৮/৩/২০২৬
❖ প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম শায়খ, বাংলাদেশ থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:
নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে আমার চাকরি-শেষে প্রাপ্ত অর্থের (end-of-service benefits) ওপর যাকাত প্রযোজ্য কি না—এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা পেলে উপকৃত হতাম।
পরিস্থিতি:
আমার পূর্বতন কর্মস্থল, একটি ব্যাংক, আমাকে এককালীন একটি অর্থ প্রদান করে। কিন্তু ব্যাংকটি দেউলিয়া/তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ায় এই অর্থ আটকে দেওয়া হয়। আমি এই অর্থের বৈধ মালিক, কিন্তু তা উত্তোলন বা ব্যবহার করতে পারছি না।
বর্তমান অবস্থা:
সরকারি হস্তক্ষেপের ফলে আমার পূর্বতন প্রতিষ্ঠানটি আরও কয়েকটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হয়ে একটি নতুন প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। এই নতুন প্রতিষ্ঠান আগের সব সম্পদ ও দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
সীমাবদ্ধতা:
আমার অর্থ এখনও এই নতুন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ‘জব্দ’ বা ‘স্থগিত’ অবস্থায় আছে। কবে বা আদৌ এই অর্থ আমি পাব কি না, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা নিশ্চয়তা নেই।
❖ প্রশ্ন:
এই অর্থ যতদিন আমার নাগালের বাইরে থাকবে, ততদিন কি এর ওপর যাকাত দিতে হবে? যদি যাকাত ফরজ হয়, তবে কি প্রতি বছর অন্য সম্পদ থেকে তা আদায় করতে হবে, নাকি অর্থ হাতে পাওয়ার পর পূর্বের সব বছরের যাকাত একসাথে দিতে হবে? আমার এই অর্থ কি “দুর্বল ঋণ” এর অন্তর্ভুক্ত হবে, যেহেতু এর ওপর আমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বা পূর্ণ মালিকানা নেই?
❖ উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনি অত্যন্ত স্পষ্টতা ও সুন্দরভাবে আপনার প্রশ্নটি উপস্থাপন করেছেন, এর জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে ধরনের আর্থিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে কোনো ব্যক্তির পাওনা আইনগতভাবে স্বীকৃত, কিন্তু বাস্তবে তা অপ্রাপ্য হয়ে আছে, এটি যাকাত সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদিও প্রাচীন ফিকহবিদরা আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সরাসরি আলোচনায় আনেননি, তবুও সম্পদ ও ঋণ সংক্রান্ত যে নীতিমালা তারা প্রণয়ন করেছেন, তা এ ধরনের পরিস্থিতি নির্ণয়ে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রদান করে।
যাকাত ফরজ হওয়ার একটি মৌলিক শর্ত হলো, যাকে ফকিহগণ বলেন “পূর্ণ মালিকানা” । এই ধারণাটি শুধু আইনি মালিকানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে যুক্ত আছে বাস্তবিক উপকার ভোগ করার ক্ষমতা এবং সম্পদের ওপর স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ, যাকাত তখনই ফরজ হয়, যখন সম্পদ কেবল মালিকানাধীনই নয়, বরং তা বাস্তবিক অর্থে মালিকের নিয়ন্ত্রণাধীনও থাকে।
যদি কেউ কাগজে-কলমে কোনো সম্পদের মালিক হয়, কিন্তু সে তা ব্যবহার করতে না পারে, ভোগ করতে না পারে, বা বাস্তবসম্মতভাবে তা আদায় করার কোনো নিশ্চয়তা না থাকে, তবে সেই মালিকানাকে অপূর্ণ ধরা হয়। এ অবস্থায় সাধারণত যাকাত ফরজ হয় না, যতক্ষণ না সেই সম্পদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে।
আপনার ক্ষেত্রে, আপনি আপনার পূর্বতন প্রতিষ্ঠান থেকে এককালীন একটি অর্থ পাওয়ার অধিকারী হয়েছেন। নীতিগতভাবে এটি আপনার বৈধ সম্পদ। কিন্তু ব্যাংকটি যখন তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে কার্যত অচল হয়ে যায়, তখন সেই অর্থ আপনার নাগালের বাইরে চলে যায়। পরবর্তীতে সরকারি উদ্যোগে কয়েকটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক একত্রিত হয়ে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করে, যা পূর্বের সব সম্পদ ও দায়ভার গ্রহণ করে। তবুও আপনার অর্থ এখনও আটকে আছে, এবং তা কবে বা আদৌ পাওয়া যাবে কি না, এ নিয়ে কোনো নিশ্চিত সময়সীমা বা ভরসাযোগ্য নিশ্চয়তা নেই।
ফিকহের ক্লাসিক গ্রন্থগুলোতে এমন ঋণ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যায়, যা কারো প্রাপ্য হলেও এখনো আদায় হয়নি। ফকিহগণ সাধারণত ঋণকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেছেন, ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা ও দাবির শক্তির ভিত্তিতে। বিশেষ করে হানাফি মাযহাবে ঋণকে শক্তিশালী, মধ্যম ও দুর্বল—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়।
শক্তিশালী ঋণ হলো সেই ঋণ, যার আদায় হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, যেমন কোনো স্বচ্ছল ব্যক্তির কাছে বাণিজ্যিক লেনদেনের ভিত্তিতে পাওনা অর্থ। এ ধরনের ক্ষেত্রে অনেক ফকিহের মতে, যাকাত প্রতি বছরই আদায় করতে হবে, কারণ ঋণদাতার অধিকার এখানে দৃঢ় ও প্রত্যাশিত।
দুর্বল ঋণ বলতে বোঝানো হয় এমন দাবি, যার আদায় অনিশ্চিত বা দীর্ঘ সময় বিলম্বিত। এর ক্লাসিক উদাহরণ হলো—অপরিশোধিত উপহার, এখনো হাতে না পাওয়া উত্তরাধিকার, কিংবা এমন ব্যক্তির কাছে পাওনা ঋণ, যে পরিশোধে অক্ষম। এ ধরনের অবস্থায় সম্পদের ওপর মালিকের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত সীমিত থাকে; ফলে যাকাতের জন্য প্রয়োজনীয় “পূর্ণ মালিকানা” এখানে পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হয়েছে বলে ধরা হয় না।
আপনার পরিস্থিতি ফকিহদের বর্ণিত এই “দুর্বল ঋণ” এর সঙ্গে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ। যদিও এই অর্থের ওপর আপনার অধিকার আইনগতভাবে বহাল আছে এবং দায় নতুন গঠিত ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তেছে, তবুও অর্থটি বাস্তবে আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আপনি তা উত্তোলন করতে পারছেন না, ব্যবহার করতে পারছেন না, বিনিয়োগ করতে পারছেন না, কিংবা কোনো বাস্তব উপকারে লাগাতে পারছেন না। তদুপরি, ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার
অনিশ্চয়তার কারণে এই অর্থ আদৌ পাওয়া যাবে কি না, এ নিয়েও নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।
এই বাস্তবতাগুলো বিবেচনায় নিলে বলা যায়, যতদিন এই অর্থ আটকে থাকবে এবং আপনার নাগালের বাইরে থাকবে, ততদিন এর ওপর যাকাত ফরজ হবে না। কেবল আইনি দাবি থাকা মাত্রই যাকাত আবশ্যক হয়ে যায় না, যদি মালিক বাস্তবে সেই সম্পদ অর্জন বা ব্যবহার করার সক্ষমতা না রাখেন। সুতরাং, এই অর্থের ওপর প্রতি বছর যাকাত হিসাব করা আপনার জন্য জরুরি নয়, এবং এটি অন্য সম্পদ থেকে আদায় করারও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত এই অর্থ আপনার হাতে না আসে।
তবে পরিস্থিতি যদি পরিবর্তিত হয় এবং আপনি বাস্তবে এই অর্থ হাতে পান, পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার ক্ষমতা অর্জন করেন, তখন হুকুমও পরিবর্তিত হবে। যখন সম্পদটি আপনার দখলে আসবে এবং আপনি তা স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হবেন, তখন তা আবার স্বাভাবিক যাকাতের নিয়মের আওতায় ফিরে আসবে। হানাফি ফকিহদের সুপরিচিত মত অনুযায়ী, এ ধরনের দুর্বল ঋণের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বছরগুলোর জন্য যাকাত ফরজ হয় না। বরং, অর্থ হাতে পাওয়ার পর তা যদি এক পূর্ণ চান্দ্র বছর নিসাব পরিমাণ অবস্থায় আপনার কাছে থাকে, তখন স্বাভাবিক নিয়মে যাকাত আদায় করতে হবে।
কিছু আলেম মত দিয়েছেন, যদি বহু বছর পর এই ধরনের সম্পদ হাতে আসে, তাহলে সতর্কতা ও আত্মিক উদারতার দৃষ্টিকোণ থেকে অতীত সময়ের জন্য যাকাত আদায় করা উত্তম হতে পারে। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়; বরং এক প্রকার নফল ও ব্যক্তিগত তাকওয়ার প্রকাশ, বিশেষত যখন ঋণটি প্রকৃত অর্থেই দুর্বল ও অনিশ্চিত ছিল।
এটিও মনে রাখা উচিত, যদি পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়ে ওঠে, যেমন সরকার বা নতুন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা দেয় এবং একটি নির্ভরযোগ্য সময়সূচি নির্ধারণ করে, তখন এই দাবির আইনি অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে। যদি অর্থ প্রাপ্তি যুক্তিসঙ্গতভাবে নিশ্চিত হয়ে যায়, তবে এটি “আদায়যোগ্য ঋণ” এর কাছাকাছি অবস্থানে চলে আসবে, এবং তখন যাকাতের হুকুম নতুন করে পর্যালোচনা করতে হতে পারে।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে আটকে থাকা আপনার এই চাকরি-শেষ সুবিধার অর্থ এমন সম্পদের অন্তর্ভুক্ত, যার ওপর এখনো পূর্ণ ও কার্যকর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই যতদিন এটি অপ্রাপ্য ও অনিশ্চিত থাকবে, ততদিন এর ওপর যাকাত ফরজ নয়। আর যখন এটি আপনার দখলে আসবে এবং নিসাব পরিমাণে এক পূর্ণ চান্দ্র বছর আপনার কাছে থাকবে, তখনই কেবল যাকাত ফরজ হবে, দুর্বল ঋণ সম্পর্কে হানাফি ফকিহদের শক্তিশালী মত অনুযায়ী।
আল্লাহ আপনার বিষয়টি সহজ করে দিন এবং আপনার সম্পদে বরকত ও পবিত্রতা দান করুন।
———-
ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, ফিকাহ, ইসলামি চিন্তাধারা, তাজকিয়াহ
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8714