AkramNadwi

আয়াত ও গুণাবলির আয়নায়

আয়াত ও গুণাবলির আয়নায়<br>

৩১ জানুয়ারি ২০২৬

মানবজীবনের সবচেয়ে মৌলিক ও নির্ণায়ক প্রশ্ন এটি নয় যে আমরা কী ধারণ করি বা কী অধিকার করি; বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কী জানি। আল্লাহকে জানা কেবল একটি ধর্মীয় কর্তব্য নয়, এটি মানবচেতনার পূর্ণতা। স্রষ্টাকে না জেনে মানুষ না নিজের অস্তিত্বের অর্থ বুঝতে পারে, না এই মহাবিশ্বে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে, না নিজের কর্মের নৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। আল্লাহকে জানা মানুষের জীবনের সেই কেন্দ্রীয় বিন্দু, যার চারদিকে তার ভাবনা, নৈতিক বোধ, জীবনের উদ্দেশ্য এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা নিরন্তর ঘুরে চলে।
এই কেন্দ্রটি যদি অনুপস্থিত থাকে, তবে জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মানুষ বাহ্যিকভাবে এগোয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে শূন্য হয়ে পড়ে। সে বারবার এমন ভুলে জড়িয়ে পড়ে, যা ধীরে ধীরে তার অভ্যাসে পরিণত হয়, এমনকি একসময় ভুলই যেন তার স্বভাব বলে মনে হতে থাকে। সুতরাং আল্লাহকে জানার চেষ্টা আসলে মানুষের নিজের মুক্তিরই চেষ্টা।

দার্শনিক দৃষ্টিতে দেখলে মানুষের মন কারণ অনুসন্ধানে স্বভাবতই উদ্বুদ্ধ। প্রতিটি ঘটনার পেছনে কারণ, প্রতিটি শৃঙ্খলার পেছনে নিয়ন্ত্রক এবং প্রতিটি অর্থের পেছনে অর্থের উৎস খোঁজা বুদ্ধির স্বাভাবিক গতি। এই গতিই মানুষকে মহাবিশ্বের দিকে টেনে নিয়ে যায়। যখন সে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করে, তখন স্পষ্ট হয় যে সে নিজেই নিজের জন্য যথেষ্ট নয়। তার দেহ, তার বুদ্ধি, তার অনুভূতি, সবই দান, নিজের তৈরি নয়। একইভাবে মহাবিশ্বের এই মহিমান্বিত ব্যবস্থা, তার গাণিতিক শৃঙ্খলা, জৈবিক জটিলতা ও নান্দনিক সামঞ্জস্য সাক্ষ্য দেয় যে অস্তিত্ব নিছক আকস্মিকতার ফল হতে পারে না। আকস্মিকতা সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলা, আর মহাবিশ্ব পরিপূর্ণ সংযোগ, ভারসাম্য ও উদ্দেশ্যে ভরা।

এখানে এসে মানুষ এক এমন বুদ্ধিবৃত্তিক সীমায় পৌঁছে যায়, যেখানে সে স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে এই মহাবিশ্বের উৎস এমন এক সত্তা, যিনি জ্ঞান, ক্ষমতা ও ইচ্ছায় পরম ও নিরঙ্কুশ। কিন্তু কেবল বিমূর্ত যুক্তি যথেষ্ট নয়। যদি আল্লাহ কেবল একটি দার্শনিক অনুমানে সীমাবদ্ধ থাকেন, তবে তিনি মানুষের হৃদয়কে রূপান্তরিত করতে পারেন না। তাই পরিচয়ের প্রথম স্তর, যা আয়াতের মাধ্যমে অর্জিত হয়, মানুষের ভেতরে বিস্ময় ও মহিমাবোধ জাগায়। মানুষ তখন মহাবিশ্বকে এক নীরব গ্রন্থের মতো পাঠ করতে শেখে। প্রতিটি কণাই তার কাছে একটি ইশারা হয়ে ওঠে। বৈচিত্র্যের ভেতর ঐক্যের দর্শন তাকে জানিয়ে দেয় যে বাস্তবতার উৎস এক ও অভিন্ন। এই উপলব্ধি তাকে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে এনে এক মহত্তর সত্যের সামনে নত করে দেয়।

