|১৯ |জানুয়ারি |২০২৬|
ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ‘ইলমে কালাম’ এমন এক অধ্যায়, যার ব্যাপারে উম্মাহর শ্রেষ্ঠ আলেমগণ, বিশেষত সালফে সালেহিন (রহিমাহুমুল্লাহ) অত্যন্ত কঠোর, সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এই অবস্থান কোনো ব্যক্তিগত রুচি, সাময়িক প্রতিক্রিয়া কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক সংকীর্ণতার ফল ছিল না; বরং তা ছিল ওহি, সুস্থ বুদ্ধি এবং উম্মাহর দীর্ঘ চিন্তাশীল ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে ওঠা এক সুদৃঢ়, সর্বব্যাপী ও পরিণত পদ্ধতি। সালাফে সালেহিন কেবল ইলমে কালামকে অপছন্দই করেননি; বরং একে দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর, ঈমানের জন্য মারাত্মক এবং উম্মাহর চিন্তাগত স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক বলে ঘোষণা করেছেন, এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে মুসলমানদেরকে এর ফিতনা থেকে সতর্ক করেছেন।
এই নিন্দার প্রকৃত তাৎপর্য সঠিকভাবে বোঝার জন্য প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, সালফে সালেহিন ইলমে কালামকে কেবল এই কারণে প্রত্যাখ্যান করেননি যে এতে অপরিচিত ও নতুন পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন: আরাজ, জাওয়াহির, জাওহারুল ফার্দ, হাইউলা ও সূরত ইত্যাদি। বরং এর মূল ও মৌলিক কারণ ছিল এই যে, এসব পরিভাষার আড়ালে এমন সব আকীদা উপস্থাপন করা হয়েছিল যা বিদআতের ওপর প্রতিষ্ঠিত, এবং এমন সব তত্ত্ব গড়ে তোলা হয়েছিল যা কিতাব ও সুন্নাহর স্পষ্ট ও চূড়ান্ত নসের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আহলে কালাম যেসব বিষয়কে দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল, সেগুলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়, সাহাবায়ে কিরাম সেগুলোকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেননি, আর না-ই তাবেয়িন ও সালাফের ইমামদের কাছে সেগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল। এভাবে তারা ওহির পরিবর্তে মানবীয় অনুমানকে দ্বীনের ভিত্তি বানানোর দুঃসাহস দেখিয়েছে।
আরও বড় কথা, আহলে কালাম যে সব যুক্তিকে তাদের ধর্মীয় কাঠামোর ভিত্তি বানিয়েছিল, সেগুলোও ছিল বিদআতসঞ্জাত যুক্তি, অর্থাৎ এমন সব প্রমাণ যা না ওহি থেকে গৃহীত, না সুস্থ বুদ্ধির স্বীকৃত নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ‘বিদআতসঞ্জাত যুক্তি’ বলতে কেবল এটুকু বোঝানো হচ্ছে না যে সেগুলো নতুন বা উদ্ভাবিত ছিল; কারণ প্রতিটি নতুন যুক্তিই যে বাতিল, তা নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো, সেই যুক্তিগুলো একদিকে যেমন উদ্ভাবিত ছিল, তেমনি স্বয়ং নিজের মধ্যেই বাতিল ছিল।
