AkramNadwi

শিরোনাম : সূরা সাজদাহ ও সূরা মুলকের ফজিলত ——–

শিরোনাম : সূরা সাজদাহ ও সূরা মুলকের ফজিলত
———-

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাসরত সম্মানিতা অধ্যাপিকা নীলুফার আহমদী আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন:
মাগরিব ও এশার মাঝখানে সূরা সাজদাহ ও সূরা মুলক তিলাওয়াতের ফজিলত সম্পর্কে যে হাদিস বর্ণিত আছে, তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু?

আমি বললাম:
কুরআনের সূরাগুলোর ফজিলত সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা ও ধীরতা অবলম্বন করা জরুরি। কারণ, এ ধরনের অধিকাংশ হাদিসই মনগড়া, ভিত্তিহীন বা অত্যন্ত দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেছেন: “তিনটি বিষয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই—মাগাযি, মালাহিম এবং তাফসির।”

আমি আরও বললাম:
হাদিস জালকারীরা নিজেরাই তাদের নিন্দনীয় কাজের স্বীকারোক্তি দিয়েছে। হাকিম আবু আবদুল্লাহ নিশাপুরী তাঁর ‘আল-মাদখাল’ গ্রন্থে এবং অন্যান্য আলেমগণ আবু আম্মার হুসাইন ইবনে হারীস আল-মারওয়াযী থেকে বর্ণনা করেছেন: আবু ‘ইসমা নূহ ইবনে আবি মারইয়ামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি ইকরিমা থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস রা. থেকে কুরআনের প্রতিটি সূরার ফজিলত সম্পর্কে যে বর্ণনাগুলো বলেন, সেগুলো কোথা থেকে পেলেন? অথচ ইকরিমার অন্য শাগরিদদের কাছে তো এসব নেই! তিনি জবাবে বলেছিলেন—আমি দেখলাম, মানুষ কুরআন থেকে বিমুখ হয়ে পড়েছে; তারা আবু হানিফার ফিকহ এবং মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের মাগাযি নিয়ে ব্যস্ত। তাই আমি সওয়াবের নিয়তে এসব হাদিস বানিয়ে দিয়েছি।

হাফিজ ইবনে হিব্বান তাঁর ‘আয-দু‘আফা’ গ্রন্থে ইবনে মাহদী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি মাইসারাহ ইবনে আবদে রব্বাহকে বললেন: “এই যে ‘যে ব্যক্তি এটা-ওটা পড়বে, সে অমুক সওয়াব পাবে’—এ ধরনের হাদিসগুলো তুমি কোথা থেকে আনলে?” তিনি বলল: “আমি মানুষকে এতে আগ্রহী করার জন্য নিজেই এগুলো বানিয়েছি।”

হায়! কী লজ্জা, কী কলঙ্ক! তারা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা রচনা করে, অথচ তাতে সওয়াবের আশা করে! অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন: “তার চেয়ে বড় জালিম আর কে, যে আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে?” এবং সহীহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে: “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন জাহান্নামে নিজের আসন প্রস্তুত করে নেয়।”

এরপর আমি বললাম :
প্রশ্নে উল্লিখিত হাদিসটি আবু বকর ইবনে মারদুয়াইহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন “যে ব্যক্তি মাগরিব ও এশার মাঝখানে ‘তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক’ এবং ‘আলিফ-লাম-মীম তানযীল’ (সূরা সাজদাহ) তিলাওয়াত করবে, সে যেন শবে কদর রাত্রি ইবাদতে কাটালো।”

একইভাবে তিনি আয়েশা রা. থেকেও বর্ণনা করেছেন: “যে ব্যক্তি মাগরিব ও এশার মাঝখানে এই দুই সূরা তিলাওয়াত করবে, সে যেন শবে কদর জাগ্রত থাকল।”

জারুল্লাহ যামাখশারী তাঁর ‘আল-কশশাফ’ তাফসিরে উল্লেখ করেছেন: “যে ব্যক্তি সূরা মুলক পাঠ করবে, সে যেন শবে কদর জীবিত রাখল।”
আর আবুল হাসান আলী ইবনে আহমদ আল-ওয়াহিদী তাঁর ‘আল-ওয়াসীত’ তাফসিরে বর্ণনা করেছেন, উবাই ইবনে কা‘ব রা. থেকে: “যে ব্যক্তি সূরা তাবারাক (সূরা মুলক) পড়বে, সে যেন শবে কদর জাগ্রত থাকল।”

আমি বললাম :
এসব হাদিসই সম্পূর্ণ বাতিল। আলেমদের মধ্যে এ ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে যে, আবু বকর ইবনে মারদুয়াইহ, জারুল্লাহ যামাখশারী, আবুল হাসান আলী ইবনে আহমদ আল-ওয়াহিদী, সা‘লাবী ও বায়যাবী, তাঁরা সূরা-ভিত্তিক যে ফজিলত বর্ণনা করেছেন, তার অধিকাংশই মনগড়া।

আল্লামা শিহাবুদ্দীন আল-আলূসী বাগদাদী তাঁর ‘রূহুল মা‘আনী’ তাফসিরে সূরা সাজদাহর ব্যাখ্যায় বলেন, ইবনে মারদুয়াইহ ইবনে উমর রা. থেকে যে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, “যে ব্যক্তি মাগরিব ও এশার মাঝখানে সূরা মুলক ও সূরা সাজদাহ পড়বে, সে যেন শবে কদর ইবাদতে কাটালো” এ ধরনের বর্ণনা তিনি, থা‘লাবী ও ওয়াহিদী উবাই ইবনে কা‘ব রা. থেকে, আর সা‘লাবী ইবনে আব্বাস রা. থেকেও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শাইখ ওয়ালিউদ্দীন এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেছেন: “আমি এ বর্ণনার কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস পাইনি” অতএব এসব রেওয়ায়েতই মনগড়া।

———-

ক্যাটাগরি : হাদিস, সমালোচনা, শিক্ষা, উপদেশ
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/2917

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *