শিরোনাম: শয়তানের প্রতারণা: আত্মিক সজাগতা, আত্মপ্রবঞ্চনা ও ইখলাসের অনুসন্ধান
—–
ড. মোহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শয়তান আল্লাহ্র নিকট মানবজাতিকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য ওঁৎ পেতে বসার অনুমতি চেয়েছিল। আল্লাহ্ তাকে সে অনুমতি দেন। কাজেই মুমিনরা যখন উপলব্ধি করে যে তারা প্রলোভিত হয়েছে, এমনকি কিছুটা পথভ্রষ্টও হয়েছে, তখন তাদের অত্যধিক বিভ্রান্ত বা ভগ্ন-হৃদয় হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—তিনি মুমিনদের কর্মসমূহ সংশোধন করে দেবেন এবং তাদের গোনাহ মাফ করবেন। এখান থেকে আমরা শিখি, যেমন মন্দ কাজে প্রলুব্ধ হওয়া সম্ভব, তেমনি সৎকাজও ভুল উদ্দেশ্য কিংবা ভ্রান্ত ফলাফলের আশায় করা যেতে পারে। প্রকৃত নিরাপত্তা কেবল আল্লাহ্র ক্ষমার উপর নির্ভরশীলতা, তাঁর তত্ত্বাবধান ও করুণার উপর ভরসা, আর অনুতপ্ত হয়ে দোয়া-মুনাজাতে তাঁর শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগের ভিতরেই নিহিত।
এ ছাড়াও, সৎকাজে বিনয় ও সংযম একধরনের নিরাপত্তা এনে দেয়, কারণ আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সুপরামর্শই হল—সৎকাজ অল্প করো, তবে নিয়মিত করো। অথচ মানুষ প্রায়ই নাটকীয় সব ইবাদত, দান-খয়রাত, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিশ্রুতির প্রতি আকৃষ্ট হয়। এ-জাতীয় কাজ মানুষকে বা দর্শকদের তাক লাগাতে পারে, কিন্তু আল্লাহ্কে প্রভাবিত করার চেষ্টা অবাস্তব—আল্লাহ্ দৃশ্যাবলীতে মুগ্ধ হন না। তাঁর কাছে দামী হল আন্তরিকতা, আনুগত্য ও যে অন্তরাবস্থা থেকে কর্ম বেরিয়ে আসে।
এই পর্যবেক্ষণই হানাবলি আলিম ও খতিব ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.)-র প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘তালবীস ইব্লিস’-এ প্রবেশের উপযুক্ত দ্বার খুলে দেয়। বইটির কেন্দ্রবিন্দু বাহ্যিকভাবে সরল, অথচ বৌদ্ধিকভাবে গভীর: শয়তান কীভাবে মানুষকে সত্য ছেড়ে ভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেয়, তবু তাদেরকে এই বিশ্বাসেই রাখে যে তারা এখনো সত্যের অনুসন্ধানেই আছে? ইবনুল জাওযীর উত্তর—শয়তানের সবচেয়ে কার্যকর প্রতারণা হল মানুষকে প্রকাশ্যে ধর্ম ত্যাগে প্ররোচিত করা নয়; বরং তার ধর্মবোধকে বিকৃত করা, নিয়তকে দুষিত করা, গৌণকে বাড়িয়ে দেখানো, মূলকে খাটো করা, আর ভুলকেই সত্যরূপে উপস্থাপন করা।
‘তালবীস’ শব্দের অর্থই ছদ্মবেশে আবৃত করা, গুলিয়ে ফেলা, এক জিনিসকে আরেক রূপে সাজানো। সুতরাং গ্রন্থটি কেবল প্রচলিত অর্থে প্রলোভন নয়, নৈতিক-আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা করে। শয়তান সবসময় অপকর্মকে চোখ-ধাঁধানো রূপে হাজির করে না; সে নেককাজের সঙ্গেই লেগে থেকে তার উদ্দেশ্য, আনুপাতিকতা কিংবা পরিণামকে আড়ম্বরপূর্ণভাবে বিকৃত করতে পারে। ইবাদত হয়ে যায় আত্মপ্রদর্শনের মাধ্যম; জ্ঞানার্জন পরিণত হয় দম্ভে; জুহ্দে জন্মায় শ্রেষ্ঠত্ববোধ; সাহস রূপ নেয় গোঁয়ার্তুমিতে; আর ধর্মীয় উন্মাদনা গড়ায় চরমপন্থায়।
ইবনুল জাওযীর বিশ্লেষণের এটাই সর্বাধিক তীক্ষ্ণ দিক—আত্মিক বিপদের শীর্ষে সব সময় সৎকাজ পরিত্যাগ নেই, বরং সৎকাজের ভেতরকার বিকৃতি। কেউ নামাজ, রোজা, সদকা, ইলম, দাওয়াত বা কোরবানির কাজ করলেও, যদি নিয়ত কলুষিত হয়, প্রতারণার ফাঁদ তার জন্য উন্মুক্ত থাকে। কাজের বাহ্যিক অবয়ব নিজে-নিজে তার আধ্যাত্মিক মূল্য ঠিক করে না; একই কাজ দুই ব্যক্তি করতে পারেন, আল্লাহ্র দরবারে যার গুরুত্ব নিয়ত, আন্তরিকতা, সঠিক উপলব্ধি ও পরিণামের উপর নির্ভর করে ভিন্ন-ভিন্ন হয়।
ফলে নিয়তের প্রশ্নটি গ্রন্থটির কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করে। ইবনুল জাওযী বারবার পাঠকের দৃষ্টি বাহ্যিক আচার থেকে সরিয়ে অন্তর্দেহের দিকে ফেরান। কাজটি কেন করা হচ্ছে? আল্লাহ্র জন্য, নাকি মানুষের বাহবা কুড়াতে? জ্ঞান-অনুসন্ধান কি সত্য-অন্বেষণের তাড়নায়, নাকি পণ্ডিতখ্যাতি হাসিলের আশায়? দান কি দয়া ও আনুগত্যের প্রকাশ, নাকি সামাজিক মর্যাদা গড়ার সুযোগ? ইবাদত কি দাসত্ব, নাকি নিজ পুণ্যের গবেষ্ঠ মুগ্ধচোখে নিরীক্ষার উপলক্ষ?
এ-ধরনের প্রশ্ন রিয়া-র সূক্ষ্মতা উন্মোচিত করে। রিয়া স্পর্শ করে সেসব কাজকেই, যেগুলো সাধারণত পুণ্যময় গণ্য হয়। যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে ভোগ-বিলাসে তৎপর, সে জানে সে দুনিয়া চাইছে; কিন্তু যে ব্যক্তি ধর্মীয় খ্যাতির পেছনে ছুটছে, সে ভেবেই বসে—সে আল্লাহ্কেই চাইছে! অহংকার তাই ধর্মীয় শব্দভাণ্ডার ও আচরণের আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে। ইবনুল জাওযীর সতর্কবার্তা তাই শুধু খোলাখুলি পাপীদের জন্য নয়, বরং প্রধানত তাদের জন্য, যারা নিজেদের ধর্মপরায়ণ ভাবেন।
গ্রন্থটি এভাবে আত্মপ্রবঞ্চনার গভীর সমালোচনা গড়ে তোলে। মানুষ আশ্চর্য ক্ষমতায় নিজের খেয়ালকে যুক্তিসিদ্ধ করে তোলে। ক্রোধকে বলে ধর্মীয় গায়রাহ, একগুঁয়েকে বলে আপসহীন নীতি, অতি তর্ককে বলে গভীর বুদ্ধিবৃত্তি, নিঃসঙ্গতাকে বলে জুহ্দ, কঠোরতাকে বলে দীনি তাওয়াক্কুল, আর সুনামের লালসাকে বলে হকের খিদমত। এসব ব্যাখ্যা অভ্যাসে পরিণত হলে মানুষ নিজের উদ্দেশ্য আর সঠিকভাবে চিনতে পারে না।
এ কারণেই কেবলমাত্র ধর্মীয় জ্ঞান অপরিহার্য হলেও যথেষ্ট নয়। বরং জ্ঞান নিজেই ফিতনায় রূপ নিতে পারে। একজন আলেম তার