https://t.me/DrAkramNadwi/6196
بسم الله الرحمن الرحيم.
——————–
|| প্রশ্ন:
ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, চিটাগং-এর অধ্যাপক ফজীলতুশ শায়খ ড. মুহাম্মদ নজমুল হক নদভী আমাকে লিখেছেন:
“পরম করুণাময়ের প্রশান্তি ও দোয়া রইল, আমরা আপনার পূর্ণ সুস্থতা ও দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণ কামনা করি, আমরাও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আমার একটি প্রশ্ন আছে:
জিনদের মধ্য থেকে কি কোনো নবী বা রাসূল প্রেরিত হয়েছেন? এবং হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি জিনদের প্রতিও প্রেরিত হয়েছিলেন?
আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর উত্তর কামনা করছি।”
|| উত্তর:
দুইটি বিষয়ের উত্তর নিম্নরূপ:
প্রথমত: জিনদের মধ্য থেকে কোনো নবী বা রাসূল প্রেরিত হওয়ার ব্যাপারে:
এই বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দুটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে।
আমার দৃষ্টিতে (আল্লাহই ভালো জানেন) যে মতটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়, তা হলো—
আল্লাহ তাআলা জিনদের মধ্য থেকেও তাদের জাতির মধ্য থেকে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন, যেমন তিনি মানুষদের মধ্য থেকে (বনী আদমদের মধ্য থেকে) নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন।
এটি হল কুরআনের মুফাসসির মুকাতিল ইবনে সুলাইমান এবং ইবনে জাহাক-এর মত।
ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীর জামি’উল বায়ান (খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১২১)-এ সূরা আনআম-এর এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তাঁদের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন:
“হে জিন ও মানব সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্য থেকে কি তোমাদের নিকট এমন রাসূল আসেনি, যারা তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ বর্ণনা করত?”
(সূরা আনআম, আয়াত ১৩০)
এই আয়াতের “منكم” (তোমাদের মধ্য থেকে) শব্দটি থেকে এইসব ইমামগণ বুঝেছেন যে, প্রতিটি গোষ্ঠীর মধ্য থেকেই তাদের কাছে রাসূল প্রেরিত হয়েছেন — অর্থাৎ জিনদের মধ্য থেকেও তাদের মধ্য থেকেই রাসূল পাঠানো হয়েছে, যেমন মানুষের মধ্য থেকেও তাদের মধ্য থেকে রাসূল পাঠানো হয়েছে।
এটিই ইমাম ইবনু হাযম আল-আন্দালুসী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মত, তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুহাল্লা (খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪৯৪)-তে বলেছেন:
“নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা জিনদের মধ্যেও তাদের মধ্য থেকেই নবী প্রেরণ করেছেন।”
তিনি উপরোক্ত আয়াতকেই এর সরাসরি দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এটি অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে, আয়াতটির বাহ্যিক ভাষা এই অভিমতের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। কেননা, এতে সম্বোধন করা হয়েছে জিন ও মানুষ উভয় সম্প্রদায়কে এবং বলা হয়েছে “তোমাদের মধ্য থেকে”, যা ভাষাগতভাবে সমজাতীয়তা বোঝায়— অর্থাৎ, প্রত্যেক শ্রেণির জন্য তাদের নিজের শ্রেণির মধ্য থেকেই রাসূল পাঠানো হয়েছে।
এ কথাও অস্পষ্ট নয় যে, কুরআনে জিনদের কোনো নবী বা রাসূলের নাম বা বিস্তারিত কাহিনি না থাকা এ কথা প্রমাণ করে না যে, তাদের মধ্যে আদৌ কেউ প্রেরিত হয়নি।
কারণ কুরআনে বহু জাতির ঘটনার বিশদ বিবরণ উল্লেখ করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত: হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জিনদের প্রতি প্রেরিত হওয়ার বিষয়টি:
প্রাচীন ও সমসাময়িক অধিকাংশ আলেমের মত হলো—
নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয় শ্রেণির ( মানুষ ও জিন) প্রতি প্রেরিত হয়েছেন, এবং তাঁর রিসালাত (বার্তা ও নবুয়ত) প্রত্যেক দায়িত্বশীল সৃষ্টির জন্যই সাধারণ ও সর্বজনীন।
যদিও আমি স্বীকার করি, এটি অধিকাংশ আলেমের অভিমত,
তবু আমার ঝোঁক এমন এক ভিন্ন মতের দিকে, যা এই প্রচলিত মতের তুলনায় দুর্বল বলে ধরা হয়।
আমার দৃষ্টিতে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু মানুষ (ইনসান),
তাই কুরআনের যে মূলনীতি রয়েছে— রাসূল অবশ্যই তাদেরই মধ্য থেকে হতে হবে যাদের প্রতি তিনি প্রেরিত হবেন— সেটি এখানে প্রযোজ্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আপনার পূর্বে আমি জনপদবাসীদের মধ্য থেকেই পুরুষদেরকে রাসূলরূপে প্রেরণ করেছি, যাঁদের প্রতি আমি ওহি করতাম।”
(সূরা ইউসুফ, আয়াত ১০৯)
আরও বলেন:
“আর যদি আমি তাকে (রাসূলকে) ফিরিশতা বানাতাম, তবে তাকেও মানুষ রূপেই করতাম।”
(সূরা আল-আনআম, আয়াত ৯)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে,
রাসূলের জন্য এটি শর্ত— তিনি যেন তাদের মধ্য থেকে হন, যাদের প্রতি তিনি প্রেরিত হবেন— যেন তারা তাঁর সঙ্গে আত্মীয়তা অনুভব করে, তাঁর ভাষা ও কথা বুঝতে পারে এবং তাঁর দাওয়াতের সঙ্গে আন্তরিকতা গড়ে তোলে।
এটি সাধারণভাবে ইনসান ও জিনদের মাঝে দুর্লভ,
কারণ এ দুই জাতির মাঝে প্রকৃতি, গঠন ও বুঝশক্তির দিক থেকে পার্থক্য আছে।
এটিও জানা জরুরি যে—
মানুষজাতি থেকে কোনো রাসূলের প্রতি জিনদের ঈমান আনার জন্য এমন সরাসরি প্রেরণ প্রয়োজন হয় না।
বরং যার নিকট দাওয়াত পৌঁছে গেছে, তার জন্য রাসূলদের প্রতি ঈমান আনা ফরজ—এমনকি যদি সেই রাসূল তার প্রতি সরাসরি প্রেরিত না হন।
এ কথার দলিল কুরআনেই আছে। যেমন:
জিনরা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি ঈমান এনেছিল, তাদের এই উক্তি দ্বারা বোঝা যায়:
“নিশ্চয়ই আমরা এক কিতাব শুনেছি যা মূসার পর অবতীর্ণ হয়েছে।”
(সূরা আহকাফ, আয়াত ৩০)
তদ্রূপ, তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতিও ঈমান এনেছে, যখন তারা কুরআন তিলাওয়াত শুনেছিল। তখন তারা বলেছিল:
“এটি সঠিক পথের দিশা দেয়, তাই আমরা এতে ঈমান এনেছি।”
(সূরা আল-জিন, আয়াত ২)
সুতরাং,
শোনার মাধ্যমে হিদায়াত প্রাপ্তি ও ঈমান গ্রহণের জন্য সরাসরি প্রেরণের প্রয়োজন হয় না।
এটি হয় হুজ্জত প্রতিষ্ঠা ও দাওয়াত পৌঁছানোর মাধ্যমে।
কুরআনে শুধুমাত্র দুটি স্থানে জিনদের পক্ষ থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কুরআন শোনা উল্লেখ করা হয়েছে।
এটিকে এমন একটি শক্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না, যাতে বলা যায় যে,
তিনি জিনদের প্রতিও সরাসরি ও স্বতন্ত্রভাবে প্রেরিত হয়েছেন।
যদি তিনি জিনদের মধ্যেও এমনভাবে প্রেরিত হতেন, যেমনভাবে তিনি মানুষের মধ্যে প্রেরিত হয়েছেন,
তবে তা বোঝাত যে, তিনি তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতেন,
তাঁদেরকে দাওয়াত দিতেন যেমন নিজের জাতিকে দিতেন,
তাঁদের মধ্যে মিলেমিশে থাকতেন,
তাঁদের অবিশ্বাসীদের সঙ্গে তর্ক, বিরোধ ও শত্রুতার সম্মুখীন হতেন,
আর তাঁদের মাঝেও তাঁর নানা ঘটনাবলি ঘটত—
যেমন ঘটেছিল তাঁর জীবনে বদর, উহুদ, হুনাইন এবং অন্যান্য গাযওয়াতের সময়।
কিন্তু কুরআন এসবের কিছুই উল্লেখ করেনি।
বরং শুধু দুই জায়গায় জিনদের কুরআন শোনার ঘটনাই এসেছে,
কিন্তু কোথাও এমন কিছু নেই যা বোঝায় যে নবী তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘ মুলাকাত, দাওয়াত, তর্ক বা দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন—
যেমন তিনি কাফির, মুনাফিক ও আহলে কিতাবদের সঙ্গে করেছিলেন।
এই সবকিছুই ইঙ্গিত করে যে, জিনদের ঈমান ছিল অনুসরণমূলক, মৌলিক নয়—
অর্থাৎ, এমন এক রাসূলের দাওয়াত পৌঁছার পর তাঁরা ঈমান এনেছে,
যিনি মূলত অন্য জাতির (মানুষের) জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন,
তাঁদের নিজেদের জন্য সরাসরি প্রেরিত হননি।
এটাই আমার অভিমত।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
———————
✍ মূল : ড. আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড, ইউকে।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা : মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।