কিন্তু মানবাত্মা কেবল ভয় ও বিস্ময়ে বাঁচতে পারে না। তার প্রয়োজন সম্পর্ক, নৈকট্য ও ভালোবাসা। এই প্রয়োজনই তাকে পরিচয়ের দ্বিতীয় পথে নিয়ে যায়, অর্থাৎ আল্লাহকে তাঁর গুণাবলির মাধ্যমে জানা। যদি আল্লাহ কেবল একটি নির্জীব নীতি বা শীতল মহাজাগতিক শক্তি হতেন, তবে মানুষ তাঁকে ভয় করতে পারত, কিন্তু ভালোবাসতে পারত না। কুরআনে আল্লাহর নিজের পরিচয় আসলে এই অস্তিত্বগত শূন্যতাকেই পূরণ করে। মানুষ যখন শোনে যে তার রব রহমান, রহিম, হাকিম ও আদিল, তখন তার সামনে এমন এক সত্তার চিত্র ভেসে ওঠে, যিনি কেবল স্রষ্টাই নন, বরং লালনকারীও; বিচারকও, আবার ক্ষমাশীলও।

এখানে একটি গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত রয়েছে। আল্লাহর গুণাবলি ছাড়া নৈতিক জীবনের ধারণা স্পষ্ট হয় না। যদি মহাবিশ্বের পেছনে কোনো নৈতিক চেতনা না থাকে, তবে ভালো ও মন্দ কেবল সামাজিক চুক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু মানুষ যখন আল্লাহকে ন্যায়পরায়ণ বলে জানে, তখন ন্যায় একটি মহাজাগতিক মূল্যবোধে পরিণত হয়, নিছক মানবমতামত হয়ে থাকে না। যখন সে আল্লাহকে দয়ালু বলে জানে, তখন দয়া দুর্বলতা নয়, বরং পূর্ণতা হয়ে ওঠে। এভাবে আল্লাহর গুণাবলিই মানবনৈতিকতার উৎসে পরিণত হয়। মানুষ আল্লাহর গুণাবলির প্রতিচ্ছবি হওয়ার চেষ্টায় নিজের মানবিকতাকেই উচ্চতর করে।

তবে এখানে বুদ্ধির আরও একটি সতর্কতা প্রয়োজন। আল্লাহ তাঁর নাম ও গুণাবলি মানুষের ভাষায় বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তিনি মানবিক সীমার অধীন। ভাষা একটি সেতু, গন্তব্য নয়। আমরা আল্লাহর গুণাবলি বোঝার জন্য মানবিক উদাহরণের সাহায্য নিই, কিন্তু যদি সেগুলোকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নিই, তবে আমরা আল্লাহকে আমাদের কল্পনার কারাগারে আবদ্ধ করে ফেলি। এখানেই তানযীহের নীতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আল্লাহকে মানা, কিন্তু তাঁকে সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা না করা। তিনি শোনেন, কিন্তু আমাদের শোনার মতো নন। তিনি দেখেন, কিন্তু আমাদের দেখার মতো নন। এই স্বীকারোক্তি বুদ্ধির পরাজয় নয়, বরং তার পরিপক্বতা। কারণ পরিপক্ব বুদ্ধি নিজের সীমা চিনতে জানে।

মানবব্যক্তিত্বের পূর্ণতা তখনই অর্জিত হয়, যখন আয়াতের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান এবং গুণাবলির মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়। আয়াত বুদ্ধিকে বিস্তৃত করে, গুণাবলি হৃদয়কে গভীর করে। আয়াত মানুষকে মহাবিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করে, গুণাবলি তাকে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করে। যখন এই দুই ধরনের পরিচয় একত্রিত হয়, তখন মানুষ না শুষ্ক বুদ্ধিপূজায় আবদ্ধ থাকে, না অন্ধ আবেগে ভেসে যায়। সে এক ভারসাম্যপূর্ণ সত্তায় পরিণত হয়, যার চিন্তায় স্বচ্ছতা আছে এবং হৃদয়ে উষ্ণতা। এই ভারসাম্যই তাকে নিজের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে শেখায় এবং দুনিয়ার সঙ্গে দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

অবশেষে বলা যায়, আল্লাহর মা’রিফত কোনো বাহ্যিক সংযোজন নয়; বরং তা মানবস্বভাবের পুনরুদ্ধার। আল্লাহকে জানা আসলে সেই সত্যকে স্মরণ করা, যা আমাদের আত্মার গভীরে আগে থেকেই অর্পিত আছে, কিন্তু উদাসীনতার স্তরে স্তরে ঢাকা পড়ে গেছে। আয়াতসমূহ সেই স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে, আর গুণাবলি তাকে দিশা দেয়। মানুষ যখন এই স্মৃতিকে নতুন করে জীবিত করে তোলে, তখন তার জীবন আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে না; তার চিন্তা, কর্ম ও আকাঙ্ক্ষা একটিমাত্র কেন্দ্রের চারদিকে একত্রিত হয়ে যায়। এই সমবেত অবস্থাতেই রয়েছে প্রশান্তি, এখানেই নিহিত রয়েছে অর্থ, আর এখানেই মানবমর্যাদার প্রকৃত পূর্ণতা গোপনে বিকশিত হয়।

——————–

ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, ফিলোসোফি, তাজকিয়াহ

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8324

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *