Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম: অন্যকে ভ্রান্ত বলে দোষারোপ করতে এত আনন্দ

শিরোনাম: অন্যকে ভ্রান্ত বলে দোষারোপ করতে এত আনন্দ কেন?
—–
ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভি
অক্সফোর্ড
৮/৮/২০২৬

আল্লাহ মানুষকে বিচিত্র স্বাদ ও রুচি দান করেছেন। কারও কাব্যে আনন্দ, কারও শিকারে, কারও রাজনীতিতে, কেউ আবার অন্যের ত্রুটি অন্বেষণে মশগুল। আর কিছু ‘সৌভাগ্যবান’ তো এমনও আছে, যাদের কাছে মানুষকে ‘গোমরাহ’ বলে ফতোয়া ঝাড়ার যে স্বাদ, তা আর কোনো কাজেই মেলে না।

কাউকে গোমরাহ বলা নিজেই এক শিল্প; আর এ শিল্প যদি কোনো ফতোয়াদারের হাতে পড়ে, তবে জিহ্বা তলোয়ার, অভিযোগ যূথবদ্ধ তীর, আর সামনাসামনি বসা মুসলমান হয়ে যায় নিছক লক্ষ্যবস্তু।

একদিন হুজুর‐এ‐মুফতি আসলেন। স্বাভাবিক নিয়মে কয়েকজনকে গোমরাহ ঘোষণা করলেন। এমন নিশ্চয়তার সুর যেন আসমানের সব দিক থেকে ফেরেশতারা সীলমোহর মেরে প্রত্যয়নপত্র হাতে তুলে দিয়ে গেছেন যে, হুজুরের ঘোষিত সব লোকই পথভ্রষ্ট।

আমি বললাম, ‘হুজুর! মুসলমানদের এতই গোমরাহ বলতে ইচ্ছে হয়, অন্তত আগেই ওদের জিজ্ঞেস তো করুন—হয়তো আপনার আরোপ করা কথাগুলি তারা মোটেই বিশ্বাস করে না।’

মুফতি সাহেব এমন দৃষ্টিতে তাকালেন—আধাআধি বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রদ্ধাবোধ, আধাআধি ইঙ্গিত যে এখন জ্ঞানের আরেক স্রোত বইবে। বললেন, ‘কত বছর ধরে আমি ওদের গোমরাহ বলছি, এখনও কোনো জবাব আসেনি। এই তো খাঁটি প্রমাণ যে ওরা পথভ্রষ্ট!’

ভেতরে ভেবেছিলাম—কী বিচিত্র পাল্লা, যেখানে নীরবতাই অভিযোগের পাল্লা ভারী করে তোলে!

মুফতি সাহেব বছরের পর বছর গোমরাহ বলেন, সামনে কেউ মুখ খোলে না; সুতরাং নিস্তব্ধতাই প্রমাণ, অভিযোগ সত্য!

যেন কেউ বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন চিৎকার করছে—‘এই লোক ডাকাত’, আর তুমি দরজা না খুলে চুপ থাকলেই নীরবতা মানে অপরাধ স্বীকার!

এ কী মজার যুক্তি—অভিযুক্ত কথা বললেও বিপদ, না বললেও বিপদ। বললে বলা হবে—‘নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে ব্যস্ত, নিশ্চয় গোপন কিছু আছে’; চুপ থাকলে বলা হবে—‘দেখ, জবাবই দিতে পারছে না!’

অর্থাৎ আদালত গঠিত, রায়ও লেখা, এখন শুধু অভিযুক্তের নীরব ‘স্বাক্ষর’ বাকি।

আমি মীর সাহেবের দিকে তাকালাম। তিনি নীরবে বসে। সে নীরবতা এমন, যেন কোনো গভীর কূপে পাথর ছুড়ে দিলে জলতল থেকে প্রতিধ্বনি আসতে দেরি হয়। জিজ্ঞেস করলাম, ‘মীর সাহেব, নির্দোষ মানুষ নিজেদের পক্ষে কিছু বলে না কেন? দেখছেন না, এ নীরবতার সুযোগে মুফতি সাহেব কী নির্লজ্জভাবে অভিযোগের ঢিপি বানাচ্ছেন!’

