শিরোনাম: মানুষের স্বাধীনতা ও পছন্দ
—–
ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
২৭ আগস্ট ২০২৬
মানুষের জীবন বাহ্যত ঘটনাপ্রবাহের এক ছায়াপথ, কিন্তু গভীরে उतरলে দেখা যায়—জীবন আসলে ক্রমাগত নির্বাচনের আরেক নাম। প্রতিটি মুহূর্তে মানুষ কোনো-না-কোনো দ্বিধাবিভাজকে দাঁড়িয়ে থাকে। কখনো সামনে থাকে দুটি পথ, কখনো অসংখ্য; কখনো সিদ্ধান্ত সহজ, কখনো সঠিক-ভুল, উপকারী-অপকারী, তাত্ক্ষণিক লাভ ও সুদূর-মেয়াদি কল্যাণের ভেদরেখা চেনা দুরূহ হয়ে ওঠে। কিন্তু এক বাস্তবতা থেকে সে পালাতে পারে না—নির্বাচন এড়িয়ে থাকা যায় না। নীরব থাকা-ও এক নির্বাচন, অপেক্ষা করাও, কোনো সুযোগ ছেড়ে দেওয়াও, এমনকি অন্যকে নিজের বদলে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়াও।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ কেবল জীবনযাপন করছে না, নিজের প্রত্যেক নির্বাচনের মাধ্যমে জীবনকে নির্মাণও করছে। তার শিক্ষা, পেশা, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, অভ্যাস, অগ্রাধিকার, চিন্তা ও নৈতিক রায় মিলিত হয়ে গড়ে তোলে ব্যক্তিত্ব। মানুষ নিজেকে নিয়ে যা ভাবে, তার চেয়েও অনেক বেশি নির্ধারক তার ধারাবাহিক নির্বাচনসমষ্টি। শেষাবধি আমরা হয়ে উঠি তাই-ই, যা আমরা বারবার বেছে নিই।
যদি জীবন নির্বাচন-নির্ভর হয় তবে পরের—এবং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ—প্রশ্ন: সঠিক নির্বাচন কীভাবে করা যায়? প্রতিটি মানুষ সিদ্ধান্ত তো নেয়ই, কিন্তু সবার সিদ্ধান্ত সঠিক হয় না। সুতরাং মানবজীবনের আসল সঙ্কট বিকল্পের স্ফীতি নয়, সেগুলোর মাঝে সঠিকটিকে শনাক্ত করা। স্বাধীনতা পথের দিশা দেয়, কিন্তু গন্তব্যের নিশ্চয়তা দেয় না; সেখানে পৌঁছতে হলে বুঝতে হয়, কোন পথ গ্রহণীয়।
সমকালীন মানুষের জন্য এই সঙ্কট আরও জটিল, কারণ আজ তার সামনে বিকল্পের নীলাকাশ অতীতের চেয়ে বহুগুণ প্রশস্ত। একজন তরুণ সকালে চোখ মেলেই স্মার্টফোনের মাধ্যমে এমন এক দুনিয়ায় প্রবেশ করে, যেখানে কেবল কয়েক সেকেন্ডে সংবাদ, ভিডিও, মতামত, বিজ্ঞাপন, বিনোদন, শিক্ষা—হাজারো সম্ভাবনা বেরিয়ে আসে। সে স্থির করবে—পড়বে, নাকি সংক্ষিপ্ত ভিডিও দেখবে; নতুন দক্ষতা রপ্ত করবে, নাকি কেবল সময় কাটাবে; কোন সংবাদ বিশ্বাস করবে এবং কোনটি উপেক্ষা করবে। স্মার্টফোন আর নিছক যন্ত্র নয়; তা আধুনিক মানুষের সামনে নিরবচ্ছিন্ন নির্বাচনের একটি মহাবিশ্ব উন্মোচিত করে।
এ কারণেই আমাদের কালের সঙ্কট কেবল তথ্য-ঘাটতি নয়; তথ্য-বন্যাও সমান বড় সমস্যা। এক সময় কোনো বিষয় জানতে বইয়ের পাতা উল্টাতে হতো; আজ কয়েক সেকেন্ডেই হাজারো প্রবন্ধ, ভিডিও, মতামত হাজির। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিস্থিতিকে আরো রূপান্তরিত করেছে। প্রশ্ন এখন শুধু—“আমি কী জানি?”—নয়; বরং—“আমার সামনে যা আসছে, তার কোনোটির উপর আস্থা রাখব, কীভাবে যাচাই করব, আর ঐ জ্ঞানের ভিত্তিতে কী সিদ্ধান্ত নেব?”
এখান থেকেই মানবজীবনের মৌলিক তত্ত্ব স্পষ্ট হয়—সঠিক নির্বাচনের পূর্বশর্ত সঠিক চিন্তা।
সঠিক চিন্তার অর্থ এই নয় যে মানুষ প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর জানে; বরং সে প্রশ্নটিকে যথাযথ দৃষ্টিতে দেখার ও বিষয়টিকে প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটে বৃদ্ধিবিবেচনা করার ক্ষমতা অর্জন করে। অধিকাংশ ভুল সিদ্ধান্ত তথ্য-ঘাটতি নয়, ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির ফল। কখনো মানুষ প্রশ্নটাই ভুল করে, ফলে সঠিক উত্তরও তাকে সঠিক গন্তব্যে নিয়ে যায় না। যেমন কেউ জিজ্ঞেস করে—“আমি বেশি টাকা কীভাবে উপার্জন করব?”—কিন্তু সম্ভবত মৌলিক প্রশ্ন হওয়া উচিত—“আমি কত আয় চাই, যাতে সম্মানজনক, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল জীবন যাপন করতে পারি?” প্রথম প্রশ্ন তাকে অনন্ত লাভ-দৌড়ে নিক্ষেপ করতে পারে, আর দ্বিতীয়টি তাকে প্রয়োজন, অগ্রাধিকার ও জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে পাই-পারে ভাবতে বাধ্য করে।
একইভাবে কোনো তরুণ বলে—“আমি কীভাবে বিখ্যাত হব?”—কিন্তু হয়তো বড় প্রশ্ন—“আমি কীভাবে মূল্যবান মানুষ হব?” খ্যাতি অন্যের দৃষ্টিতে মর্যাদা আনে, আর মূল্য আসে কাজ, চরিত্র, ও উপযোগিতায়। প্রশ্ন ভুল হলে মানুষ সারাজীবন সঠিক উত্তর খুঁজেও ভুল পথে হাঁটতে পারে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও এ বিভেদ দৃষ্টিগোচর। একজন শিক্ষার্থীর সামনে বিকল্প—সে কি শুধু পরীক্ষার ভালো নম্বরের জন্য পড়বে, না কি বিষয়টিকে গভীরভাবে বুঝবে, প্রশ্ন তুলবে, গবেষণা করবে, ও সমালোচনামূলক চিন্তা গড়বে? দুটো পথেই হয়তো সাফল্য আসবে, কিন্তু ফল আলাদা হবে। এক হাতে থাকবে সনদ, আরেক হাতে সনদের পাশাপাশি বিচারশক্তি, অনুধাবন ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা। পার্থক্য জ্ঞানের পরিমাণে নয়, বরং শিক্ষার্থী তার শিক্ষার লক্ষ্য সম্পর্কে কী নির্বাচন করেছে—সেটিতে।
পেশাগত জীবনেও প্রশ্ন একই। এক তরুণের সামনে দুটি চাকরি—প্রথমটির বেতন বেশি, তবে কাজটি তার মৌলিক মূল্যবোধের বিরোধী; দ্বিতীয়টির আয় কম, কিন্তু শেখা, সৃজন ও সেবার সুযোগ বেশি। যদি শুধু তাত্ক্ষণিক আয়কে মানদণ্ড বানায়, এক সিদ্ধান্ত আসবে; যদি সমগ্র জীবনের গন্তব্য, মানসিক প্রশান্তি, ব্যক্তিত্বনির্মাণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনায় আনে, অন্য সিদ্ধান্ত হবে। সুতরাং ভালো সিদ্ধান্ত কেবল—“আমি এখন কী পাচ্ছি?”—প্রশ্নে থামে না; বরং—“এই নির্বাচন