|২৯|০৩|২০২৬|
শোনা যায়, এক শহরে এমন এক আলেম বাস করতেন, যার জ্ঞানের খ্যাতি তার প্রকৃত জ্ঞানের চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল। তাঁর বাড়ির দরজায় একটি ফলক ঝুলত “দারুত্ তাফাক্কুর” (চিন্তার আবাস)। অথচ ভেতরে ঢুকতেই বোঝা যেত, এখানে চিন্তার চর্চা নয়, বরং কৃত্রিম ভঙ্গিমারই বাস। দেয়ালজুড়ে বইয়ের সারি এমনভাবে সাজানো, যেন সৈন্যরা প্যারেডে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাদের অধিকাংশই কখনো পাঠের ময়দানে নামার সুযোগ পায়নি।
একদিন এক যুবক, চোখে প্রশ্নের ঝিলিক আর হৃদয়ে সত্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সেই “দারুত্ তাফাক্কুর”-এ উপস্থিত হলো। সে ভদ্রভাবে বলল, “হুজুর, আমি জানতে চাই—সত্য কী?”
আলেম সাহেব চশমা ঠিক করলেন, দাড়িতে হাত বুলালেন, তারপর একটি মোটা বই তুলে এমন ভঙ্গিতে তার সামনে রাখলেন, যেন কোনো বিচারক রায় ঘোষণা করছেন—
“এই নাও, এটাই সত্য।”
যুবক বইটির দিকে তাকাল, তারপর আলেমের দিকে, এবং সরলভাবে প্রশ্ন করল, “যদি এর মধ্যে মতভেদ থাকে?”
প্রশ্নটি যেন বজ্রপাত হয়ে নেমে এলো। এক মুহূর্তের জন্য আলেমের মুখে অস্বস্তির ছায়া ফুটে উঠল, কিন্তু দ্রুত সামলে নিয়ে বললেন, “তাহলে আরেকটা বই দেখে নাও… তবে সাবধান! নিজে ভাবার দুঃসাহস করো না। এই অভ্যাস মানুষকে বিভ্রান্ত করে।”
যুবক কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর ধীরে বলল, “হুজুর, যদি সবাই এভাবেই ভাবত, তাহলে তো এসব বই-ই লেখা হতো না।”
এ কথা শুনে আলেম কাশির অজুহাত নিলেন, কথা শেষ করলেন, এবং বইগুলোর দিকে এমনভাবে মনোযোগ দিলেন যেন তারাই তাঁর প্রকৃত শিষ্য—নীরব, অনুগত, এবং প্রশ্নহীন।
এই কাহিনি কোনো এক শহর বা এক ব্যক্তির নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ মানসিকতার প্রতিচ্ছবি, যাকে আমরা ভদ্র ভাষায় বলি ‘মানসিক আলস্য’ বা অন্ধ অনুকরণ। এটি এমন এক ব্যাধি, যেখানে মানুষ চিন্তাকে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট মনে করে, আর অন্যের ভাবনাকে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়াকেই জ্ঞানগর্বের পরিচয় বলে ধরে।
মানসিকভাবে অলস মানুষ এক অদ্ভুত সত্তা। সে প্রতিটি বিষয়ে মতামত রাখে, কিন্তু কোনো মতের দায় নেয় না। তার কাছে শব্দের ভাণ্ডার আছে, অথচ অর্থের দুর্ভিক্ষ। সে এমনসব বাক্য উচ্চারণ করে, যা শুনতে গভীর মনে হয়, কিন্তু সামান্য মনোযোগেই বোঝা যায়, সেগুলো কেবল ফাঁপা পাত্রের প্রতিধ্বনি।
তার সবচেয়ে বড় গুণ, বা হয়তো সবচেয়ে বড় কৌশল হলো, সে নিজের আলস্যকে প্রজ্ঞার আবরণে ঢেকে ফেলে। সে গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলে, “অত বেশি ভাবা ঠিক নয়, মানুষ জটিলতায় পড়ে যায়।” যেন জটিলতা এড়াতে অজ্ঞতাকে বরণ করাই বুদ্ধিমত্তার চূড়ান্ত নিদর্শন!
এদের কাছে জ্ঞান মানে এমন কিছু, যা আলমারিতে সাজিয়ে রাখা হয়, মনে ধারণ করার বিষয় নয়। বই তাদের জন্য অলংকার, অধ্যয়নের উপকরণ নয়। তারা বই খুলে ঠিকই, কিন্তু কেবল এতটুকু যে, পাতার গন্ধে নিজেদের ‘জ্ঞানী’ পরিচয়টাকে একটু সতেজ করে নিতে পারে।
আর কখনো যদি বিতর্কের প্রসঙ্গ আসে, তখন তাদের যুক্তি প্রদর্শনের ধরন দেখার মতো হয়। যুক্তির বদলে পূর্বসূরিদের উদ্ধৃতি, গবেষণার বদলে মতবাদের ঐতিহ্য, আর চিন্তার বদলে অন্ধ অনুসরণ, এই তাদের অস্ত্রভাণ্ডার। তারা বলে, “সবাই তো এটাই বলে” এবং এই বাক্যটিকেই তারা চূড়ান্ত প্রমাণ মনে করে, যার পর আর ভাবার কোনো অবকাশ থাকে না।
মানসিক আলস্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি নীরবে ছড়িয়ে পড়ে। একজনের সহজপন্থা পুরো আসরকে গ্রাস করে ফেলে। প্রশ্ন তোলা বন্ধ হয়ে যায়, মতভেদকে বেয়াদবি মনে করা হয়, আর সংলাপ ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক মাথা নাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
বাস্তবতা হলো, মানসিক আলস্য এক আরামদায়ক কারাগার। এতে নেই কোনো পরিশ্রম, নেই কোনো অস্থিরতা, নেই সেই ব্যাকুলতা, যা সত্যের সন্ধানে জন্ম নেয়। কিন্তু এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রতারণা। কারণ যে মন নিজেকে কষ্ট থেকে বাঁচায়, সে আসলে নিজের সামর্থ্য থেকেই বঞ্চিত হয়ে যায়।
সুতরাং, যদি আমরা সত্যিই ‘দারুত্ তাফাক্কুর’-এর বাসিন্দা হতে চাই, তবে আমাদের বইয়ের প্রদর্শনী ছাড়িয়ে চিন্তার অনুশীলনে এগোতে হবে। নইলে আমরাও সেই আলেমের মতো হয়ে থাকব, বইয়ের মাঝখানে বসে, কিন্তু জ্ঞান থেকে বহু দূরে… আর আমাদের মস্তিষ্ক—শুধু প্রদর্শনের জন্য।
———-
ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, সমালোচনা, ফিলোসোফি, তাজকিয়াহ, উপদেশ
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8806