এর সুস্পষ্ট উদাহরণ হলো ‘দলিলুল হুদূসিল আজসাম’, যাকে আহলে কালাম আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব প্রমাণের সর্বাপেক্ষা বড় ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল। এই একটিমাত্র যুক্তির খাতিরেই তারা আল্লাহর গুণাবলির অস্বীকৃতি জানিয়েছে, চূড়ান্ত নসসমূহে দুরূহ ও অপ্রাকৃত ব্যাখ্যা আরোপ করেছে, এবং শেষ পর্যন্ত এমন সব সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যা না বুদ্ধিকে তৃপ্ত করে, না হৃদয়ে প্রশান্তি আনে। ফলে এই যুক্তিগুলো কেবল নিজেই বাতিল প্রমাণিত হয়নি; বরং বাতিল আকীদার জন্মও দিয়েছে। এসব আলোচনা পরবর্তী পর্যায়ে যথাস্থানে বিস্তারিতভাবে আসবে।
এই বাস্তবতাগুলোর আলোকে পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, ইলমে কালামের নিন্দার বিষয়ে সালফে সালেহিন (রহিমাহুমুল্লাহ) এর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। হাফিজ আবু উমর ইবন আবদুল বার (রহ.) তাঁর মহামূল্যবান গ্রন্থ জামি‘ বায়ানিল ইলম ওয়া ফাদলিহি-তে এই ঐকমত্য অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সকল শহরের ফকিহ ও আহলুল আছার এ বিষয়ে একমত যে, আহলে কালাম বিদআত ও পথভ্রষ্টতার ধারক, এবং কোনো বিবেচনাতেই তারা ফকিহদের শ্রেণিভুক্ত নয়। প্রকৃত আলেম তারাই, যারা নববী আছার বহন করেন, সেগুলোর গভীর জ্ঞান রাখেন, এবং যাদের ইলম ও ফাহমের ওপর উম্মাহর আস্থা প্রতিষ্ঠিত।
এই একই সম্মিলিত অবস্থান ইমাম গাজালি (রহ.) ও বর্ণনা করেছেন, যদিও তিনি নিজে দীর্ঘ সময় ইলমে কালামের অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন। গাজালির চিন্তাজীবন নানা ধাপ অতিক্রম করেছে: প্রথমে দর্শনে নিমজ্জিত হন, তারপর ইলমে কালাম গ্রহণ করেন, এরপর তাসাউফের দিকে ঝোঁকেন, এবং শেষ পর্যন্ত সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর ইন্তেকাল হয়েছিল এমন অবস্থায় যে সহিহ বুখারি তাঁর বুকে ছিল। যদিও প্রত্যাবর্তনের পর তিনি নতুন কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি, তবে ইলজামুল আওয়াম ‘আন ইলমিল কালাম গ্রন্থে তিনি স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন যে, কালামি যুক্তি মানুষকে নিশ্চিত বিশ্বাসে পৌঁছাতে পারে না। সেই সঙ্গে তিনি সালাফে সালেহিনের ঐকমত্যপূর্ণ অবস্থানও উদ্ধৃত করেছেন—ইলমে কালাম নিন্দিত।
এই অধ্যায়ে ইমামগণ চারজনের উক্তি চূড়ান্ত গুরুত্ব বহন করে; কারণ উম্মাহর বৃহৎ অংশ ফিকহের ক্ষেত্রে তাঁদের অনুসারী। দুঃখজনকভাবে পরবর্তীকালের বহু মানুষ ফিকহে তাঁদের তাকলিদ করলেও আকীদায় তাঁদের পথ থেকে সরে গেছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কে যখন আরাজ ও আজসামের মতো কালামি বিতর্ক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি বলেন: “এগুলো দার্শনিকদের কথাবার্তা। তুমি আছার ও সালাফের পদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরো, আর প্রত্যেক নতুন বিষয় থেকে দূরে থাকো; কারণ তা বিদআত।” তাঁর শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কালামের মাধ্যমে দ্বীন অনুসন্ধান করে, সে জিন্দিক হয়ে যায়।”
ইমাম মালিক ইবন আনাস (রহ.) বিদআতিদের পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, তারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলি, তাঁর কালাম, জ্ঞান ও ক্ষমতা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়, এবং যেখানে সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়িন থেমে গেছেন, তারা সেখানে থামে না।
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এর উক্তিগুলো এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও প্রসিদ্ধ। তিনি বলতেন:
“কালামের অনুসারীদের ব্যাপারে আমার ফয়সালা হলো, তাদের খেজুরপাতার বেত্রাঘাত করা হবে, উটে চড়িয়ে গোত্র ও জনপদের মধ্যে ঘোরানো হবে, আর ঘোষণা দেওয়া হবে: এটাই সেই ব্যক্তির শাস্তি, যে কিতাব ও সুন্নাহ ত্যাগ করে কালামে লিপ্ত হয়েছে।”
ইমাম জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এক কথা বলেছেন:
“কালামের সর্বনিম্ন ক্ষতি হলো, হৃদয় থেকে রবের মহিমা ও ভয় ঝরে পড়া।”
ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.) এর কর্মপথও এই সত্যের উজ্জ্বল প্রমাণ যে, ইলমে কালাম ফিতনা ও অস্থিরতার উৎস। ‘খালকুল কুরআন’ এর ফিতনা মূলত আহলে কালামেরই উদ্ভাবন ছিল। সেই কঠিন পরীক্ষায় ইমাম আহমদ (রহ.) ধৈর্য, দৃঢ়তা ও অবিচলতার সঙ্গে সুন্নাহ রক্ষা করেন এবং উম্মাহর জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন।
ইলমে কালামের সবচেয়ে স্পষ্ট ও বেদনাদায়ক পরিণতি হলো, বিস্ময়, সংশয় ও মানসিক অস্থিরতা। এ কথা স্বয়ং আহলে কালামের বড় বড় ইমামরাই স্বীকার করেছেন। ফখরুদ্দিন রাজি তাঁর ওসিয়তে বলেছেন:
“আমি কালামি পদ্ধতি ও দার্শনিক ধারাগুলো পরীক্ষা করেছি; কিন্তু তাতে এমন কোনো উপকার দেখিনি, যা মহাগ্রন্থ কুরআনে যে উপকার পেয়েছি, তার সমতুল্য।”
একইভাবে ইমামুল হারামাইন জুয়াইনি তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে বলেছেন:
“তোমরা সাক্ষী থাকো, আমি সুন্নাহর বিরোধী প্রতিটি মত থেকে ফিরে এসেছি, এবং আমি সেই বিশ্বাসের ওপর মৃত্যুবরণ করছি, যে বিশ্বাসের ওপর নিশাপুরের সাধারণ বৃদ্ধ নারীরাও মৃত্যুবরণ করে।”
এই সব স্বীকারোক্তি সম্মিলিতভাবে এই বাস্তবতার ওপর অকাট্য সিলমোহর বসিয়ে দেয় যে, ইলমে কালাম মানুষকে নিশ্চিত বিশ্বাসের পথে নয়, বরং সংশয়ের অন্ধকারে টেনে নিয়ে যায়; হৃদয়ের প্রশান্তি দেয় না, বরং মানসিক অস্থিরতা বাড়ায়; আর হেদায়াতের দিকে পথ দেখায় না, বরং বিস্ময় ও বিভ্রান্তির ঘূর্ণিতে নিক্ষেপ করে।
কালামের সারকথা হলো, সালফে সালেহিনের ইলমে কালাম থেকে দূরে থাকা ও তার নিন্দা করা কোনোভাবেই বুদ্ধিবিদ্বেষ নয়; বরং তা হলো বুদ্ধির সঠিক মর্যাদা নির্ধারণ। এটি বুদ্ধিকে তার বৈধ পরিসরে রাখার নাম, ওহির মুখোমুখি দাঁড় করানোর নয়। দ্বীনের আকীদা ও শরিয়তের মাসআলার দলিল কিতাব ও সুন্নাহ এবং সেগুলোর যথার্থ অনুধাবনেই পূর্ণভাবে বিদ্যমান। ইলমে কালাম না উম্মাহর দ্বীনকে উপকার করে, না তার দুনিয়াকে শোভিত করে; বরং তা তাকে নিষ্ফল বিতর্ক, চিন্তাগত বিশৃঙ্খলা ও আত্মিক অশান্তির আবর্তে ঘুরিয়ে বেড়ায়। এ কারণেই সালফে সালেহিন (রহিমাহুমুল্লাহ) একে প্রত্যাখ্যান করেছেন, এ থেকে সতর্ক করেছেন, এবং ওহির সেই স্বচ্ছ, আলোকোজ্জ্বল ও হৃদয়-প্রশান্তকারী পথের দিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
————-
ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, সমালোচনা, দর্শন
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8228