Skip to main content

AkramNadwi

না, ঠিক এই সময়েই একটি প্রদীপের মূল্য হাজার প্রদীপ

না, ঠিক এই সময়েই একটি প্রদীপের মূল্য হাজার প্রদীপের সমান; একজন বিদ্বানের পরিশ্রম হাজার অলসের আলাপে চেয়েও ভারী; একজন নিষ্ঠাবান দায়ীর কণ্ঠ, কোলাহলমুখর কালে, আজানের মতো হৃদয় জাগাতে সক্ষম।

সুতরাং প্রশ্ন পাল্টাও। “কোন কাজ করব?” এটা নয়; বরং হৃদয়কে প্রশ্ন করো—আমরা না করলে করবে কে? আজ না করা হলে, কখন?

আসল কথা, তোমার প্রশ্ন ততোটা বৈজ্ঞানিক সংশয়ের নয়, যতটা মানসিক স্থবিরতার প্রতিচ্ছবি। তোমার জ্ঞান-আকুলতা আছে ঠিকই, কিন্তু নেই সে সবুর, সে স্থৈর্য, সে মুজাহাদা—যা জ্ঞানের দাম। তুমি গন্তব্য চাও, কিন্তু ভয় পাও সে পাথুরে পথের যা সব গন্তব্যে বিয়োজিত।

তুমি আরামপ্রিয়। এমন রাজপথে হাঁটতে চাও, যা আগেই সমতল; যেখানে নেই কাঁটা, যাত্রা-ধুলো, নির্জনের নিশ্বাস, পাঠ-পরিশ্রম, গবেষণার গ্রন্থি, রজনীজাগরণের পরীক্ষা, মনের দ্বন্দ্বের আগুন। তুমি এমন ফুলবাগান খোঁজো, যেখানে বসন্ত তো আসবে, কিন্তু মালীকে ঘাম ঝরাতে হবে না; ফুল ফুটবে, কিন্তু বীজ বোনার কষ্ট নয়; সুবাস মিলবে, তবু বছরের পর বছর সেচের দরকার পড়বে না।

কিন্তু মনে রেখো, প্রকৃতির নিয়ম বদলায়নি। আল্লাহ মুক্তার লুকিয়েছেন সাগরতলে, পাহাড়ের চূড়ায় নয়; সোনা পুঁতেছেন মাটির গভীরে, সমতলের ময়দানে নয়; প্রস্রবণ ফোটান শক্ত পাথরের বুকে, নরম বালুতে নয়। তাহলে তুমি কিভাবে জ্ঞান, যা দুনিয়া-আখেরাত সাজায়, বিনা কষ্টে অর্জন করতে চাও? এটি কি কয়েকটি সহজ ধাপ পেরিয়ে হাতে ধরা দেয়?

জ্ঞান কখনো আরামকক্ষে জন্মায়নি। তা নেমেছে সেসব কপালে, যা সেজদায় ভিজে; বেড়ে উঠেছে সে সব চোখে, যা ম্লান প্রদীপ-আলোয় রজনী জেগে; প্রস্ফুটিত হয়েছে সে সব মনে, যা বছরের পর বছর একেকটি সমস্যায় নিহিত; দৃঢ়মূল হয়েছে সে সব অন্তরে, যাদের লক্ষ্য খ্যাতি নয়, হক। ইতিহাসের এ-ই রায়, রবের এ-ই সুন্নাহ।

কোনো এমন মুহাদ্দিসের নাম শুনেছ, যিনি আরামপ্রিয় ছিলে? কোনো মুফাসসির কি শুধু প্রতিভা দিয়ে ইমাম হয়েছেন—যিনি সারাজীবন কুরআনের সামনে হাত বুলাননি? কোনো ফকিহ কি ক’টা বই পড়ে উম্মতের মুরাজা হয়েছেন? কোনো দায়ী কি কেবল বক্তৃতার জোরে হৃদয়সমাজ জয় করেছেন?

কক্ষনো না। প্রতিটি মহৎ মানুষের পেছনে থাকে দীর্ঘ নীরবতা, যাতে সে জগৎ থেকে লুকিয়ে নিজেকে গড়ে; থাকে দীর্ঘ সাধনা, যা মানুষ দেখে না; হাজারো ঘন্টার অধ্যয়ন, যার রেকর্ড ইতিহাস রাখে না; শতশত ব্যর্থ প্রচেষ্টা, যা কেবল আল্লাহ জানেন।

মানুষ ইমাম বুখারির ‘সহিহ’ দেখে, কিন্তু দেখে না সেই সহস্র মাইলের সফর—একটি হাদিসের সন্ধানে। তারা ইমাম নববীর রচনাসমূহ পড়ে, কিন্তু দেখে না সে রজনীগুলো—পাঠ আর ইবাদতে ভাগ করা। তারা ইবন তাইমিয়ার বুদ্ধিবল দেখে, কিন্তু ভুলে যায় সেই কারাগার, যেখানে তাঁর চিন্তা পুনরায় বল পেয়েছে। তারা শাহ ওয়ালিউল্লাহর হিকমত কদর করে, কিন্তু জানে না সেই বছরগুলো—নিজ আত্মার তাযকিয়া, বিদ্যা-অর্জনে নিবেদন।

এ-ই জ্ঞানের পথ। তুমি চাও বিনা ঘামে শস্য দুলুক, বিনা বীজে ফসল পাকুক, বিনা বৈঠকে তীর মিলুক, বিনা রাতজাগায় অন্তর্দৃষ্টি মিলুক, বিনা মুজাহাদা জ্ঞানের আমানত তোমার হাতে তুলে দিক। এ আকাঙ্ক্ষা মধুর, বাস্তব নয়।

জ্ঞান এক রাজ্য; তার চাবি পরিশ্রম। যে পরিশ্রমকে মিত্র বানায়, জ্ঞান তার জন্য দ্বার খুলে দেয়; যে আরামকে উপাস্য বানায়, জ্ঞান তাকে নিজের দোরে দাঁড় করিয়ে রাখে।

আজ আমাদের বিদ্যাজগতের এক মহা-বিপদ, আমরা জ্ঞানকে স্বাচ্ছন্দ্যের বাজারে টেনে এনেছি। চাই—ক’টি নোট, কিছু রেকর্ডকৃত ক্লাস, গুটিকয় শংসাপত্র, সন্ত্রাস পরীক্ষাই যেন আমাদের জায়গা করে দেয় তাঁদের সারিতে, যারা প্রাণপণ ত্যাগ করেছিলেন বিদ্যার জন্য।

আমরা ভুলে গেছি, সনদ আলিম বানায় না, জ্ঞান বানায়; প্রতিষ্ঠান মহত্ত্ব দেয় না, চরিত্র দেয়; খ্যাতি ইমামতির মানদণ্ড নয়, বরং নিষ্ঠা ও গভীরতা।

তুমি যদি জনতারই অংশ হতে চাও, মুশকিল নেই—যা সবাই পড়ে, সেটাই পড়ো; যা সবাই বলে, সেটাই বলো; যা সবাই লেখে, সেটাই লেখো; আর সেই ভিড়ে মিলিয়ে যাও—যেখানে নাম আছে, চিহ্ন নেই, কণ্ঠ আছে, প্রভাব নেই, কলম আছে, চিন্তা নেই।

কিন্তু যদি তুমি স্থির করো—ভিড়ের আরেক মুখ না হয়ে, উম্মতের এক প্রয়োজন হবে; অতীতের প্রতিধ্বনি নয়, ভবিষ্যতের আহ্বান; অন্যের দিয়াশলায় আলো নেওয়ার পাশাপাশি নিজেও এক আলো হবে—তাহলে নিজেকে দীর্ঘ সাধনার জন্য প্রস্তুত করো।

মনে রেখো, জ্ঞান তাদের কাছে দরজা খোলে না, যারা সময় ‘নিয়ে’ আসে; তাদের কাছে খোলে, যারা জীবনই উৎসর্গ করে।

পথটি দীর্ঘ, কিন্তু এ-ই নবীদের উত্তরাধিকারীদের পথ; দুর্গম, কিন্তু এ-ই মর্যাদার সিঁড়ি; একাকী, কিন্তু এ-ই কাফেলার পথপ্রদর্শক গড়ে।

অতএব সহজ রাস্তা খোঁজা ছেড়ে দাও। সাহস বাড়াও, নফসকে কষ্ট-সহিষ্ণু গড়ো, সময়কে বিদ্যার জন্য নিবেদন করো, আর অন্তরে নতুন অঙ্গীকার করো—জীবনের প্রতিটি দিন, জ্ঞান-আমল-ইখলাসে গতকালের চেয়ে শ্রেয়তর করে যাবে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *