Skip to main content

AkramNadwi

তাকদির সম্পর্কে একটি প্রশ্ন ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/3850

بسم الله الرحمن الرحيم.

|| প্রশ্ন:
আমার ছোট বোন সাইমা আমাকে একটি প্রশ্ন লিখে পাঠিয়েছে:
“যার ভাগ্যে যা লিখে দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গেই তা ঘটতে হবে। তাহলে দোয়া করার প্রয়োজন কী? রিজিক যেটুকু ভাগ্যে নির্ধারিত, তা ভোগ না করে মৃত্যু আসতে পারে না। ধন-সম্পদও যেটুকু ভাগ্যে লেখা, সেটুকুই মিলবে। মৃত্যু যেভাবে আসার তা সেইভাবেই আসবে। তাহলে দোয়ায় কী চাইবো ?”

|| উত্তর :
তকদীর সম্পর্কে ভুল ধারণা বহু পুরনো। ইসলামপূর্ব যত ধর্ম ও দর্শন ছিল, সবখানে তকদীর নিয়ে বিভিন্ন ও বিপরীত মতামত বিদ্যমান ছিল। ইসলাম আসার পরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কিছু লোক তকদীর অস্বীকার করেছিল, তাদের “কাদরিয়া” বলা হয়। আবার কিছু লোক মানব ইচ্ছা ও স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিল, তাদের “জাবরিয়া” বলা হয়। এই দুই প্রবণতাই বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।

তবে, এই উম্মতের মধ্যে সবসময় এমন ব্যক্তিরা এবং তাদের অনুসারীরা বিদ্যমান ছিলেন যারা এই বিষয়ে মধ্যপন্থা ও নিরাপত্তার পথ অবলম্বন করেছেন। পরবর্তী অংশগুলোতে সেই মধ্যপন্থী মতামতের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে।

|| ভুলের কারণ

এই বিষয়টিতে এবং আল্লাহ সম্পর্কিত অন্যান্য বহু বিষয়ে ভুলের মূল কারণ হলো, সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা। কুরআন বারবার এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বলেছে, “ليس كمثله شيء” (তাঁর মতো কেউ বা কিছুই নেই)। তবুও মানুষ নিজেদের সীমিত বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর গুণাবলী, বৈশিষ্ট্য ও কার্যাবলীকে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করেছে।

এর ফলে অসংখ্য ভ্রান্ত ধারণার দরজা খুলে গেছে। যদি তারা নিজেদের অক্ষমতা ও অযোগ্যতার স্বীকারোক্তি করতো এবং বুঝে নিতো যে সীমাবদ্ধ মানুষ অসীমের সঠিক ধারণা করতে পারে না, তবে এমনটি ঘটত না। কিন্তু তারা তা করেনি। ফলে নিজেরাই বিভ্রান্ত হয়েছে এবং অন্যদেরও বিভ্রান্ত করেছে।

|| মূল বিষয়

তকদীরের বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে হলে একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। তা হলো, আল্লাহ তাআলাই আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাদের জন্য বিধি-বিধান নির্ধারণ করেছেন। মানুষ যে অন্যকে আদেশ-নির্দেশ দেয়, তারা তাদের সৃষ্টি করেনি। শুধুমাত্র আল্লাহই আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তার জ্ঞান, ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে আমাদের কল্যাণের সব দিক দেখাশোনা করেন। এটি তাঁর “রুবুবিয়্যাত” (প্রভুত্ব) এর বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন। একই সঙ্গে আল্লাহই একমাত্র হুকুমদাতা, যাকে আমরা “উলুহিয়্যাত” (উপাসনার অধিকারী) হিসেবে অভিহিত করি। রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাত ব্যাখ্যার মাধ্যমে তকদীরের বিষয়টি সহজে বোঝানোর চেষ্টা করা হবে।

রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব):

আল্লাহই একমাত্র প্রতিপালক এবং তিনি ছাড়া আর কেউ প্রতিপালক নয়। এটা সত্য যে, মানুষের বাহ্যিক দেহের উৎস তার পিতা-মাতা। আর এটাও সত্য যে, শাসকরা তাদের প্রজাদের দেখাশোনা করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সৃষ্টির এই যত্ন-পরিচর্যার কোনো অংশই আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

পিতা-মাতা আপনাকে সৃষ্টি করেনি। তারা আপনাকে চোখ, কান বা নাক দেয়নি। তারা আপনাকে হৃদয় বা বুদ্ধি দেয়নি। শাসকেরা মাটি তৈরি করেনি, সূর্য, চাঁদ বা বাতাস সৃষ্টি করেনি। এই মানুষগুলো আপনাকে যা-ই দিক না কেন, সেগুলোর সবকিছুর স্রষ্টা, তার কারণ ও ফলাফল সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। এমনকি পিতা-মাতা, রাজা বা শাসকদেরও সৃষ্টি করেছেন এবং দেখাশোনা করেন একমাত্র আল্লাহ।

আল্লাহ এই সবকিছু করতে তাঁর সীমাহীন জ্ঞান, ক্ষমতা ও প্রজ্ঞা ব্যবহার করেছেন। আমরা আল্লাহর জ্ঞান, ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার গভীরতা কখনো পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারি না।

আপনার দৈনন্দিন জীবনের কাজ বিশ্লেষণ করলে আপনি বুঝবেন, আপনি নিজে কিছুই করেন না। ধরুন, আপনি আপনার ছোট মেয়েকে বললেন, “এক কাপ চা বানিয়ে দাও।” সে বলল, “এটা তো খুব সহজ, আমি এখনই বানিয়ে দিচ্ছি।” কিছুক্ষণ পর সে চা বানিয়ে দিল। এখন একটু ভাবুন—

সে কি চায়ের পাতা বানিয়েছে?
সে কি পানি তৈরি করেছে?
সে কি দুধ বানিয়েছে?
সে কি চিনি তৈরি করেছে?
সে কি সেই হাত বানিয়েছে, যা দিয়ে চা বানানো হয়েছে?
সে কি সেই বুদ্ধি বানিয়েছে, যা দিয়ে চায়ের মিশ্রণ ঠিক করা হয়েছে?
সে কি সেই ইচ্ছাশক্তি বানিয়েছে, যা তাকে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে?
সে কি সেই মাটি বানিয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে সে কাজ করেছে?
সে কি আগুন সৃষ্টি করেছে?
সে কি আলো তৈরি করেছে?

এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর হবে— “না”।

এসব কিছুর স্রষ্টা, এবং তাদের মধ্যে সম্পর্ক ও সামঞ্জস্য স্থাপনের একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহ। অতীত, বর্তমান, এবং ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটেছে বা ঘটবে, সবই আল্লাহর জ্ঞান, ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার ফল।

তকদীর হলো রুবুবিয়্যাতের এই বাস্তবতার নাম। আর বান্দার কর্তব্য হলো এটি বোঝা এবং এর ওপর ঈমান আনা।

|| উলুহিয়্যাত

আল্লাহ তায়ালা সমগ্র সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের জন্য নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করেছেন। আমরা এখানে কেবল মানুষের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করব। মানুষের সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তাদের ইচ্ছাশক্তি, জ্ঞান এবং ক্ষমতা দান করেছেন। এ সমস্ত উপাদানের মাধ্যমেই মানুষ কাজ সম্পাদন করে থাকে।

|| রুবুবিয়াত ও উলুহিয়্যাতের সম্পর্ক:

রুবুবিয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রতি অসংখ্য অনুগ্রহ করেছেন। কিন্তু উলুহিয়্যাতের মাধ্যমে তিনি আরও বড় পুরস্কার প্রদান করতে চান। এ জন্য তিনি শর্ত রেখেছেন যে, মানুষকে তার ইচ্ছা ও কর্মকে আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী পরিচালিত করতে হবে। যারা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলবে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের পুরস্কার। আর যারা তার অবাধ্য হবে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি।

|| মানুষের দায়িত্ব ও আল্লাহর নির্দেশনা
আল্লাহ মানুষকে এমন কোনো নির্দেশ দেননি, যা তাদের সাধ্যের বাইরে। বিশ্বাস করা বা না করা, নামাজ আদায় করা বা না করা, নেক হতে চাওয়া বা না চাওয়া—এসব বিষয়ে মানুষকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

|| কর্মের গুরুত্ব
আল্লাহর কোনো নির্দেশ এলে, সেটি পালন করা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের ইচ্ছা ও শক্তি দিয়ে আমরা কাজ সম্পন্ন করি। সুতরাং, আমাদের সফলতা নির্ভর করে আমাদের কর্মের উপর। আল্লাহর আনুগত্য করলে আমাদেরই মঙ্গল, আর অবাধ্যতা করলে ক্ষতিগ্রস্তও আমরাই হব।

|| তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা):
আমাদের কর্ম ও ইচ্ছার পূর্ণতা আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। তাই আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, ভবিষ্যতের কোনো কাজের প্রসঙ্গে “ইন শা আল্লাহ” বলতে। এটি আমাদের তাওয়াক্কুলের প্রতীক।

|| দোয়া (আল্লাহর কাছে প্রার্থনা):
তাওয়াক্কুলের মতোই দোয়া হলো আমাদের কর্মের অংশ। দোয়ার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করি এবং স্বীকার করি যে, কোনো কিছু সম্পন্ন করতে আমাদের ইচ্ছা ও কর্ম যথেষ্ট নয়। আমরা আল্লাহর সাহায্য চাই এবং তার কাছে তৌফিক কামনা করি।

|| সারসংক্ষেপ:
তকদীরের প্রতি ঈমান আনার অর্থ হলো আল্লাহর পূর্ণ রুবুবিয়াতের উপর বিশ্বাস স্থাপন। আর ইচ্ছা ও কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর উলুহিয়্যাতকে মেনে নেওয়া। অর্থাৎ তিনি একমাত্র উপাস্য এবং একমাত্র শাসক। আল্লাহর আদেশ মানা এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। তাওয়াক্কুল ও দোয়া এই কর্মেরই অংশ।

|| চূড়ান্ত বার্তা :
আল্লাহ আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন, কিন্তু সেই স্বাধীনতাকে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে ব্যবহার করতে হবে। আর তকদীরের প্রতি বিশ্বাসের দাবি হলো, আমরা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করব এবং তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করব।
——-

মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা :
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *