AkramNadwi

❖ শিরোনাম : হজ্জ তারা আমাকে জিজ্ঞেস করল : হজের দি

❖ শিরোনাম : হজ্জ

তারা আমাকে জিজ্ঞেস করল :
হজের দিনগুলোতে পবিত্র হারামে, পরম দয়ালুর অতিথিদের কাফেলার দিকে এমন কী আকর্ষণ আছে, যা এত গভীরভাবে তোমার হৃদয় ও মনকে টেনে নিয়ে যায়? কোন সে অদৃশ্য শক্তি, যা তোমাকে তোমার নিজস্ব স্থান ও সময় থেকে বিচ্ছিন্ন করে, এমনকি প্রিয় সঙ্গীদের থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়?

আমি বললাম : দুটি বিষয় আমাকে এমনভাবে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলে, যেন তাদের টান থেকে নিজেকে কোনোভাবেই রক্ষা করতে পারি না।

তারা বলল : বলুন, সেগুলো কী?

আমি বললাম : প্রথমটি হলো, সময়ের সঙ্গে হজের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। হজ কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, কোনো অতীত সভ্যতার স্মৃতি নয়, কোনো শক্তিশালী শাসকের উত্তরাধিকারও নয়। বরং এটি সময়ের সব সীমানা ছাপিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, প্রাচীনতার গভীরে নিবিড়ভাবে প্রোথিত, ইতিহাসের অতল গভীরতায় গাঁথা এক চিরন্তন বাস্তবতা।
এটি আমাদের নবী মুহাম্মদ সা. এর যুগেরও বহু আগে পর্যন্ত বিস্তৃত। ইসলাম এসে হজের বিধান বদলে দেয়নি, তার রীতিনীতিকে নতুন করে গড়েও তোলেনি। বরং ইসলাম একে কিছু স্থানগত ও সাময়িক রীতির অপবিত্রতা থেকে পরিশুদ্ধ করেছে, এবং তার সেই নির্মল, অক্ষত মৌলিক রূপকে পুনরুদ্ধার করেছে, যা সব যুগের বিকৃতি ও কৃত্রিম সংমিশ্রণের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে।

দ্বিতীয়টি হলো, স্থানের সঙ্গে হজের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা।
এটি কোনো বিশেষ পরিবেশের মধ্যে আবদ্ধ নয়, কোনো সংকীর্ণ ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ কোনো জনগোষ্ঠীর অনুসারীও নয়। বরং এটি ভূগোলের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে, অঞ্চল ও পরিবেশের সব ধরনের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত। এখানে সমবেত হয় নানা জাতি ও গোত্রের মানুষ, বিভিন্ন বর্ণ, ভিন্ন ভূমি, ভিন্ন ভাষা; ভিন্ন রীতি, ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন ঐতিহ্য নিয়ে। হাজি তার জাতিকে, পরিবারকে এবং নিজের ভূমিকে ছেড়ে আসে, বরং সে বসতি, সবুজ আর স্বাভাবিক পোশাক পর্যন্ত ছেড়ে দেয়; প্রবেশ করে মরুভূমি, পাহাড় ও বিস্তীর্ণ সমতলে, যার ওপর তার কোনো অধিকার ও কোনো পরিচয় নেই।

তারা আবার জিজ্ঞেস করল: প্রাচীনতার সঙ্গে যুক্ত থাকার মানে কী?

আমি বললাম : এ সম্পর্ক স্থাপন করেছেন ইবরাহীম ও তাঁর পরিবার, তাঁদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।

তারা বলল : কিন্তু ইবরাহীম তো একটি নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন!

আমি বললাম : জেনে রাখো, হজ অন্য ধর্মগুলোর মতো কেবল কোনো পবিত্র স্থানে যাত্রা নয়। হজের সময় নির্ধারিত, তার বিধানও নির্ধারিত। এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই ইবরাহীমের জাতি বা ভূমির সঙ্গে, বরং কোনো জাতি বা ভূমির সঙ্গেই নয়।
হজ হলো সেই জীবনধারা ও প্রাণশক্তির ইতিহাসের স্মরণ, যা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ থেকে জন্ম নেয়। আর আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ কোনো স্থান বা কালের মধ্যে আবদ্ধ নয়। কোনো নির্বাচিত জাতি বা জনগোষ্ঠী এর একচ্ছত্র দাবি করতে পারে না। আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ ও পরিপূর্ণ দৃষ্টান্ত হলেন ইবরাহীম ও তাঁর পরিবার। এখানেই নিহিত ইবরাহীমের সার্বজনীনতার রহস্য, আর এখানেই নিহিত হজ ও তার বিধানসমূহের সার্বজনীনতা।

আল্লাহ বলেছেন : “আমি তোমাকে মানবজাতির জন্য নেতা বানাবো ।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১২৪)

“আমি এই ঘরকে মানুষের জন্য কেন্দ্র ও নিরাপদ আশ্রয় বানিয়েছি।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১২৫)
“এই ঘরে হজ আদায় করা আল্লাহর প্রতি মানুষের ওপর এক অপরিহার্য কর্তব্য।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৯৭)

এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ ‘মানুষ’ বলেই উল্লেখ করেছেন, ইসমাঈলের বংশধর, ইসরাঈলের বংশধর, আরব কিংবা অন্য কোনো জাতির নাম আলাদা করে বলেননি।

তারা জিজ্ঞেস করল : হজকে ইবরাহীম ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত করার গুরুত্ব কী?

আমি বললাম : আল্লাহর দ্বীন আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই এক ও অভিন্ন। আদম, নূহ এবং সব নবী ও তাঁদের অনুসারীদের জন্য তিনি যে পথ নির্ধারণ করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত সেটিই বহমান। কিন্তু এই পথের প্রয়োজন ছিল এক জীবন্ত আদর্শের, এমন এক পথনির্দেশকের, যা তাকে প্রাণ, শক্তি ও উদ্যম দেবে এবং তাকে নিছক অভ্যাস ও নির্জীব আচার-অনুষ্ঠানে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করবে, যাতে তার অর্থ ও আত্মা নিঃশেষ না হয়ে যায়।

তাই আল্লাহ ইবরাহীমকে (তাঁর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক) এই দ্বীনের আদর্শ হিসেবে নির্বাচন করলেন। কারণ তিনি আল্লাহর সব নির্দেশ পূর্ণ করেছেন এবং তাঁর ওপর আরোপিত সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এজন্যই আল্লাহ মানুষকে ইবরাহীমের মিল্লাত অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশ আমাদের নবী সা. এর প্রতিও প্রযোজ্য হয়েছে,

“তারপর আমি তোমার প্রতি ওহি পাঠালাম, সম্পূর্ণ একনিষ্ঠতায় ইবরাহীমের পথ অনুসরণ করো।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৩)
“বলো, আল্লাহ যা বলেন তাই সত্য; সুতরাং সম্পূর্ণ একনিষ্ঠতায় ইবরাহীমের পথ অনুসরণ করো।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৯৫)

তারা আবার জিজ্ঞেস করল :
ইবরাহীমি পথ কীভাবে আল্লাহর দ্বীনকে প্রাণবন্ত রাখে এবং তাকে অবক্ষয় ও পতন থেকে রক্ষা করে?

আমি বললাম : এই পথের উপাদান ও ভিত্তিগুলোর দিকে তাকাও, তোমরাই উত্তর পেয়ে যাবে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *