব মানস-উন্নয়নের এক সাক্ষ্য। ইবনু মুকাফ্ফা এমন এক সময়ে বেঁচেছিলেন, যখন ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তৃত হচ্ছিল, এর চাহিদাও বহুমুখী হচ্ছিল। বাড়তি ভূখণ্ড মানে দাফতরিক দায়-দায়িত্ব, গভর্নর, সেনাবাহিনী, বিচারক, কাতিব, রাজস্ব-ব্যবস্থা—সবকিছুর সুনির্দিষ্ট নিয়ম জরুরি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাহিত্যেও এমন এক মস্তিষ্ক দরকার ছিল, যে এই প্রশাসনিক অঙ্গগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, সুষ্ঠু কাঠামো ও সংস্থাগত রূপান্তর নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
ইবনু মুকাফ্ফার কৃতিত্ব কেবল তার ভাষার মাধুর্যে নয়; বরং ভাষার আড়ালে সে সময়ের পূর্ণাঙ্গ জীবনচিত্রের সচেতনতা। তিনি প্রমাণ করেছেন—সাহিত্য সমাজ-সমালোচনা ও সংস্কারের মাধ্যম হতে পারে। তাঁর গদ্য স্বচ্ছ; ভাবনা ভাষার আগে চলে, কখনো বা পাশাপাশি এগোয়; যুক্তি ধীরে-স্থিরে পাঠককে সঠিক উপসংহারে পৌঁছে দেয়। এ-পন্থা সমকালীন বহু গদ্য-রচনার তুলনায় স্বতন্ত্র; পরবর্তী যুগে