মীর সাহেব একটু থেমে চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘মাছি কামড়াতে ক্লান্ত হয় না, কিন্তু মাছি তাড়ানো ভিন্ন কাজ।’

আমি বললাম, ‘কারণটা কী?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘কারণ কামড়াতে মজা আছে, তাড়াতে কোনো আনন্দ নেই।’

মীর সাহেবের এ সংক্ষিপ্ত বাক্য মনের ভেতর বহুক্ষণ ধ্বনিত হল। মনে হল, একটুখানি মাছির ডানায় মানবস্বভাবের সমগ্র দার্শনিক জটপাকানো।

বাস্তবেও, মাছি কামড়ায়—মজা ওর; তাড়াতে গিয়ে মানুষ তো কোনো রোমাঞ্চ পায় না। মাছি দেহে অত্যন্ত তুচ্ছ, তবে সংকল্পে অনড়। তুমি হাত তুললেই ও উড়ে যায়; নামালেই আবার বসে। তাড়ালে মনে করে, যেন ওকে বিতর্কের আমন্ত্রণ দিলে!

অভিযোগের বিষয়টিও ঠিক তেমন। অভিযোগ করা সহজ; অবস্থান বোঝা কঠিন। কাউকে গোমরাহ বলা সহজ; জিজ্ঞেস করা কঠিন—‘ভাই, তোমার প্রকৃত মত কী?’ কারও আকিদা সম্পর্কে হুকুম জারি সহজ; তার বই পড়া কঠিন। কারও বিরুদ্ধে ফতোয়া ছাড়া সহজ; তার পক্ষে প্রমাণ খতিয়ে দেখা কঠিন।

অভিযোগ হলো জিহ্বার তাড়াতাড়ি পাকা ফল; গবেষণার বৃক্ষ ছায়া দেয় বছরের পর বছর পর।

মুফতি সাহেবের যুক্তিতে আরেক আশ্চর্য কথা—‘আমি বছর ধরে ওদের গোমরাহ বলছি, ওরা এখনও চুপ।’ ভাবলাম, নীরবতাকে ভ্রান্তির প্রমাণ বানানো কোন কিতাবে লেখা? নীরবতারও তো নানা ঋতু আছে—কেউ ফিতনা এড়াতে চুপ, কেউ জানে উত্তর দিলে প্রশ্ন বাড়বে, কেউ নিজ মর্যাদা অপবাদবাজারে নিলাম না করতে চায়, আর কেউ বিশ্বাস করে—সত্যকে প্রত্যেক শোরগোলের জবাব দিতেই হবে, এমন নয়।

নদী নিজের গভীরতা দেখাতে কোলাহল তোলে না; কংকর নিক্ষেপকারীরাই শব্দ বেশি করে। কিন্তু আমাদের সমাজে মাঝেমধ্যে নীরবতাও অপরাধ—উত্তর দিলে বলে, ‘দেখ, আত্মপক্ষ সমর্থন করছে’; না দিলে বলে, ‘দেখ, উত্তরই নেই।’

অভিযোগকারীর হাতে এমন ছাঁকনি, যাতে অভিযুক্তের কোনো অবস্থাই রেহাই পায় না—বললেও দোষী, চুপ থাকলেও দোষী!

মীর সাহেবকে দেখলাম, মনে হলো মস্তিষ্কে আরেক উপমা অঙ্গুলি খুলছে। একটু পর বললেন, ‘বিড়ি টানতে মজা, কিন্তু বিড়ির ক্ষতি বোঝাতে মজা নেই।’

এই কথাও হৃদয়ে গেঁথে গেল। ক্ষতিকর বস্তু ভোগে তৎক্ষণাৎ স্বাদ; তার ক্ষতি বর্ণনায় না স্বাদ, না রোমাঞ্চ, না সভার বাহবা।

বিড়ির একটা টান—সঙ্গে সঙ্গেই তৃপ্তি; কিন্তু তার অপকারিতা নিয়ে লেকচার—না ধোঁয়া, না স্বাদ, না দর্শকের উচ্ছ্বাস।

সম্ভবত কিছু ধর্মীয় সমাবেশের হালও এমনই। কারও সম্পর্কে বলা—‘এখানে মতপার্থক্য আছে, এই যুক্তি দুর্বল, এখানে ভুল’—খুবই শুকনো, নিরাস্বাদ কাজ। কিন্তু ঘোষণা—‘অমুক গোমরাহ!’—মুহূর্তে যেন চোখে ঝিলিক, কানে খটকা, জনতার উৎফুল্লতা, আর বক্তাও

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *